ওয়াটারলু যুদ্ধে যদি নেপোলিয়ন জয়ী হতেন তা হলে ঊনবিংশ শতাব্দীর সাধারণ ঘটনাস্রোতকে বিপরীত মুখে চালনা করতে হত। আরও অনেক ঘটনা ঘটেছিল যাতে তাঁর কোনও হাত ছিল না এবং সেই সব ঘটনার প্রতিকূলতা প্রকট হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে।
নেপোলিয়নের মতো এক মহান পুরুষের পতনের সময় উপস্থিত হয়েছিল।
তার বিশাল ব্যক্তিত্ব মানবজাতিকে ছাড়িয়ে ক্রমশই উত্তুঙ্গ হয়ে উঠছিল। সারা বিশ্বে মানবিক ঘটনাগুলোর ওপর তার অপরিহার্য প্রভাবের অতিরিক্ত গুরুভার মানবজগতের মধ্যে সব ভারসাম্য নষ্ট করে দিয়েছিল। একটি মানুষের মধ্যে এমন অমিত প্রাণশক্তির পুঞ্জীভূত কেন্দ্রীকরণ, একটি মানুষের মনের মধ্যে এমন এক বিশাল জগতের অবধারণ সমগ্রভাবে মানবসভ্যতার পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। সুতরাং পরম বিচারক ঈশ্বরের এখন সবকিছু বিচার করে দেখতে হবে। মানবজাতির পক্ষে কোনটা শুভ বা কোনটা অশুভ হবে তা ঈশ্বরকেই ঠিক করতে হবে এবং তার সময় এসে গেছে। যে সব নীতির ওপর মানবজগতের পার্থিব-অপার্থিব সব ঘটনা নির্ভর করে সেই নীতিভঙ্গের অভিযোগেই অভিযুক্ত হলেন নেপোলিয়ন। অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, রক্তস্রোত, অসংখ্য মায়ের অশ্রুধারা সে অভিযোগের সপক্ষে ছিল সবচেয়ে বড় যুক্তি। সমগ্র পৃথিবী যখন পীড়ন আর অত্যাচারজনিত যন্ত্রণায় ভরে যায় তখন উর্ধ্বে আকাশের ছায়াতলে এক অশ্রুত বিলাপের ধ্বনি তরঙ্গায়িত হয়ে ওঠে।
স্বর্গলোকে দেবতাদের বিচারসভাতেই অভিযুক্ত হন নেপোলিয়ন। সেখানেই তিনি দণ্ডিত হন। কারণ দেবতাদের কাছে ক্রমশই বিরক্তিকর হয়ে উঠেছিলেন তিনি।
ওয়াটারলু শুধু এক সাধারণ যুদ্ধ নয়, জগতের গুরুত্বপূর্ণ এক গতি পরিবর্তন।
.
১০
খালটাতে দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজপক্ষ আক্রমণ করল ফরাসি বাহিনীকে। তেরোটি দল একযোগে গুলিবর্ষণ করতে লাগল। দুর্ঘটনায় জেনারেল ওদিয়েরের সেনাদলই ধ্বংস হয়। জেলর্দের দলের কোনও ক্ষতি হয়নি। ইংরেজদের গোলাবর্ষণের উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিতে লাগল জেল। এই আকস্মিক বিপর্যয় কিছুমাত্র দমিয়ে দিতে পারেনি তাদের। তাদের সৈন্যসংখ্যা যে পরিমাণে কমে যায় সেই পরিমাণে বেড়ে যায় তাদের অন্তরের সাহস আর উদ্যম।
লে বিপদের আভাস পেয়ে জেলর্দের বাহিনীকে বাঁ দিকে কিছুটা ঘুরিয়ে দেন। তাই সে বাহিনীর কোনও ক্ষতি হয়নি। ফরাসিদের বর্ম বাহিনীও জোর আক্রমণ শুরু করল।
যুদ্ধকালে এমন এক একটা সময় আসে যখন যুদ্ধরত সৈন্যদের দেহের মাংসগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে যায়। মরিয়া হয়ে ওঠা ফরাসি বাহিনীর নারকীয় আক্রমণের সামনে ইংরেজরা অবিচলিত এবং অতিকম্পিতভাবে যুদ্ধ করে যেতে লাগল। তাদের সৈন্যরা নতজানু হয়ে বেয়নেট ধরে ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনীর ঢেউকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে যেতে লাগল। তাদের পেছনের সৈন্যরা বন্দুক থেকে গুলিবর্ষণ করে যেতে লাগল। দ্বিতীয় সারির পেছনে থাকা অস্ত্রবাহিনীর লোকেরা বন্দুকে গুলি ভরে যেতে লাগল। বর্মধারী ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনী সমগ্রভাবে ইংরেজ বাহিনীকে ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগল। তাদের ঘোড়াগুলো বেয়নেটধারী ইংরেজ সেনাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে সারবদ্ধ মানুষের পাঁচিল ডিঙিয়ে ভেতরে গিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে চাইল।
উভয় পক্ষের সুসংবদ্ধ সেনাদলের মধ্যে ফাঁক ছিল। অনেক ইংরেজ সৈন্য মারা যাওয়ায় তাদের প্রতিরোধক্হ ফাঁকা হয়ে গেল। তবু তারা সমানে গুলি করে যেতে লাগল। ক্রমে যুদ্ধ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করল। গোলা ও গুলিবর্ষণরত ইংরেজ বাহিনী যেন অগ্নদগাররত এক জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির মুখের আকার ধারণ করল আর ফরাসি অশ্বারোহী বাহিনী এক মত্ত প্রভঞ্জনের রূপ পরিগ্রহ করল। ধোয়ার মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে উঠল চারদিক।
ইংরেজ বাহিনীর বাঁ দিকের সেনাদল ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল এবং প্রথম আক্রমণের আঘাতেই প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় তারা। এই সেনাদল ছিল ৭৫তম স্কট বাহিনী। একজন যাজক হত্যার সব তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে একটি ড্রামের উপর বসে বাঁশিতে সামরিক গান বাজিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ এক তরবারির আঘাতে তার গান থেমে যায়।
দুর্ঘটনার জন্য বর্মধারী অশ্বারোহীদের সংখ্যা অনেক কমে যায়। তার ওপর তাদের ওয়েলিংটনের সমগ্র বাহিনীর আক্রমণকে প্রতিহত করতে হচ্ছিল। কিন্তু তাদের শক্তি অনেক বেড়ে যায়। এক একজন সৈনিক দশজন সৈনিকের বল ধরে। ইংরেজ বাহিনীর অন্তর্গত হ্যাঁনোভারের সেনাদল কিছুটা দুর্বলতার পরিচয় দিলে ওয়েলিংটন তার নিজস্ব অশ্বারোহী বাহিনীকে খবর দিয়ে আনান। নেপোলিয়নও যদি এই সময় তার পদাতিক বাহিনীকে সেখানে আনাতেন তা হলে এ যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারতেন তিনি। দূরদৃষ্টির এই অভাব এক মারাত্মক ভুল হয়ে দাঁড়ায় তাঁর পক্ষে।
এমন সময় ফরাসি বর্মধারী অশ্বারোহী বাহিনী দু দিক থেকে আক্রান্ত হয়। একদিকে এক পদাতিক বাহিনী আর একদিকে সমারসেটের নেতৃত্বে চৌদ্দ শো অশ্বারোহী সৈনিকের এক বাহিনী। সমারসেটের ডান দিকে ছিল ভনবার্গের অধীনে এক অশ্বারোহী দল আর বাঁ দিকে ছিল ট্রিপের অধীনে এক বেলজিয়ান অশ্বারোহী দল। এই বেলজিয়ান দলই ছিল সংখ্যায় বেশি। এবার তাই ফরাসি বর্মধারী বাহিনী চারদিক থেকে আক্রান্ত হল। কিন্তু তারা ঘূর্ণিবায়ুর মতো ঘুরে ঘুরে যুদ্ধ করে যেতে লাগল। তাদের সাহস ও বীরত্বের সীমা-পরিসীমা ছিল না।
