বেলা ন’টা বাজতেই ফরাসি বাহিনী যখন দুটি সারিতে পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং তাদের মাঝখানে অস্ত্রবাহিনী আর সামনে ব্যান্ডপার্টি যুদ্ধের জয়ঢাক বাজাতে থাকে, যখন অসংখ্য শিরস্ত্রাণ আর বেয়নেট সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো উত্তাল হয়ে ওঠে দিগন্তের পটে তখন নেপোলিয়ন তা দেখে নিজেই বলে ওঠেন আবেগের সঙ্গে, চমৎকার! চমৎকার!
এক অবিশ্বাস্য দ্রুত আর তৎপরতার সঙ্গে ফরাসি বাহিনী ছয়টি সারিতে ছয়টি ভি চিহ্নের মতো নিজেদের সুসংবদ্ধ করে তোলে। কামানগুলোকে ঠিকমতো সাজানো হলে নেপোলিয়ন প্রথমে মঁ সেন্ট জাঁ ঘাটির দিকে গোলাবর্ষণ করে আক্রমণ শুরু করতে হুকুম দেন। ঘাঁটিটা ছিল নিভেলে আর গেলাঞ্চের রাস্তা দুটোর সংযোগস্থলের মুখে।
যুদ্ধের পরিণাম সম্বন্ধে নিশ্চিত আত্মবিশ্বাস ছিল নেপোলিয়নের। তিনি সৈন্যদের হুকুম দিয়েছিলেন, মঁ সেন্ট ঘাঁটি দখল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা যেন পরিখার মধ্যে ঢুকে পড়ে। তিনি হাসিমুখে সৈন্যদের উৎসাহ দিতে থাকেন। সম্রাটের বাঁ দিকে আজ যেখানে একটা কবরখানা আছে সেদিন সেখানে একদল স্কট অশ্বারোহীকে দেখে দুঃখপ্রকাশ করেন তিনি। বলেন, আহা বেচারি!
তার পর নেপোলিয়ন ঘোড়ায় চড়ে রসোমি পাহাড়ের দিকে কিছুটা এগিয়ে যান। গেলাগ্লে থেকে ব্রাসেলস্-এর পথে যে রাস্তাটা চলে গেছে তার পাশে ঘাসে ঢাকা একখণ্ড জায়গা থেকে তিনি প্রায়ই যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি লক্ষ করতেন। সন্ধে সাতটার সময় তিনি আর একটা জায়গা থেকে যুদ্ধের অবস্থা দেখতে যান। সে জায়গা হল লা-বেল অ্যাবারেক্সা আর লা হাই সেন্তের মাঝখানে। জায়গাটার চারদিক একেবারে খোলা। নেপোলিয়নের ঘোড়াটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, তার চারদিকে গুলির ছড়রা আর বোমার টুকরো এসে পড়ছিল। কয়েক বছর পরে সেখানকার মাটির তলায় একটা বোমার খোল পাওয়া যায়। এইখানেই নেপোলিয়ন এক চাষি পথপ্রদর্শক ভয়ে ঘোড়ার আড়ালে লুকোবার চেষ্টা করলে তাকে বলেন, বোকা কোথাকার। লুকোবার চেষ্টা করছে কেন? তোমার পিঠেও তো গুলি লাগতে পারে। নেপোলিয়ন নিজে নির্ভীকভাবে সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। গুলি, গোলা, বোমা–কোনও কিছুরই ভয় ছিল না তার।
সেদিন ওয়াটারলু’র বনপ্রান্তরে মালভূমির যেখানে নেপোলিয়ন আর ওয়েলিংটন দুই পক্ষের দুই নেতারূপে পরস্পরের সামনে আসেন, আজ সেখানে সেদিনকার সেই অবস্থা আর নেই। সেখানে বীর সৈনিকদের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে গিয়ে তার স্বাভাবিক অবস্থাটাকে বিকৃত করে দেওয়া হয়। এইভাবে ইতিহাস অনেক সময় নিজেকেই চিনতে পারে না। দুই বছর পরে ওয়েলিংটন ওয়ারটারলু’র রণক্ষেত্রটা দেখতে এসে বলেন, ওরা দেখছি জায়গাটা একেবারে বদলে দিয়েছে। এখন সেখানে পিরামিডের মতো একটা জয়স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে এবং যে পিরামিডের মাথায় একটা সিংহ বসে আছে আগে সেখানে এক গ্রস্ত উপত্যকা ছিল এবং সেটা লিভেলে যাবার রাস্তাটার দিকে ঢালু হয়ে নেমে গিয়েছিল। সেখানে এখন ফরাসিদের স্মৃতিস্তম্ভ নেই। ফরাসিদের কাছে সমস্ত জায়গাটা এক বিশাল কবরখানা। ১৫০ ফুট উঁচু পিরামিডটা আধ মাইল জায়গাটা জুড়ে গড়ে উঠেছে। যুদ্ধের সময় জায়গাটা খুব খাড়া আর উঁচু ছিল।
ব্রেন লালিউদ আর ওহেন হল দুটি বেলজিয়ান গা। দুটি গাঁয়ের মাঝখানে চার মাইলের ব্যবধান। দুটি গাঁয়ের মাঝখানে দিয়ে একটি রাস্তা দু ধারে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে চলে গিয়ে দুটি গাকে যুক্ত করেছিল। ১৮১৫ সালে রাস্তাটা মঁ সেন্ট জাঁ মালভূমির উপর দিয়ে চলে যায়। তখন রাস্তাটা সরু ছিল, কিন্তু এখন রাস্তাটা অনেক চওড়া হয়ে চারপাশের প্রান্তরের সমান হয়ে গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার জন্য দু দিকে বাঁধের মতো উঁচু জায়গাগুলোকে কেটে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আগে দু দিকে বাঁধওয়ালা রাস্তাটা এত সংকীর্ণ ছিল যে ১৬৩৭ সালে মঁসিয়ে বার্নার্দ দেত্রে নামে একজন ব্যবসায়ীর একটা মালবোঝাই গাড়ি চাপা পড়ে। তার স্মৃতিরক্ষার্থে নির্মিত একটা পাথরের ক্রসে এই ঘটনার বিবরণ লেখা আছে। ঘটনাটা ঘটে ব্রেন লালিউদের মুখে। সঁ সেন্ট জ’র কাছে রাস্তাটা এত নিচু ছিল যে ১৭৮৩ সালে ম্যাথিউ নিকাসে নামে একজন চাষি সে রাস্তা দিয়ে যাবার সময় ধসে চাপা পড়ে মারা যায়। কিন্তু তার স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর ছাড়া আর কোনও চিহ্ন বর্তমানে নেই।
.
৮
যাই হোক, সেদিন সকালবেলায় ওয়াটারলু’র বনপ্রান্তরে নেপোলিয়ন সন্তুষ্ট ছিলেন। তাঁর এই আত্মপ্রসাদের যথেষ্ট কারণও ছিল। তাঁর যুদ্ধের পরিকল্পনাটা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল। সেদিনকার কোনও ক্ষয়ক্ষতিই ভীত করতে পারেনি তাঁকে। ইংরেজদের দ্বারা হুগোত দখল, লা হাই সেন্তে প্রবল প্রতিরোধ, বদিনের মৃত্যু, ফরের আহত হওয়া, অনেক বারুদ ভিজে যাওয়া, পনেরোটি অশ্বারোহী দলের পতন, কাদা জলে অনেক বিস্ফোরক দ্রব্যের অকেজো হয়ে যাওয়া, চারটি সেনাদল নিয়ে জেনারেল লে’র এক সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার ফলে প্রায় দুটো ফরাসি সৈনিকের শত্রুপক্ষের গোলাবর্ষণরত কামানের সামনে পড়ে যাওয়া, শক্তিমান লেফটেন্যান্ট ভো’র একটা কুকুর নিয়ে লা হাই সেন্তের গেট ভাঙার সময় ইংরেজদের গুলিতে আহত হওয়া, হুগোর্মতের বাগানে কম সময়ে পনেরোশো সৈনিকের নিহত হওয়া, লা হাই সেন্তে আরও কম সময়ের মধ্যে আঠারোশো লোকের মৃত্যু–যুদ্ধক্ষেত্রের এইসব রহস্যজনক ঘটনা নেপোলিয়নের চোখের সামনে একে একে ঘটে গেলেও তাকে বিচলিত করতে পারেনি। অথবা জয় সম্বন্ধে তাঁর রাজকীয় অটল নিশ্চয়তাবোধকে টলাতে পারেনি। তিনি সমগ্রভাবে যুদ্ধের পরিণামের কথাটা ভাবতেন, চূড়ান্ত জয়-পরাজয়ের আগে কোনও ছোটখাটো লাভ-ক্ষতিকে কখনই বড় করে দেখতেন না। যুদ্ধের প্রথমদিকের ক্ষতি বা পরাজয় তার হৃদয়কে কম্পিত করতে পারত না। তার ধৈর্য স্থৈর্য ছিল অসাধারণ। তিনি ছিলেন নিয়তির সমান শক্তিমান। বেরেসিনা, লিপজিগ আর ফঁতেনেক্লো’র অভিজ্ঞতা থেকে তিনি শিক্ষা লাভ করেননি। তা যদি করতেন তা হলে তিনি ওয়াটারলুর যুদ্ধে জয় সম্বন্ধে সংশয় পোষণ করতেন। সংশয়হীন এই বিশ্বাসের আতিশয্যই তাঁকে পতনের দিকে নিয়ে যায়। আপাতশান্ত আকাশের কোন গভীর অন্তরালে নিয়তির কোন রহস্যময় ভ্রুকুটি লুকিয়ে ছিল তা কে জানে?
