আজ এই জায়গাটার পাশ দিয়ে মাঠের ধার ঘেঁষে চলে যাওয়া রাস্তাটা লিভেলের পথে বোজ ভোর চারটের সময় একটা গাড়ি চলে যায়। অতীতের সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ আর এই বিরাট প্রান্তরজোড়া নরহত্যার ব্যাপক তাণ্ডবের কোনও কথা মনে না করেই ডাকপিয়ন জোসেপ মনের আনন্দে ঘোড়াটাকে চাবুক মারতে মারতে ডাকগাড়িটাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।
.
১৬
ওয়াটারলুর যুদ্ধ এমনই এক যুদ্ধ, যা বিজিত এবং বিজেতা উভয় পক্ষের কাছে এক দুয়ে রহস্যে ভরা। নেপোলিয়নের কাছে এ যুদ্ধ ছিল এক সন্ত্রাসের বস্তু। বুশারের কাছে এটা ছিল শুধু আগ্নেয়াস্ত্রের খেলা আর ওয়েলিংটন এ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি কিছু বুঝতেই পারেননি।
এ যুদ্ধ সম্বন্ধে আমরা এবার পরস্পরবিরুদ্ধ কয়েকটি বিবরণ তুলে ধরতে পারি। ফরাসি জেনারেল জোমিনি এ যুদ্ধের চারটি সংকটজনক মুহূর্তকে তুলে ধরে তার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছেন। জার্মান সেনাপতি মাফিং এ যুদ্ধকে তিনটি স্তরে ভাগ করেছেন। লেফটেন্যান্ট কর্নেল চারসই একমাত্র এ যুদ্ধের প্রকৃতি ও পরিণতির ব্যাখ্যা করতে পেরেছেন। তিনি বলেছেন ঐশ্বরিক বিধানের কাছে ব্যর্থ বিমূঢ় মানবাত্মার পরাজয়েই পরিসমাপ্তি লাভ করে এ যুদ্ধ। অন্য সব ঐতিহাসিক এ যুদ্ধের ব্যাপারে হতবুদ্ধি হয়ে আপন আপন বিহ্বলতার অন্ধকারে ঘুরপাক খেতে থাকেন। আপাতদৃষ্টিতে দেখতে গেলে দেখা যায়, এ যুদ্ধে জঙ্গি যুদ্ধোন্মাদ এক রাজতন্ত্রের পতন ঘটে, এ যুদ্ধের। ফলে অনেক রাজ্যের ভাঙা-গড়া চলতে থাকে। কিন্তু আসলে এ যুদ্ধ হল ঐশ্বরিক বিধানের খেলা, এতে মানুষের ভূমিকা খুবই কম।
এ যুদ্ধে ওয়েলিংটন বা বুশারের কোনও কৃতিত্ব যদি স্বীকার না করি তা হলে কি ইংল্যান্ড ও জার্মানির মহত্ত্বকে অস্বীকার করতে পারি? না, পারি না। ওয়াটারলুর যুদ্ধে যা-ই ঘটুক না কেন, তাতে এই দুটি দেশের মহত্ত্ব খর্ব হয় না কোনওক্রমে। অস্ত্রের খেলা বা কারসাজি যে যতই দেখাক না কেন, মানুষ বা কোনও দেশের জনগণ তার থেকে অনেক বড়। ইংল্যান্ড, জার্মানি বা ফ্রান্সের জাতিগত সব কৃতিত্ব, সব মহত্ত্ব কখনও শুধু অস্ত্রশক্তির মধ্যে নিহিত থাকতে পারে না। ওয়াটারলু’র রণপ্রান্তরে বুশার যখন উজ্জ্বল উন্মত্ত তরবারির খেলা খেলছিল তখন তার সব কৃতিত্বকে আচ্ছন্ন ও ম্লান করে দিয়ে জার্মানির গ্যেটে এক বিরাট গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে বিরাজ করছিলেন। ওয়েলিংটনের কৃতিত্বকে ম্লান করে দিয়ে ইংল্যান্ডে বিরাজ করছিলেন বায়রন। আমাদের এই শতাব্দীর নতুন প্রভাতে এক নতুন ভাবাদর্শের যে বিরাট আলোকবন্যা আসে তাতে ইংল্যান্ড ও জার্মান আপন আপন আলোয় ঐশ্বর্য দান করে। ওই সব দেশের লোকেরা চিন্তাশীল, তারা জগৎ ও জীবন সম্বন্ধে অনেক কিছু ভাবে বলেই তারা মহান। যে সব। মহৎ গুণের দ্বারা মানবসভ্যতাকে মহত্ত্ব দান করে তারা, সে সব গুণ তাদের নিজস্ব, তাদের অন্তর থেকে উদ্ভূত, বাইরের কোনও ঘটনাসঞ্জাত নয়। উনিশ শতকে তাদের ক্রমবর্ধমান মহত্ত্বের জন্য ওয়াটারলু যুদ্ধ কোনওক্রমেই দায়ী নয়। আকস্মিক বৃষ্টিপাতের প্রবলতার দ্বারা পুষ্ট কোনও শীর্ণ বিশুষ্ক নদীর মতো একমাত্র বর্বর জাতীয় লোকেরাই যুদ্ধজয়ের গৌরবের স্ফীতবক্ষ হয়ে ওঠে। বর্তমান যুগে কোনও সভ্য জাতির ভাগ্যের উন্নতি বা অবনতি কখনও কোনও সামরিক নেতার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না। মানবজাতির ক্ষেত্রে তাদের বিশেষ গুরুত্ব যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া অন্য কোনও ঘটনার ফলশ্রুতি। তাদের সম্মান, মর্যাদা, তাদের বিচ্ছুরিত প্রতিভার আলো কখনও কয়েকজন বীর বিজেতা সেনানায়কের দ্বারা সংগৃহীত সৈন্যসংখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। ভাগ্যের খেলার মতোই অনিশ্চিত যুদ্ধের জয়-পরাজয়। অনেক সময় দেখা যায় যুদ্ধে। পরাজিত কোনও দেশ বা জাতি এক অভাবনীয় উন্নতি ও অগ্রগতি লাভ করেছে। যেখানে। যুদ্ধের জয়ঢাক স্তব্ধ হয় সেখানেই জ্ঞান ও যুক্তির কণ্ঠস্বর শোনা যায়। ওয়াটারলু যুদ্ধের দুটো দিকই আমাদের ভেবে দেখতে হবে। এ যুদ্ধে লব্ধ জয় যেন পাশাখেলার এক দান, যা দৈবক্রমে একটি পক্ষকে জিতিয়ে দেয়।
এ যুদ্ধে একা ফ্রান্সের ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে আর সমগ্র ইউরোপ জয়লাভ করে। আর জয়ের প্রতীক স্বরূপ এক সিংহের মর্মরমূর্তি স্থাপন করা হয় ওয়াটারলু’র রণপ্রান্তরে।
এ যুদ্ধে যেন দুটি বাহিনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়নি। ইতিহাসের দুটি গুরুত্বপূর্ণ যুগ অবতীর্ণ হয়েছে এক আপোসহীন সগ্রামে। নেপোলিয়ন আর ওয়েলিংটন যেন পরস্পরের শত্রু নয়, তারা যেন পরস্পরবিরুদ্ধ দুটি ভাবধারা। দুটি পক্ষের মধ্যে এমন বৈপরীত্য এর আগে কখনও দেখা যায়নি। একদিকে ছিল দূরদর্শিতা, যথার্থ কূটনৈতিক বিচার-বিবেচনা, শান্ত শীতল নিষ্ঠা, সঠিক সামরিক জ্ঞান। একদিকে অনেক বাড়তি সৈন্য আগে হতে সংরক্ষিত করে রাখা হয়, পশ্চাদপসরণের পথ আগেই পরিষ্কার করে রাখা হয়, চারপাশের ভূ-প্রকৃতির যথাসম্ভব সুযোগ লাভ করার চেষ্টা করা হয়, অর্থাৎ সব কিছুই এক বৈজ্ঞানিক যুক্তি ও ছকবাঁধা পরিকল্পনা অনুসারে করা হয়। কোনও কিছুই দৈবের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে ছিল শুধু অন্তর্দৃষ্টি দৈবনির্ভরতা, সামরিক হঠকারিতা, বিদ্যুতের থেকে ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন একজোড়া ঈগলচক্ষু সমরকৌশলের সঙ্গে মিশ্রিত প্রবল আবেগপ্রবণতা, নিয়তিবাদ, এক দুয়ে মানবপ্রকৃতির যত সব দুর্বোধ্য রহস্য। সামরিক বিজ্ঞানের সঙ্গে মিশ্রিত এক ভাগ্যবিশ্বাস, যা একই সঙ্গে যুদ্ধের কাজকে গৌরবদান করে এবং সে গৌরবকে খর্ব করে। মাঠ, বন, পাহাড়, নদী প্রভৃতি প্রাকৃতিক বস্তুগুলোকেও কাজে লাগাবার চেষ্টা, এক স্বৈরাচারী অত্যাচারী শাসকের দুর্পিত আস্ফালন। ওয়েলিংটন ছিলেন যুদ্ধের চিত্রকর মাইকেল অ্যাঞ্জেলো। এইভাবে প্রতিভার পরাভব ঘটে বিজ্ঞানের শাসন ও আঙ্কিক নিয়মের কাছে।
