মনে হল এ যেন কোনও মানুষের যুদ্ধ নয়। সারা যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে শুধু প্রচণ্ড ক্রোধ আর সাহসের ঝড় বয়ে যাচ্ছে, অসংখ্য উৎক্ষিপ্ত উজ্জ্বল তরবারির বিদ্যুঝলকের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সমারেটের চৌদ্দ শো অশ্বারোহী সৈন্যের মধ্যে দু শো সৈন্য মারা গেল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফুলার নিহত হল। জেনারেল লেফেবভ্রের বর্ম বাহিনী আনাল। র্ম সেন্ট জাঁ একবার দখল করার পর আবার একবার হাতছাড়া হয়ে গেল। এইভাবে বারবার দখল-বেদখলের খেলা চলতে লাগল। ইংরেজরা বিভিন্ন দিক থেকে আক্রান্ত হয়েও যেখানে ছিল সেখানেই রয়ে গেল। একটার পর একটা করে লে’র চারটে ঘোড়া মারা গেল। ফরাসি বর্মধারী অশ্বারোহী বাহিনীর অর্ধেক সৈন্য নিহত হল। যুদ্ধ চলল পুরো ছয় ঘণ্টা ধরে।
ইংরেজ বাহিনী বিশেষভাবে বিচলিত হয়ে পড়ল। তারা প্রবল ঘা খেল। তাদের এ বিষয়ে কিছুমাত্র সন্দেহ রইল না যে খালের দুর্ঘটনায় ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনীর এত সৈন্য যদি মারা না যেত এবং তাদের এত ক্ষতি না হত তা হলে আজকের এই যুদ্ধে তারা অবশ্যই জয়লাভ করত। ক্লিনটন ফরাসি অশ্বারোহীদের বীরত্ব দেখে আশ্চর্য হয়ে যান। ওয়েলিংটন নিজে অর্ধপরাজিত অবস্থায় ফরাসিদের লক্ষ করে বলে উঠলেন, চমৎকার!
ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনী ইংরেজ বাহিনীর সাতটি দলকে ছত্রভঙ্গ করে দিল। তাদের ষাটটি কামান দখল করে নিল। তাদের দুটি পতাকাও হস্তগত করল। সম্রাটকে সেই পতাকাগুলো দেওয়া হয়। তিনি তখন ছিলেন বেল অ্যানায়েন্সের খামারে।
ওয়েলিংটনের অবস্থা সত্যিই অনেকটা খারাপ হয়ে যায়। মালভূমিতে তখনও যুদ্ধ চলতে থাকে।
ওয়েলিংটন বুঝতে পারেন, তাঁর বিপদ ঘনিয়ে এসেছে। অবশ্য ফরাসি বাহিনী তাদের অভীষ্ট সিদ্ধ করতে পারেনি। তারা ইংরেজ বাহিনীর মধ্যভাগে পৌঁছতে পারেনি বা সেখানে ঢুকে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পারেনি। উভয় পক্ষই মালভূমিতে আছে। তবে ইংরেজ পক্ষের দখলে আছে মালভূমির বেশির ভাগ জায়গা। গোটা গাঁ আর তার চারপাশের অঞ্চলটা এখনও তাদের অধিকারে আছে। অন্যদিকে জেনারেল লে শুধু উপত্যকাঁদেশ আর তার ঢালু অংশটা অধিকার করে আছেন।
তবে ইংরেজদের ক্ষতিই বেশি। সেই ক্ষতি প্রতিকারের অতীত। বাঁ দিক থেকে কেম্পন্টু সাহায্যের জন্য চিৎকার করছিল। আরও সৈন্য পাঠাতে বলছিল। কিন্তু ওয়েলিংটন তাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, আর সৈন্য পাওয়া যাবে না। শেষ পর্যন্ত তাদের লড়াই করে মৃত্যুবরণ করতে হবে।
আর ঠিক সেই সময়ে জেনারেল লে-ও নেপোলিয়নের কাছে আরও একটা পদাতিক বাহিনী পাঠাবার জন্য আবেদন জানাচ্ছিলেন। দুটি ঘটনার মধ্যে কী আশ্চর্য মিল। এর দ্বারা বোঝা যায় দু পক্ষেরই সৈন্যসংখ্যা কত হ্রাস পায়। লে’র আবেদনের উত্তরে নেপোলিয়ন বলে ওঠেন, আর সৈন্য আমি কোথায় পাব? আমি কি সৈন্য নিজের হাতে গড়ব?।
ওয়েলিংটনের অবস্থা আরও খারাপ। ফরাসি বর্মধারী অশ্বারোহী বাহিনীর আক্রমণে তার পদাতিক বাহিনী এমনভাবে ছত্রভঙ্গ ও বিধ্বস্ত হয় যে বিশাল বাহিনীর মধ্যে অল্পসংখ্যক সৈন্যের কয়েকটি দল মাত্র অবশিষ্ট থাকে। বড় বড় সেনাপতিরা যুদ্ধে নিহত হওয়ায় ক্যাপ্টেন আর লেফটেন্যান্টের মতো কয়েকজন নিম্নতম অফিসার সেসব দলের নেতৃত্ব করতে থাকেন। তার ওপর কাম্বারল্যান্ডের নেতৃত্বে হ্যাঁনোভারের সেনাদল সয়নের বনের ভেতর দিয়ে পালিয়ে যায়। এর জন্য কর্নেল হ্যাঁককে সামরিক বিচারে কোর্ট মার্শাল করা হয়। হ্যাঁনোভারের পলাতক সেনাদল ব্রাসেলস-এ গিয়ে প্রচার করে যুদ্ধে ইংরেজদের অবস্থা খুব খারাপ। ওলন্দাজরাও ভীত হয়ে ওঠে। ফরাসি বাহিনীকে ক্রমশই এগিয়ে আসতে দেখে ইংরেজদের মিত্রপক্ষের অনেক সেনাদল গাড়িতে করে আহত ও মৃতদের চাপিয়ে অস্ত্রবাহিনীসহ পালিয়ে যায়। বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ হতে জানা যায় পলাতক বাহিনীগুলো সারবন্দিভাবে ব্রাসেলস-এর দিকে চলে যায়। চারদিকে ব্যাপক সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়ল। এই সন্ত্রাসের কথাটা মালিনেতে প্রিন্স দ্য কাদের কানে গেল এবং কেন্টে রাজা অষ্টাদশ লুইও শুনলেন। র্ম সেন্ট জঁ-তে যুদ্ধের জন্য নির্মিত হাসপাতালের পেছনে কিছু বাড়তি সংরক্ষিত সৈন্য এবং ভিভিয়ান ও ভঁদেলিউ-এর সেনাদল ছাড়া ওয়েলিংটনের হাতে কোনও অশ্বারোহীদল ছিল না। তার ওপর তাঁর অনেক কামান অকেজো হয়ে পড়ে। এই বিবরণ দান করে সাইবোর্ল আর প্রিঙ্গল। এই বিবরণের মধ্যে কিছুটা অবশ্য অত্যুক্তি থাকতে পারে। তারা বলে, ইংরেজ বাহিনীর। সৈন্যসংখ্যা তখন কমে বত্রিশ হাজারে দাঁড়ায়। ডিউক অফ ওয়েলিংটন তবু শান্তভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, তবে তাঁর ঠোঁট দুটো সাদা আর মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে যায়। ইংরেজদের সদর দপ্তরে অস্ট্রিয়া ও ফরাসি রাষ্ট্রদূতরা সবকিছু শুনে মনে মনে ভাবতে থাকে সেদিনকার যুদ্ধে ইংরেজ বাহিনী হেরে গেছে। বিকাল পাঁচটার সময় ওয়েলিংটন তার হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। তাঁর মুখ থেকে শুধু একটা কথা বেরিয়ে এল রুশার অথবা অন্ধকার।
ঠিক এমন সময়ে দূরে ফ্রেশোর্মতের কাছে সারবন্দি বহু বেয়নেট এক সঙ্গে বেলাশেষের আলোয় ঝলসে উঠল।
.
১১
নেপোলিয়নের মর্মান্তিক ভ্রান্তির সব কথা সকলেই জানে। তিনি গ্রোশি’র খোঁজ করছিলেন। কিন্তু তার জায়গায় এল রুশার। জীবনের পরিবর্তে এল মৃত্যু। এইভাবে তাঁর নিয়তি এক ভয়ঙ্কর প্রতিকূলতায় মূর্ত হয়ে ওঠে। বিশ্বজয়ের এক উদ্ধত স্বপ্নে বিভোর তার চোখ দুটি সারা পৃথিবীর সিংহাসনের দিকে নিবদ্ধ থাকলেও সে চোখের দৃষ্টি সেন্ট হেলেনার করাল ছায়াকেই ডেকে আনে।
