লাতিন ভাষায় একটি কথা আছে, সিজার যদি হাসে, পম্পে তা হলে কাঁদবে। জয়-পরাজয়ের খেলায় কেউ হারবে, কেউ জিতবে। এ ক্ষেত্রে পম্পে কাঁদেনি, কিন্তু সিজার হেসেছিল।
দুপুররাতের পর নেপোলিয়ন বাট্রাত্তকে নিয়ে ঘোড়ায় করে বজ্র এবং বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে রসোমি পাহাড়ের উপর থেকে ইংরেজদের শিবিরগুলো দেখে তাদের শক্তির পরিমাপ করতে থাকেন। সেই সব শিবিরে যেসব অগ্নিকুণ্ড জ্বলছিল তাদের ছটায় দিগন্তটা পর্যন্ত উদভাসিত হয়ে উঠছিল। ফ্রিশের্মত থেকে ব্রেন লালিউদ পর্যন্ত সে শিবির বিস্তৃত ছিল। তাঁর মনে হল পরের দিন ওয়াটারলুর যুদ্ধে কী হবে তা যেন নিয়তি আগে হতেই সব নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। নিয়তির সঙ্গে তার যেন অজ্ঞাত চুক্তি হয়ে গেছে। লাগাম টেনে ঘোড়াটাকে থামিয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপেই তিনি বিদ্যুতের দিকে তাকিয়ে বজ্রের ধ্বনি শুনতে লাগলেন। তিনি ছিলেন নিয়তিবাদী। তাঁর মুখ থেকে তখন একটা কথাই বেরিয়ে আসে, ‘নিয়তি আর আমি দু জনেই একমত।’ কিন্তু ভুল করেছিলেন নেপোলিয়ন। নিয়তির মনের সঙ্গে তাঁর মনের আর কোনও মিল ছিল না।
সে রাতে একবারও ঘুমোননি নেপোলিয়ন। সে রাতের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি ছোটখাটো ঘটনার মধ্যে খুঁজে পান কিছু না কিছু তৃপ্তির কারণ। সেনাদলের পিকেট লাইনগুলো নিজে ঘুরে ঘুরে দেখেন। দু-একজন সৈনিকের সঙ্গে কিছু কথাবার্তা বলেন। রাত্রি আড়াইটার সময় হুগোর্মতের বনের কাছে সৈন্যদের মার্চ করে কোথায় যাওয়ার শব্দ শুনে তিনি ভাবলেন ইংরেজ বাহিনী পিছু হটে পালিয়ে যাচ্ছে। নেপোলিয়ন বাট্রাকে বললেন, ‘অস্টেন্ডে যে ব্রিটিশ বাহিনী এইমাত্র অবতরণ করেছে তাদের মধ্যে ছয় হাজার সৈন্যকে বন্দি করব আমি।’ সেই রাত্রিতেই তিনি ওয়েলিংটনের উদ্দেশ্যে ঠাট্টা করে বলেন, ওই ইংরেজ ভদ্রলোকের শিক্ষা হওয়া উচিত।’ নেপোলিয়ন যখন এইসব কথা বলছিলেন তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়ে উঠল, তখন মুহূর্মুহূ বজ্রগর্জন হতে লাগল।
রাত সাড়ে তিনটের সময় কয়েকজন অফিসার গিয়ে দেখে এসে খবর দিল শত্রুবাহিনীর মধ্যে কোনও সাড়াশব্দ নেই। তারা নড়ছে-চড়ছে না। শিবিরের সব আগুন নিবিয়ে দেওয়া হয়েছে। ওয়েলিংটনের সব বাহিনী ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত চারটের সময় একজন চাষিকে ডেকে আনা হল। এই চাষি একজন ইংরেজ অশ্বারোহী সৈন্যকে বা প্রান্তের ওহেন নামে গ্রামে পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। সে পথপ্রদর্শকের কাজ করেছিল। পাঁচটার সময় দু জন দলত্যাগী বেলজিয়ান সৈন্যকে ডেকে আনা হল। তারা বলল ইংরেজ বাহিনী যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে অপেক্ষা করছে। সব শুনে নেপোলিয়ন বললেন, আমি ওদের বেকায়দায় ফেলব, পিছু হটতে দেব না, বা তাড়িয়ে দেব না।
ভোর হতেই নেপোলিয়ন প্ল্যানসেনয়েত থেকে আসা এক রাস্তার মোড়ে ঘোড়া থেকে কাদামাখা ঘাসের উপর নামলেন। তিনি রসোমি’র খামার থেকে রান্নাঘরের একটা টেবিল আর চেয়ার আনিয়ে তাতে বসলেন। টেবিলের উপর যুদ্ধক্ষেত্রের একটা ম্যাপ খুলে তা দেখতে দেখতে বললেন, এটা যেন এক দাবার ছক।
বৃষ্টির জলে পথঘাট ভিজে যাওয়ায় এবং সব কাদায় ভরে যাওয়ায় রসদবাহিনী আসতে পারেনি। সৈন্যদের খাবার এসে পৌঁছায়নি। সৈন্যরা ঘুমোতে পারেনি। তারা ঠিকমতো খেতে পায়নি। তারা ক্ষুধার্ত হয়ে ছিল। তবু তাতে দমে যাননি নেপোলিয়ন। তিনি উৎফুল্ল হয়ে জেনারেল লে-কে বললেন, আমাদের জয়ের সম্ভাবনা একশো ভাগের মধ্যে নব্বই ভাগ। সকাল আটটার সময় নেপোলিয়নকে প্রাতরাশ খেতে দেওয়া হল। তিনি বেশ কয়েকজন সেনাপতিকে তার সঙ্গে প্রাতরাশ খাবার জন্য আহ্বান করলেন। প্রাতরাশ খাবার সময় তারা বলাবলি করতে লাগলেন, দু রাত আগে ওয়েলিংটন ব্রাসেলস্-এ রিচমন্ডের ডাচেস বা ডিউকপত্নী প্রদত্ত এক ভোজসভায় যোগদান করেন। সে ভোজসভায় বলনাচের আসর হয়। কিন্তু আসল বলনাচ হবে আজ। লে একসময় বলল, “ওয়েলিংটন বোকার মতো আপনার জন্য অপেক্ষা করবে না।’ নেপোলিয়ন তখন তার কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলেন।
এইভাবে কথাচ্ছলে হাসি-তামাশা উপভোগ করতেন নেপোলিয়ন। গুরগাঁদ বলতেন, ‘নেপোলিয়নের স্বভাবের মধ্যে এক প্রাণবন্ত পরিহাস-রসিকতা ছিল। বেলজামিন কনস্ট্যান্ট বলতেন, তাঁর হাসিঠাট্টার মধ্যে বুদ্ধির দীপ্তি অপেক্ষা স্থল হাস্যরস বেশি। থাকত। তার মতো এক মহান পুরুষের চরিত্রের এ দিকটা সত্যিই উল্লেখযোগ্য এবং দেখার মতো। অনেক সময় তিনি রসিকতার ছলে তাঁর হাতবোমা বাহিনীর সেনাদের কান মলে অথবা মোচ টেনে দিতেন। একবার এলবা থেকে ফরাসি যুদ্ধজাহাজে করে ফেরার পর ইনকনস্ট্যান্ট নামে জাহাজে লুকিয়ে ছিলেন। সবাই নেমে গেলেও তিনি নামেননি। জাহাজ থেকে সৈন্যরা নামার সময় যখন অনেককে সম্রাটের কুশল জিজ্ঞাসা। করছিল তখন নেপোলিয়ন নিজেই জাহাজ থেকে বেরিয়ে এসে উত্তর দেন, সম্রাট খুব ভালো আছেন। তার স্বাস্থ্য খুবই ভালো। যে লোক এমন প্রাণ খুলে হাসতে পারেন তিনি যে যেকোনও অবস্থা বা ঘটনার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেবেন নিজেকে এটা স্বাভাবিক কথা। ওয়াটারলুর রণক্ষেত্রে সেদিন প্রাতরাশ খাওয়ার সময় নেপোলিয়ন বেশ কয়েকবার জোর হাসিতে ফেটে পড়েন। খাওয়া শেষ হলে পনেরো মিনিট চুপ করে থাকেন তিনি। তার পর দু জন সেনাপতি তাঁর সামনে বসে তাদের হাঁটুর উপর প্যাড রেখে লেখার জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকেন। নেপোলিয়ন তখন তাদের যুদ্ধের জন্য তাঁর হুকুমনামা বলে যান আর তারা তা লিখে যান।
