দেখা যায়, যুদ্ধের যিনি কারিগর তিনিই ঠিকমতো সব গণনা করেন। দু পক্ষই দু জনের আগমন প্রত্যাশা করে। নেপোলিয়ন গ্লোশির জন্য অপেক্ষা করেন। কিন্তু গ্লোশি আসেনি। ওয়েলিংটন রুশারের জন্য অপেক্ষা করেছিলেন, বুশার এসেছিল।
ওয়েলিংটন প্রাচীন যুদ্ধরীতির প্রতিনিধিত্ব করেন। নেপোলিয়ন তার সামরিক জীবনের প্রথমদিকে ইতালিতে এই যুদ্ধনীতির সম্মুখীন হন এবং তাতে জয়ী হন। এক প্রবীণ পেঁচা এক যুবক শিকারি পাখির কাছ থেকে পালিয়ে যায়। সে যুদ্ধরীতির নায়করা শুধু ছত্রভঙ্গ ও পরাভূত হয়নি, সেই সঙ্গে বিক্ষুব্ধও হয়। কে এই ছাব্বিশ বছরের কর্সিকান যুবক, বিরাট শক্তিধর অথচ অশুভ যার সব থেকেও কিছুই ছিল না। রসদ সরবরাহ, অস্ত্রশস্ত্র, কামান, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্য কোনও কিছুরই যার ঠিক ছিল না, যে মুষ্টিমেয় একদল অজ্ঞ, অপদার্থ ও হঠকারী সৈন্য নিয়ে ইউরোপের সম্মিলিত সেনাবাহিনীকে আক্রমণ ও বিপর্যস্ত করে অপ্রত্যাশিতভাবে জয়লাভ করে অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলে? এক উন্মাদ ঘূর্ণিবায়ুর মতো কোথা থেকে ঝড়ের বেগে এসে এক হাঁপে সামান্য একটি বাহিনী নিয়ে একের পর এক করে অস্ট্রিয়ায় সম্রাটের পাঁচটি সেনাদলকে পরাজিত করে? বোলোকে আলভিনিৎসের উপর, ওয়ার্থসারকে বোলোর উপর, মেলাকে ওয়ার্থসারের উপর এবং ম্যাককে মেলার উপর ছুঁড়ে ফেলে দেয়? এক ভুইফোড় কাকের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে এক বজ্ৰদণ্ড হাতে আবির্ভূত হয়ে সব কিছু ওলটপালট করে দেয়? প্রচলিত আধুনিক যুদ্ধবিদ্যা আর যুদ্ধরীতিকে সমর্থন না করলেও তার কাছে সব ব্যর্থ হয়। প্রাচীন প্রথাগত সিজারীয় যুদ্ধরীতি এই প্রতিভাধর পুরুষের কাছে ব্যর্থ প্রতিপন্ন হওয়ায় সিজারপন্থী বীর সেনানায়কদের মনে এই পুরুষের বিরুদ্ধে এক প্রবল ঘৃণার উদ্রেক হয়। ১৮১৫ সালের ১৮ জুন এই ঘৃণা শেষ কথা বলে দেয়, লোদি, মাঞ্চুয়া, ম্যারেঙ্গো ও আর্কোলায় লব্ধ জয়ের সব গৌরবকে মুছে দিয়ে তার উপর ওয়াটারলু’র বিরাট পরাজয়ের কথা জ্বলন্ত অক্ষরে উল্কীর্ণ করে রাখে। এ যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে এক প্রতিভাধর পুরুষের পরাজয়। এটা হল নিয়তির বিরাট পরিহাস।
ওয়াটারলু যুদ্ধে একটি দ্বিতীয় শ্রেণির সেনাপতি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। এ যুদ্ধে যা আমাদের সবচেয়ে আকর্ষণ করে তা হল ইংল্যান্ড, ইংরেজদের একাগ্রতা, নিষ্ঠা আর সংকল্পের দৃঢ়তা, ইংরেজ রক্ত। ইংরেজ জাতির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য জিনিস হচ্ছে এই যে তাদের শক্তির উৎস হল কোনও সেনাপতি নয়, সে শক্তির উৎস হল জনগণ। অকৃতজ্ঞ ওয়েলিংটন তার বন্ধু রামরাস্টকে লিখেছিলেন, ১৮১৫ সালের ১৮ জুন ওয়াটারলুর যুদ্ধে তাঁর যে সেনাদল যুদ্ধ করে তারা ছিল অযোগ্য এবং অপদার্থ। কিন্তু ওয়াটারলু’র বনপ্রান্তরে যে সব দেহাস্থি পড়ে আছে তাদের কথা একবার ভেবে দেখ।
ইংল্যান্ড কিন্তু ওয়েলিংটনকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে, নিজেকে খর্ব করে ওয়েলিংটনকে বড় করে তাঁকে মহৎ করে তুলেছে। তিনি যেমন বীর ছিলেন তেমনি তার অধীনস্থ সৈন্যরাও বীর ছিল। একাগ্রতা ছিল তার একটা বড় গুণ। আমরা তা অস্বীকার করছি না, কিন্তু তার অধীনে যেসব পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈনিক যুদ্ধ করে তারাও তাঁর মতোই একাগ্র ও নিষ্ঠাবান ছিল। আমরা ইংল্যান্ডের জনগণ ও সেনাবাহিনীর প্রশংসা না করে পারছি না। পুরস্কার যদি দিতে হয় তাহলে সে পুরস্কার তাদের প্রাপ্য। লন্ডনে যে ওয়াটারলুর স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে যদি কোনও ব্যক্তিবিশেষের না হয়ে একটি জাতির ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করে তুলে ধরত তা হলে ভালো হত।
কিন্তু ইংরেজদের এসব কথা ভালো লাগবে না। তাদের ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের এবং আমাদের ১৭৮৯ সালের বিপ্লব সত্ত্বেও তারা সামন্তবাদী ব্যক্তিপূজার ভাবধারাকেই পোষণ করে অন্তরে। তারা উত্তরাধিকার এবং ব্যক্তিত্বের মহত্ত্বে বিশ্বাস করে। তারা অতুলনীয় শক্তি ও গৌরবের অধিকারী, কিন্তু তারা নিজেদের সাধারণ জনগণ হিসেবে
দেখে জাতি হিসেবে দেখে। তাদের জনগণ একজন লর্ডকে তাদের নেতা হিসেবে মেনে নেয়। শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় সব ঘৃণা ও অবজ্ঞা মেনে নয়, সৈনিকরা স্বেচ্ছায় প্রহৃত হয়। ইঙ্কারম্যানের যুদ্ধের একজন সামান্য সার্জেন্ট একটি গোটা সেনাদলকে বাঁচায়। কিন্তু যুদ্ধের নেতা লর্ড রাগলাত তার বিবরণে সে সার্জেন্টের নাম উল্লেখ করেননি, কারণ ইংল্যান্ডের সামরিক কর্তৃপক্ষ সামরিক বিবরণে কোনও পদস্থ অফিসার ছাড়া কোনও সৈনিকের নাম উল্লেখ করতে দেন না। তার কোনও রীতি নেই।
ওয়াটারলু যুদ্ধের সবচেয়ে আশ্চর্যের বস্তু হল দৈবের আনুকূল্য বৃষ্টিভেজা মাঠ, কাদায় ভরা পথঘাট, গ্লোশি’র অনুপস্থিতি, নেপোলিয়নকে ভুলপথে এবং রুশারকে ঠিকপথে নিয়ে যাওয়া প্রভৃতি অনুকূল ঘটনা এ যুদ্ধে এক প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে।
ওয়াটারলু রণক্ষেত্র আসলে এক ব্যাপক নরহত্যার লীলাক্ষেত্র। এ যুদ্ধে যে পরিমাণ সৈন্য যুদ্ধ করে সে পরিমাণ জায়গা ছিল না। খুব কম জায়গার মধ্যে এক বিরাট যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। নেপোলিয়নের সামনের জায়গা ছিল মাত্র তিন মাইল আর ওয়েলিংটনের ছিল মাত্র দু মাইল জায়গা। অথচ দু পক্ষে বাহাত্তর হাজার করে মোট এক লক্ষ পঁয়তাল্লিশ হাজার করে সৈন্যসংখ্যা ছিল। ফরাসিপক্ষে মৃত সৈন্যের সংখ্যা শতকরা ছাপ্পান্ন ভাগ আর ইংরেজ পক্ষে সম্মিলিত বাহিনীর মধ্যে শতকরা একত্রিশ ভাগ সৈনিক নিহত হয়।
