হুগোমঁত আর হাই সেন্তের পতন ঘটায় ওয়েলিংটনের সামনে শুধু একটা ভরসাই ছিল। তিনি মধ্যভাগটা রক্ষা করে যাবেন। তাই হিল আর চেসিকে আনিয়ে দলটাকে ভারী করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটাকে জোরদার করে তুলঁলেন আগের থেকে।
যুদ্ধাঞ্চলের যে মধ্যভাগটায় ওয়েলিংটনের বাহিনী ছিল সে জায়গাটার কতকগুলি সুবিধা ছিল। জায়গাটা ছিল ম সেন্ত জাঁ মালভূমিতে, যার পেছনে বিস্তৃত ছিল একটা গাঁ আর সামনে ছিল একটা ঢাল। ঢালটা সামনের দিকে নেমে গেছে এক নিম্ন উপত্যকায়। পেছন দিকে প্রথমেই ছিল একটা পুরনো আমলের পাথরের প্রাসাদ। বাড়িটা এখন নিভেলের সরকারি দখলে। মোড়শ শতাব্দীতে বাড়িটা পাথর দিয়ে এমন মজবুত করে গাঁথা হয় যে বন্দুক-রাইফেলের গুলি তার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। মালভূমির শেষ প্রান্তে গাঁয়ের দিকে যে বন ছিল সেই বনের কিছু গাছপালা ছেটে ইংরেজরা তাদের অনেক কামান ও অস্ত্রশস্ত্র লুকিয়ে রাখে যাতে বাইরে থেকে কেউ তাদের অস্ত্রসম্ভার সম্বন্ধে কোনও ধারণা করতে না পারে। ফলে নেপোলিয়ন একবার হ্যাঁক্সোকে ইংরেজদের অস্ত্রসম্ভার ও সামরিক শক্তি সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতে পাঠালে হ্যাঁক্সো ইংরেজদের বনে লুকিয়ে রাখা অনেক অস্ত্রই দেখতে পায়নি। হ্যাঁক্সো ফিরে এসে জানাল প্রতিরক্ষার তেমন কোনও ব্যবস্থাই নেই। শুধু নিভেলে আর গেলাঞ্চে যাবার পথটা অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। বছরের সেই সময়টা ফসল বাড়ার সময়। মাঠে মাঠে সব ফসল তখন পুরোমাত্রায় বেড়ে উঠেছে। কেম্পতের বাহিনী কার্বাইন হাতে খাড়া হয়ে থাকা মাঠের ফসলের গাছগুলোর আড়ালে লুকিয়ে ছিল।
আসল কথা হল গোলন্দাজ বাহিনীর কেন্দ্রস্থলটা ছিল শক্তিশালী ঘাঁটি। তবে সেখানকার একমাত্র বিপদ ছিল সামনের নিকটবর্তী বনভূমি। সামনের দিকে এই বিশাল বনভূমিটার মাঝে মাঝে ছিল জলাভূমি আর বিল। সেদিক দিয়ে কোনও সেনাবাহিনী যাতায়াত করলে সেই জলাভূমিতে বেকায়দায় পড়ে ডুবে যেত অনেক সৈন্য। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ত দল থেকে। সে পথে পশ্চাদপসরণ করা সত্যিই কঠিন ছিল। ওয়েলিংটন ডান দিক থেকে চেসি আর বাঁ দিক থেকে উইঙ্ক আর ক্লিনটনের বাহিনীকে আনিয়ে তার কেন্দ্রীয় বাহিনীকে শক্তিশালী করে তুলঁলেন। একে একে ব্রানসউইক, লাসাউ, হ্যাঁনোভার, জার্মান প্রভৃতি বাহিনীগুলোকেও তাঁর সাহায্যে আনালেন। এইভাবে ওয়েলিংটনের নেতৃত্বাধীন ছিল ছাব্বিশটি বাহিনী। সামনের সারির সেনারা সংখ্যায় এত বেশি ছিল যে, তাদের সারিটা ডান দিক থেকে ঘুরে পেছনে চলে যায়। এছাড়া ওয়েলিংটনের হাতে ছিল সমারসেটের ড্রেগন গার্ড বা দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী বাহিনী। লা হাই সেন্তের যুদ্ধে পমসনতির অধীনস্থ অশ্বারোহী বাহিনী নিশ্চিহ্ন হলেও সমারসেটের বাহিনীটি ঠিক ছিল।
তাড়াহুড়োর জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঠিকমতো হয়ে ওঠেনি। অস্ত্রসম্ভার ঠিকমতো গুছিয়ে রাখা হয়নি। শুধু এক জায়গায় অনেক বালির বস্তার স্তূপের আড়ালে গোলন্দাজ বাহিনী কামান দাগছিল।
মঁ সেন্ট জাঁ গাঁয়ের একটা মিলের সামনে এক জায়গায় একটা ঘোড়ার পিঠের উপর সারাদিন বসে কাটান ওয়েলিংটন। তিনি ছিলেন একটা এলম গাছের তলায়। সেই গাছটা পরে একজন ইংরেজ দুশো ফ্রাঁ দিয়ে কিনে নিয়ে যায়। সেদিন ওয়েলিংটনের মূর্তিটা ছিল হিমশীতল এক পাথরের মতো স্তব্ধ এবং অবিচল। কত বুলেট সোঁ সোঁ করে তার পাশ দিয়ে চলে যায়। তাঁর এক সহকারী গর্ডন তাঁর পাশেই নিহত হয়। হিল তাকে বলেন, আপনি নিজেই যদি মারা যান তা হলে আপনার হুকুমের দাম কী?’ ওয়েলিংটন তখন উত্তর করেন, আমি যা করছি তাই করো।’ এরপর তিনি ক্লিনটনকে কড়াভাবে বলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত একটা লোকও থাকবে ততক্ষণ লড়াই চালিয়ে যাবে। যখন অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যায় তখন তিনি তালাভেরা, ভিতোরিয়া আর সালামানকার সেনাদলের লোকদের বলেন, এক ইঞ্চি জমিও ছাড়বে না। ইংল্যান্ডের কথা মনে ভাববে।
কিন্তু বেলা প্রায় চারটে বাজতেই ইংরেজ বাহিনীও অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। সামনের মালভূমির দিকে মুখ তুলে তারা দেখল সামনে শুধু কামান আর গোলন্দাজ বাহিনীর লোকজন। ইংরেজদের পদাতিক বাহিনী ফরাসিদের সেই কামানের গোলার সামনে দাঁড়াতে পারল না। তাই তারা গাঁয়ের পেছনে খামারে গিয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হল। ওয়েলিংটনের সেনাবাহিনীর সারি ভেঙে গেল। পিছু হটার প্রবণতা দেখা গেল।
তা লক্ষ করে নেপোলিয়ন বলে উঠলেন, এই পশ্চাদপসরণ শুরু হল।
.
৭
নেপোলিয়ন তখন অসুস্থ ছিলেন। দেহের একটা বিশেষ অঙ্গের ব্যথার জন্য ঘোড়ায় চাপতে অসুবিধা হচ্ছিল তার। তবু সেদিনকার মতো এতখানি উৎফুল্ল আর কখনও দেখা যায়নি তাঁকে। সেদিন সকাল থেকেই এক দুর্বোধ্য রহস্যে ভরা তাঁর মুখখানিতে হাসির রেখা ফুটে ওঠে। মর্মরপ্রস্তরের মূর্তির মতো যে মানুষটি এক গভীর স্তব্ধতায় জমাট বেঁধে থাকতেন সব সময়, ১৮১৫ সালের ১৮ জুন তারিখে এক অকারণ আনন্দের আবেগে উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন সহসা। অস্টারলিস-এর সেই ভ্রুকুটিকুটিল বিষণ্ণ মানুষটি ওয়াটারলু রণক্ষেত্রে হর্ষোৎফুল্ল হয়ে ওঠেন আশ্চর্যভাবে। নিয়তি এইভাবেই পরিহাস করে আমাদের সঙ্গে। আমাদের সব আনন্দ, হাসির সব আলো ছায়ার মতোই বস্তুহীন।
