.
১৪
ক্রমাগত তরঙ্গাঘাতে অবিচল এক পাহাড়ের মতো ফরাসি বাহিনীর কয়েকটি দল রাত্রি পর্যন্ত তখনও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। রাত্রির আগমন মানেই সাক্ষাৎ মৃত্যুর আগমন। তবু তারা অবিকম্পিত চিত্তে রাত্রি আর মৃত্যুর দ্বৈত অন্ধকারের করাল গ্রাসের দ্বারা অগ্রিস্ত হবার জন্য নীরবে প্রতীক্ষা করছিল। প্রতিটি ছোট ঘোট সেনাদল মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করে একে একে। কোনও দল রসোমির পাহাড় অঞ্চলে আবার কোনও দল মঁ সেন্ট জঁর মালভূমিতে শেষ মৃত্যুযন্ত্রণা সহ্য করার জন্য অপেক্ষা করছিল। পরাভূত ও পরিত্যক্ত হলেও তাদের দৃঢ়তা তখনও অটুট ছিল। এইভাবে উলস্, ওয়াগ্রাম, জেনা আর ফ্রেদন্যাত্তের মৃত্যু হয়।
রাত্রি ন’টার সময় মঁ সেন্ট জঁর মালভূমির নিচের দিকের ঢালুতে একটি মাত্র ফরাসি সেনাদল বিজেতা সৈন্যদের গুলিবর্ষণের সামনে দাঁড়িয়ে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে যাচ্ছিল। কামব্রোনে নামে এক অখ্যাত অফিসার ছিল এ দলের নেতা। সেই দুর্মর সেনাদলের প্রতিটি সৈনিক একে একে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছিল। তবু তারা বিজেতা সৈন্যদের রাইফেল থেকে বর্ষিত গুলির প্রত্যুত্তর দিচ্ছিল গুলিবর্ষণ করে। পলায়মান ফরাসি সেনারা পথে যেতে যেতে স্তিমিতপ্রায় বজ্রধ্বনির মতো শেষ যুদ্ধের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল।
শেষে যখন দেখা যায় মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকজন ফরাসি সৈন্য অবশিষ্ট আছে, যখন দেখা গেল জীবিতদের চেয়ে মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি এবং অসংখ্য মৃতদেহের স্তূপ উঁচু হয়ে উঠেছে তখন ইংরেজ বাহিনী আপনা থেকে বন্ধ করল গুলিবর্ষণ। বিজিতদের জীবিত সৈন্যরা দেখল গুলিবর্ষণ থেমে গেল। তবু তাদের মনে হল শত্রুপক্ষের কতকগুলি ছায়ামূর্তি নীরবে এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। তারা যেন যুদ্ধক্ষেত্রের ভূত। চারদিক একেবারে নিস্তব্ধ থাকা সত্ত্বেও তাদের মনে হচ্ছিল কারা যেন গুলিবর্ষণ করছে, মনে হচ্ছিল বিশাল আকারের অসংখ্য কামান দিগন্তকে স্পর্শ করছে। বিজেতাদের লণ্ঠনের আলোগুলো অন্ধকার রণভূমিতে জ্বলতে থাকা বাঘের চোখের মতো দেখাচ্ছিল।
বিজেতারা অবশিষ্ট ফরাসি সৈন্যদের এই দলটিকে দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যায়। তাদের সাহস, বীরত্ব ও দৃঢ়তার তুলঁনা হয় না। ইংরেজ বাহিনীর কনভিল, মেটল্যান্ড প্রমুখ অফিসাররা তাই ফরাসি সেনাদের প্রশ্ন করল, হে বীর ফরাসি সৈনিক, তোমরা আত্মসমর্পণ করবে না?
কামব্রোনে উত্তর করল, না মরব।
.
এ কথাটা ইতিহাসের বইয়ে লেখা হয়নি। অথচ এত বড় কথা আর কোনও ফরাসির মুখে উচ্চারিত হয়নি। এই রকম অনেক বড় কথাই নথিভুক্ত হয় না। কিন্তু আমাদের মতে সেদিনকার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বীরদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বীর হল কামব্রোনে।
নির্ভয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেওয়া মানেই মরা। কোনও লোক যদি মৃত্যুকে বরণ। করতে গিয়েও আহত হয়ে বেঁচে থাকে তা হলে তার কোনও দোষ নেই। ওয়াটারলুর যুদ্ধের প্রকৃত বিজেতা পরাভূত নেপোলিয়ন বা ওয়েলিংটন নন। পরাজিত হতে হতে কোনও রকমে জয়লাভ করেন ওয়েলিংটন। আবার রুশারকে প্রকৃত বিজেতা বলা যায় না। এ যুদ্ধের প্রকৃত বিজেতা হল কামব্রোনে। বস্ত্র ও বিদ্যুতের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের। অগ্রাহ্য করাই হল প্রকৃত জয়লাভ করা।
এইভাবে যারা সব বিপদ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে, যারা সমাধি-গহ্বরের মুখে এসে মৃত্যুকে উপহাস করতে পারে, যারা অস্ত্রাঘাতে ভূপাতিত হয়েও খাড়া হয়ে দাঁড়াতে পারে নিজের চেষ্টায়, যারা পরাভূত হয়েও ফ্রান্সের সমস্ত বীরত্ব ও সামরিক শক্তিকে মূর্ত করে তুলঁতে পারে নিজেদের অনমনীয় পরাক্রমের মধ্যে, তারা যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করতে না পারলেও ইতিহাসে এক বিরল খ্যাতি লাভ করে।
তখন বিজেতা ইংরেজ বাহিনীই যেন সারা ইউরোপের রাজা। সে বাহিনীর বিজয়ী সেনানায়করা হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে ফরাসি রক্ষী বাহিনীকে পদদলিত করে দর্পভরে আস্ফালন করে বেড়াচ্ছে সারা রণক্ষেত্র জুড়ে। তারা যেন নেপোলিয়নের সব গর্ব চূর্ণ করে তার মাথার উপর পা রেখে ব্যর্থ করে দিয়েছে তার অতীত জয়ের সমস্ত গৌরবকে। ফরাসিদের সব গেছে, আছে শুধু কামব্রোনে যে আত্মসমর্পণের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে ইংরেজদের বিজয়গৌরবকে উপহাস করেছে। আসলে এই অপরাজেয় কামব্রোনেই প্রকৃত বিজেতা। সে ইংরেজদের প্রস্তাবটা প্রত্যাখ্যান করার সঙ্গে সঙ্গে যে দানবিক ঘৃণার কথাটা ছুঁড়ে দেয় তা দিয়ে সে যেন সম্রাটের প্রতিভূ হিসেবে সমগ্র ইউরোপের বিজেতা পক্ষের ওপর এক চরম আঘাত হানতে চায়। আসলে সে যেন যুদ্ধোন্মাদ সব রাজশক্তিকেই হেয়জ্ঞান করছিল। সে যেন বিপ্লবের প্রতীক। অতীত ফরাসি বিপ্লবের নেতা দাঁতন যেন কথা বলছিল তার মুখ দিয়ে।
ইংরেজ বাহিনীর এক নেতা হুকুম দিতেই আবার কতকগুলি আগ্নেয়াস্ত্র গর্জে উঠল। পাহাড়ের ধারগুলো কেঁপে উঠল। প্রথমে এক ঘন ধোয়ার মেঘে সবকিছু আচ্ছন্ন হয়ে থাকায় কিছুই দেখতে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ধোয়াটা কেটে যেতে চাঁদের আলোয় দেখা গেল কামব্রোনের নেতৃত্বে যে কয়জন মুষ্টিমেয় অবশিষ্ট ফরাসি সৈন্য মৃত্যুপণ লড়াই করে যাচ্ছিল, যারা আপন আপন ক্ষেত্র ছেড়ে এক পা-ও সরে যায়নি অথবা পালাবার কোনও চেষ্টা করেনি, তারা সবাই লুটিয়ে পড়েছে মাটিতে। তাদের কেউ আর জীবিত নেই। চারদিকে শুধু মৃতদেহগুলো ছড়িয়ে পড়ে আছে। তাজা রক্তে ভিজে গেছে মঁ সেন্ট জা’র মাটি।
