কিন্তু তাঁর তখন মৃত্যু হয়নি। তিনি উন্মাদের মতো দুয়েত দানলকে ডেকে বললেন, কেন তুমি এখনও মরনি?
তার পর তিনি নিজের সম্বন্ধে বললেন, একটা বুলেটও কি আমার মৃত্যু ঘটাতে পারে? আমি শত্রুপক্ষের বুলেট আমার পেটের মধ্যে ধারণ করতে চাই।
কিন্তু তিনি যা-ই বলুন, তাঁর মৃত্যু ফরাসিদের হাতে সংরক্ষিত ছিল। পরে ১৮১৫ সালের ৭ অক্টোবর ফরাসি চেম্বার বা আইনসভা তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।
.
১৩
ফরাসি রক্ষী বাহিনীর সামনের দিকে বিরাট গোলমাল দেখা দেয়।
হুগোৰ্মত, লা হাই সেন্ত, প্যানোলোত্তে, প্ল্যানশেনয়েত–সব জায়গাতেই ফরাসি সেনাবাহিনীর পতন ঘটছিল। ছত্রভঙ্গ ছিন্নভিন্ন সেনাবাহিনী বিগলিত হিমবাহের মতোই পতনশীল। তাদের কোনও কাণ্ডজ্ঞান বা যুক্তিবোধ থাকে না। তাদের মনে সব আবেগ-অনুভূতি ভারসাম্য হারিয়ে বিপর্যস্ত ও বিশৃঙ্খলাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
জেনারেল আর একটা ঘোড়া জোগাড় করে টুপিহীন মাথায় ও নিরস্ত্র অবস্থায় ব্রাসেলস রোডের মুখে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া পলায়নমান ফরাসি সৈনিকদের তিনি আটকাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু তারা থামল না, শুধু মার্শাল লে দীর্ঘজীবী হোন এই ধ্বনি দিতে দিতে পালিয়ে গেল। তিনি তাদের কাছে অনেক কাতর আবেদন জানালেন, অনেক অপমান করলেন। কিন্তু তারা শুনল না তার কথা। দ্রুয়েত্তের অধীনস্থ দুটি সেনাদল একদিকে উলহানের তরবারি আর অন্যদিকে ওয়েলিংটনের বন্দুকের গুলির মাঝখানে পড়ে এদিক-ওদিক ঘুরছিল। ধ্বংসের মুখে সেনাবাহিনী একবার ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে তাদের আর বুদ্ধিবিবেচনা থাকে না। তারা তখন পালিয়ে যাবার পথ করে নেবার জন্য একে অন্যকে আঘাত করে। নেপোলিয়ন নিজে ঘোড়ায় চেপে পলায়নমান সৈনিকদের আটকে রাখার জন্য অনেক চেষ্টা করলেন, অনেক ভয় দেখালেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হল তার।
বাঁদিকে লোবাউ আর ডান দিকে রিলে আক্রমণের ঢেউয়ে ভেসে গেল। গোলন্দাজ বাহিনী অস্ত্রবাহী গাড়িগুলো থেকে ঘোড়াগুলোকে খুলে তাড়িয়ে দিল। ওল্টানো কামান আর মালবাহী ওয়াগনগুলো রাস্তা আটকে থাকায় পালাতে না পেরে আরও অনেক লোক মারা গেল। যেসব ফরাসি সৈন্য তাদের অফিসারদের আদেশ অমান্য করে অস্ত্র ফেলে গাঁয়ের রাস্তা ও অলিগলি, মাঠ ও পাহাড় দিয়ে প্রাণভয়ে পালাচ্ছিল, জিতেনের প্রুশীয় অশ্বারোহী আসার সঙ্গে সঙ্গে হত্যার তাণ্ডব চালাতে লাগল তাদের উপর। চল্লিশ হাজার। ফরাসি সৈন্য যারা একদিন সিংহের বিক্রমে যুদ্ধ করে, তারা আজ জিতেনের হাতে বধ্য ভেড়ায় পরিণত হল।
গেনাঞ্চেতে লোবাউ তিন শশা সৈন্যকে কোনও রকমে জড়ো করে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখল। গাঁয়ে ঢোকার রাস্তাটা বন্ধ করে দিল লোবাউ। প্রুশীয় সেনাবাহিনী গুলি চালিয়ে আবার যুদ্ধ শুরু করল নতুনভাবে। গাঁয়ে ঢোকার মুখে একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ির ইটের খাঁজে খাঁজে সে আক্রমণের চিহ্ন আজও দেখা যায়। রুশার তার সেনাবাহিনীকে হুকুম দিল গাঁয়ে ঢোকার মুখে অবরুদ্ধ ফরাসি সৈন্যদের একজনকেও যেন ছেড়ে না। দেয়। রোগেত ঘোষণা করল ফরাসিদের যে কেউ প্রুশীয় সৈন্যকে বন্দি করবে তাকে গুলি করে মারা হবে। ফরাসি সেনাপতি দুশমে গেলাগ্লে গাঁয়ের এক হোটেলের সামনে ধরা পড়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে তার তরবারিটা একজন শীয় সামরিক অফিসারকে দিল। অফিসার সে তরবারি গ্রহণ করেই তাকে হত্যা করল। শুধু গেলাপ্পে নয়, কোয়াত্রে ব্রাস, গসেলি, ফ্রাসনে, শার্লেরা প্রভৃতি গাঁয়ের মধ্যেও আশ্রয়গ্রহণরত ফরাসিদের ধরে ধরে হত্যা করা হল।
কিন্তু যে বীর সেনাবাহিনীর বিরল বীরতু একদিন সারা জগৎকে স্তম্ভিত করে, তাদের এই সর্বাত্মক ধ্বংসের কি কোনও কারণ ছিল না? হ্যাঁ, অবশ্যই ছিল। অপ্রাকৃত অতিলৌকিক ন্যায়বিচারের এক বিরাট ছায়া ব্যাপ্ত করে ছিল ওয়াটারলুর যুদ্ধক্ষেত্রকে। এটি হল মানবজাতির থেকে বেশি শক্তিধর এক পুরুষের চরম ভাগ্যবিপর্যয়ের দিন। সেই কারণেই এতগুলো ভীতসন্ত্রস্ত মানুষকে মাথা নত করতে হয়, এতগুলো বীর সৈনিককে আত্মসমর্পণ করতে হয়। সেদিন মানবজাতির গতি এক নতুন দিকে মোড় ফেরে। ওয়াটারলু’র রণক্ষেত্রে জন্মগ্রহণ করে এক নতুন শতাব্দী। যাতে এক বিরাট শতাব্দী জন্ম নিতে পারে তার জন্য এক বিরাট প্রতিভাধর পুরুষকে নিঃশব্দে বিদায় নিতে হয় বিশ্বরাজনীতির রঙ্গমঞ্চ থেকে। যিনি সকল কারণের কারণ, যার ন্যায়বিচার অবিসংবাদিত, সেই ঈশ্বরই নিজের হাতে তুলে নেন ওয়াটারলুর যুদ্ধের ভার। তিনি শুধু তার অমোঘ অপ্রাকৃত ন্যায়বিচারের ছায়াপাত করেননি ওয়াটারলু’র উপর, সর্বধ্বংসী এক বজ্রপাতের দ্বারা বিজিতদের দান করেন এক শোচনীয় মর্মান্তিক পরিণতি।
রাত্রির অন্ধকারে গেলাঞ্চেতে বাট্রান্ড আর বার্নার্দ নামে দু জন ফরাসি অফিসার কোটরাগত ম্লান চক্ষুবিশিষ্ট একজনকে সঙ্গে নিয়ে এসে উপস্থিত হয়। সে লোকটি যেন পরাজয়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে এইখানে এসে ঘোড়া থেকে নেমে ঘোড়ার লাগাম ধরে একা ওয়াটারলু’র পথে হেঁটে যায়। এই লোকটিই হল নেপোলিয়ন। তিনি যেন শূন্য রণপ্রান্তরের উপর দিয়ে তখনও এগিয়ে যাবার চেষ্টা করছিলেন। স্বপ্নভঙ্গ আশাহত এক মানুষ যেন তাঁর নিবিড় নিদ্রার মধ্যেই লক্ষ্যহীন উদ্দেশ্যহীন এক অজানার পথে নিঃশব্দ পদসঞ্চারে কোথায় এগিয়ে চলেছিলেন তা তিনি নিজেই জানেন না।
