ওয়েলিংটনের যুদ্ধবিরতি দেখার সঙ্গে সঙ্গে পুলকের রোমাঞ্চ জাগে নেপোলিয়নের মধ্যে। তিনি মঁ সেন্ট জা’র মালভূমির দিকে তাকিয়ে দেখলেন ইংরেজ বাহিনীর সেনারা। খুব তাড়াতাড়ি করে শিবির ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রকাশ্যে মার্চ করে যাচ্ছে না, গোপনে গা-ঢাকা দিয়ে যাচ্ছে। সম্রাটের চোখ দুটি তখনও জয়ের সম্ভাবনায় উজ্জ্বল। তাঁর মনে হল ওয়েলিংটন সয়নের বনের মধ্যে ঢুকে পালিয়ে যাবার সময় সদলবলে ধ্বংস হয়ে যাবে। ক্রেসি, পলিতিয়েব, মালপাকেত আর র্যামিনিয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নেওয়া হবে।
এই কথা ভেবে তিনি শেষবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রটা একবার দেখে নিলেন। তাঁর দেহরক্ষী তাঁর পেছনের ঢালু জায়গাটা থেকে এক ধর্মীয় ভীতির সঙ্গে তাকে লক্ষ করতে লাগল। তিনি ঢালু উপত্যকা, গাছপালা, যবের ক্ষেত, ঘাসে ঢাকা পথ–সব খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। বিশেষ করে তিনি ইংরেজরা লা হাই সেন্তে আর লিভেলের পথে গাছের গুঁড়ি ফেলে যে বাধার সৃষ্টি করে, তা দেখতে লাগলেন। ব্রেন লালিউদের পথের মোড়ে সেন্ট নিকোলাস গির্জাটা দেখা যাচ্ছিল। সেখানে ওলন্দাজ বেয়নেটধারী সেনাদলকে দেখা যাচ্ছিল। নেপোলিয়ন তার পথপ্রদর্শক লোকাস্তেকে কী জিজ্ঞাসা করতে সে মাথা নেড়ে কী জানাল হয়তো। সে বিশ্বাসঘাতকতা করে ভুল বলল।
তিনি এবার ঘোড়ায় চেপে স্থির হয়ে বসে রইলেন। ওয়েলিংটন চলে গেছে। একজন অশ্বারোহীকে দিয়ে তিনি প্যারিসে খবর পাঠালেন, যুদ্ধে তিনি জয়লাভ করেছেন। তার পর বর্মধারী ফরাসি সেনাবাহিনীকে মঁ সেন্ট জাঁ মালভূমি দখল করতে বললেন।
.
৯
বর্মধারী ফরাসি অশ্বারোহী সেনাবাহিনীর সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার। তারা ছাব্বিশটি দলে বিভক্ত হয়ে প্রায় এক মাইল দূরে অবস্থান করছিল মিলহদের নেতৃত্বে। তাদের পেছনে তাদের সাহায্যকারী হিসেবে ছিল লেফেব ভ্রে দেশনুত্তের এক বাছাই করা সেনাদল। তাদের মাথায় ছিল পালকহীন শিরস্ত্রাণ আর ধাতুর বক্ষবন্ধনী। এই বাহিনী যখন সকাল ন’টার সময় গেলাপ্পে আর ফ্রিশেৰ্মতের মাঝখানে গিয়ে অস্ত্রসম্ভারসহ দাঁড়াল তখন তা দেখে মূল সেনাদলের সবাই অবাক হয়ে গেল। তাদের বাঁ দিকে রইল কেলারম্যানের বর্ম বাহিনী আর ডান দিকে রইল মিলহদের অশ্বারোহী বাহিনী।
সম্রাটের দেহরক্ষী বাট্রন্ড সব ঠিক করে সাজিয়ে দিল। জেনারেল লে তার তরবারি বার করে তুলে ধরে সমগ্র বাহিনীর সামনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ শুরু করার হুকুম দিল।
সে দৃশ্য সত্যিই ভয়াবহ।
সেই বিরাট অশ্বারোহী বাহিনী দুটি সারিতে বিভক্ত হয়ে বেল অ্যালায়েন্সের ঢালু উপত্যকার উপর দিয়ে ক্রমশ নিচে নেমে যেতে লাগল। এরপর তারা মঁ সেন্ট জা’র মালভূমির ঢাল বেয়ে উঠে যাবে। তারা এমন সুসংবদ্ধভাবে যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল দুটিমাত্র মানুষ পাশাপাশি ঘোড়ায় চেপে যাচ্ছে। অথবা দুটি ঝকঝকে ইস্পাতের সাপ একেবেঁকে চলে যাচ্ছে।
ওয়েলিংটনের পদাতিক বাহিনী তেরোটি দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণের অপেক্ষায় মুহূর্ত গণনা করছিল। তারা বন্দুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা কিন্তু আক্রমণকারীদের দেখতে পাচ্ছিল না আর আক্রমণকারীরাও তাদের দেখতে পাচ্ছিল না। চারদিকে এক মৃত্যুশীতল স্তব্ধতা বিরাজ করছিল। সহসা সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে খা খা করে অসংখ্য অস্ত্রধারী লোক হাত তুলে চিৎকার করে উঠল ফরাসি ভাষায়। সম্রাট দীর্ঘজীবী হোন। মনে হল যেন এক বিরাট ভূমিকম্পের মতো এক ভয়ঙ্কর শব্দে এগিয়ে আসছে।
এমন সময় এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটল।
ফরাসি বাহিনীর ডান দিকে এবং ইংরেজ বাহিনীর বাঁ দিকে চলমান অশ্বারোহী বাহিনীর মধ্যে এক অবর্ণনীয় গোলমাল দেখা দিল। এই বাহিনী ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করতে যাবার পথে হঠাৎ একটা খাল দেখতে পায়। খালটা পনেরো ফুট গভীর এবং এতটা চওড়া যে ঘোড়াগুলো লাফ দিয়ে পার হতে পারবে না। আসলে খালটা হল ওহেন যাবার পথ।
আগের দিকে যেসব অশ্বারোহী সৈন্য ছিল তারা এমন সময়ে খালটা দেখতে পায় যে তখন রাশ টেনে ঘোড়াগুলোকে সংযত করা বা থামানোর উপায় ছিল না। তার উপর অগ্রসরমান পেছনকার সৈন্যদের প্রবল চাপ। ফলে অসংখ্য সৈন্য ঘোড়া সমেত সেই চাপে পরস্পরের ঘাড়ের উপর পড়ে গেল। খালে এইভাবে পড়ে যাওয়া সৈন্যদের তালগোল পাকানো মৃতদেহগুলোর দ্বারা ভরে গেলে তার উপর দিয়ে বাকি সৈন্যরা চলে গেল।
এই দুর্ঘটনায় মোট দু হাজার ঘোড়া আর পনেরোশো অশ্বারোহী সৈন্য মারা যায়।
এই অভিযানের হুকুম দেওয়ার আগে নেপোলিয়ন নিজে সতর্কতার সঙ্গে এ অঞ্চলের ভূমিপ্রকৃতি খুঁটিয়ে দেখেন এবং এ বিষয়ে খোঁজখবর নেন। কিন্তু মালভূমিটাই শুধু তাঁর চোখে পড়েছিল। তার মাঝখানে এই খালটা নজরে পড়েনি। লিভেলে রোডের মোড়ে একটা গির্জা দেখে নেপোলিয়ন লোকাস্তেকে জিজ্ঞাসা করেন পথে কোনও বাধা আছে কি না। কিন্তু লোকাস্তে ঘাড় নেড়ে মিথ্যা করে জানায় কোনও বাধা নেই। একটি চাষির ঘাড় নাড়াই নেপোলিয়নের পতনের কারণ।
পরাজয়ের এই হল শুরু। যদি আমাদের প্রশ্ন করা হয় এ যুদ্ধে নেপোলিয়নের পক্ষে জয়লাভ করা কি সম্ভব ছিল? তা হলে আমাদের উত্তর হবে, না। কিন্তু আবার যদি প্রশ্ন করা হয়, কেন? ওয়েলিংটনের জন্য অথবা কুচারের জন্য। আমরা তা হলে উত্তরে বলব, না। বলব, ঈশ্বরের জন্য।
