ব্লুশারের সহকারী যে চাষি বালকটি বুলোকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সে যদি তাকে প্ল্যানশেনয়েতের নিচের দিক দিয়ে নিয়ে না গিয়ে ফ্রিশেৰ্মতের উপর দিক দিয়ে নিয়ে যেত তা হলে উনবিংশ শতাব্দীর গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণ অন্যরূপ ধারণ করত। নেপোলিয়ন তা হলে ওয়াটারলু যুদ্ধে জয়লাভ করতেন। প্ল্যানশেনেয়েতের নিচের দিকে না গিয়ে অন্য যে কোনও পথ ধরলে প্রুশীয় বাহিনী সেই দুর্গম খালটাতে এসে পড়ত এবং তা হলে তাদের অস্ত্রবাহী গাড়িগুলো সে খাল পার হতে পারত না এবং তা হলে বুলোও ঠিক সময়ে আসতে পারত না। প্রুশীয় সেনাপতি মাফিং বলেন, আর এক ঘণ্টা দেরি হয়ে গেলে সর্বনাশ হয়ে যেত।
অবশ্য দেরি এমনিতেই কিছুটা হয়ে যায়। বুলো দিও লে সঁতে রাত্রিযাপন করে সকালে রওনা হয় এবং রাস্তা খারাপ থাকার জন্য পথে দেরি হয়ে যায় তার। তাছাড়া ওয়েভারে সরু পুলটা দিয়ে ভাইল নদী পার হতে হয়েছিল তাকে। সেই পুলে যাবার গ্রাম্য পথের দু ধারের জ্বলন্ত বাড়িগুলোর মধ্য দিয়ে এগোতে পারছিল না। তাই আগুন নেভা পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়। বুলোর অগ্রবর্তী বাহিনী দুপুরের আগে সেন্ট ল্যাম্বাৰ্ত চ্যাপেলে পৌঁছতে পারেনি।
যুদ্ধটা যদি দু ঘন্টা আগে শুরু হত তা হলে বেলা চারটের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যেত। তা হলে ব্লশার অসময়ে এসে নেপোলিয়নের হাতে ধরা পড়ত। একেই বলে নিষ্ঠুর নিয়তির অকল্পনীয় বিধান।
সম্রাটই প্রথম চোখের উপর ফিল্ডগ্লাসটা নিয়ে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে কী একটা দেখে সেদিকে মনোযোগ দিলেন। তিনি বললেন, মেঘের মতো কী একটা জিনিস মনে হচ্ছে। আমার তো মনে হচ্ছে সৈন্যবাহিনী। তিনি ডিউক অফ ভালমাতিয়াকে বললেন, সুল, চ্যাপেল সেন্ট ল্যাম্বার্তের চারদিকে কিছু দেখতে পাচ্ছ?
মার্শাল ভালমাতিয়া তার নিজের ফিল্ডগ্লাস দিয়ে দেখে বলল, চার থেকে পাঁচ হাজার লোক মহারাজ, নিশ্চয় গ্লোশি’র সেনাদল। আপাতস্থির সেই মেঘটার দিকে তখন সব সেনাপতিরা তাকিয়ে দেখতে লাগল। কয়েকজন অফিসার ভাবল সেটা সারিবদ্ধ মানুষের এক বিরাট দল। কিন্তু আবার অনেকে ভাবল অসংখ্য গাছের এক জটলা। সম্রাট তৎক্ষণাৎ সোমনের অধীনস্থ এক হালকা অশ্বারোহী দলকে ব্যাপারটা কী তা দেখার জন্য পাঠিয়ে দিলেন।
ব্যাপারটা এই যে তার অগ্রবর্তী বাহিনী দুর্বল থাকায় বুলো এগোয়নি। সে এই হুকুম দিয়েছিল যে যুদ্ধে যোগ দেয়ার আগেই প্রধান দলকে সঙ্ঘবদ্ধ করতে হবে। ব্লুশার হয়তো আরও দেরি করে আসত। কিন্তু পাঁচটা বাজতেই ওয়েলিংটনের শোচনীয় অবস্থা দেখে নিজেই বুলোকে আক্রমণ করার হুকুম দিল। বলল, ইংরেজদের অন্তত কিছুটা বিশ্রাম দিতে হবে।
এর কিছু পরেই লসথিন, হিলার, হ্যাঁক ও রিসেল লোবাউ-এর বাহিনীর আগে সৈন্য সমাবেশ করতে লাগল। এই সব সৈন্য বয় দ্য প্যারিস থেকে আনা। প্ল্যানশেনয়েতে তখনও আগুন জ্বলছিল। তবু তাদের অস্ত্রবাহিনী তাদের কামান থেকে যে গোলা বর্ষণ করছিল তা নেপোলিয়নের পেছনের রক্ষী বাহিনীর কাছ পর্যন্ত যাচ্ছিল।
.
১২
এর পরের ঘটনা আমাদের সব জানা। এক তৃতীয় দলের আকস্মিক আবির্ভাব যুদ্ধের গতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ছত্রিশটা কামান একযোগে বজ্রের মতো গর্জন করে উঠল। ব্লুশার নিজে তার অশ্বারোহীদল নিয়ে এগিয়ে এল। ইংরেজ ও প্রশীয় বাহিনীর মিলিত আক্রমণের চাপে ফরাসি বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। সামনে এবং দু পাশে, বিপদের মুখে ফরাসি বাহিনী প্রাণপণ লড়াই করে যেতে লাগল। তাদের মৃত্যু অনিবার্য জেনে ‘ম্রাট দীর্ঘজীবী হোন’ বলে ধ্বনি দিতে লাগল তারা।
সারাদিন আকাশে মেঘ ছিল। কিন্তু সন্ধে আটটার সময় সব মেঘ কেটে গেল। আকাশে লাল আলো দেখা গেল। সে আলোয় এলগাছে ঘেরা লিভেলে যাবার পথটা দেখা যাচ্ছিল। যে সূর্য অস্টারলিৎস যুদ্ধে উদিত হয় সে সূর্য একটু আগেই অস্ত গেছে।
এই শেষ যুদ্ধে এক-একজন সেনাপতি এক-একদল সৈন্য নিয়ে যুদ্ধ করতে লাগল। ফ্ৰিয়াত, মাইকেল, রোগেত, হার্লেত, পোর্লেত দ্য মভ প্রভৃতি সব সেনাপতিরাই সেখানে ছিল। ঈগলের ব্যাজ দ্বারা সজ্জিত লম্বা লম্বা শিরস্ত্রাণ পরিহিত বোমারু বাহিনী যখন ভিড় ঠেলে এগিয়ে এল তখন ফ্রান্সের সামরিক ঐশ্বর্য দেখে বিজেতা বাহিনীর লোকেরাও ইতস্তত করতে লাগল। ওয়েলিংটন তখন চিৎকার করে উঠলেন, সামনের রক্ষীবাহিনীর দিকে সোজা গুলি চালাও। তখন ঝোপেঝাড়ে লুকিয়ে-থাকা লাল কোটপরা ইংরেজ সৈন্যরা বেরিয়ে এসে ফরাসি বাহিনীকে আক্রমণ করল একযোগে। দু পক্ষই উন্মত্ত হয়ে উঠল যুদ্ধে। শুরু হল হত্যার ব্যাপক তাণ্ডব।
সম্রাটের রক্ষী বাহিনী দারুণ বিপর্যয়ের মুখে ছত্রভঙ্গ হয়েও নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও এগোতে লাগল। প্রতি পদক্ষেপেই তাদের মৃত্যু ঘটতে লাগল। তবু কোনও সৈনিক। একবারও কোনও কুণ্ঠাবোধ করল না। প্রতিটি সৈনিকই তাদের আপন আপন দলের। সেনাপতিদের মতোই সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করতে লাগল। আত্মহত্যার সেই ভয়ঙ্কর পথ হতে কেউ বিচ্যুত হল না।
সমস্ত বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলেন জেনারেল লে। তার পর পর পাঁচটি ঘোড়া নিহত হল। তার হাতের তরবারির আধখানা ভেঙে যায়। একটি বুলেটের আঘাত তার ঈগল ব্যাজ বিদ্ধ করে তার কাঁধে লাগে। প্রচুর রক্ত ঝরতে থাকে। তার সর্বাঙ্গে ঘাম ঝরছিল। তার মুখে ফেনা ভাঙছিল। তিনি তবু তার আধভাঙা তরবারিটা উত্তোলিত করে চিৎকার করে বলতে লাগলেন, এইভাবে ফ্রান্সের এক মার্শাল মৃত্যুবরণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে।
