হুগোমঁতে ফরাসিদের অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল ইংরেজদের সেনাপতি ওয়েলিংটনকে টেনে আনা। ফরাসিদের এই উদ্দেশ্য এবং এই পরিকল্পনা সার্থক হত যদি ইংরেজ বাহিনীর চারটি দল এবং পাপনিশারের এক বেলজিয়ান বাহিনী ঠিকমতো ফরাসি আক্রমণকে প্রতিহত করার জোর চেষ্টা চালিয়ে যেত আর ওয়েলিংটন ব্রানসউইক থেকে আসা আরও চারটি সেনাদল নিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিতেন।
পাপোলেত্তে অবস্থানরত ইংরেজ বাহিনীকে ডান দিক থেকে ফরাসিদের আক্রমণ চালাবার উদ্দেশ্য ছিল বাঁ দিকের ইংরেজ বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে ব্রাসেলস্ যাবার পথটা পরিষ্কার করা, যাতে প্রুশীয় বাহিনী সে পথে আসতে না পারে, যাতে ওয়েলিংটন প্রথমে হুগোমঁত ও পরে ব্রেন লালিউদ এবং হলে অভিযান চালাতে বাধ্য হন। এই পরিকল্পনাটা ছিল বেশ পরিষ্কার এবং সেটা অনেকখানি সফল হয় এবং পাপোলেত্তে ও লা হাই সেন্ত দখল হয়।
এখানে একটা কথা বলা দরকার। ইংরেজদের পদাতিক বাহিনী বিশেষ করে কেম্পতের বাহিনীতে অনেক নতুন সৈন্য নেওয়া হয়েছিল। এই নতুন সৈন্যদের যুদ্ধের বিশেষ কোনও অভিজ্ঞতা না থাকলেও বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে বিশেষ কৃতিত্ব দেখায়। তারা নতুন এবং অনভিজ্ঞ হলেও তাদের মধ্যে এক দুর্ধর্ষ হঠকারিতা ছিল। ফরাসিদের মতোই যে কোনও যুদ্ধে যে কোনও অবস্থায় ঝাঁপিয়ে পড়ার এক প্রবণতা ছিল। ওয়েলিংটন এটা পছন্দ করতেন না।
লা হাই সেন্তের পতনের পর থেকে ইংরেজদের অবস্থা ভাগ্যের দাঁড়িপাল্লায় ঝুলতে থাকে। দুপুর থেকে বেলা চারটে পর্যন্ত যে যুদ্ধ চলতে থাকে তার গতিপ্রকৃতি এক রহস্যের কুয়াশায় আচ্ছন্ন ও দুর্বোধ্য হয়ে থাকে। তুমুল গোলমাল আর হট্টগোলের মধ্যে পরিষ্কার করে কিছুই বোঝা যায় না। ইংরেজ পক্ষে ছিল ব্রানসউইক বাহিনী, হ্যাঁলেভার বাহিনী আর স্কট সেনাবাহিনী। ব্রানসউইক বাহিনীর সৈন্যদের টিউনিকগুলো ছিল কালো, ইংরেজ সেনাদের টিউনিক ছিল ঘোর লাল। হ্যাঁনোভারের অশ্বারোহী দলের শিরস্ত্রাণের উপরে ছিল লাল পালক, স্কট বাহিনীর পায়ে কোনও পদবন্ধনী ছিল না আর ফরাসি বাহিনীর পদবন্ধনী ছিল সাদা। এ যেন শুধু রঙের খেলা, যা চিত্রকরদের পক্ষে ফুটিয়ে তোলা সহজ। এ যুদ্ধের পদ্ধতি ছিল সেকেলে।
যে কোনও সশস্ত্র যুদ্ধে সেনাপতি বা সেনানায়করা যতই পরিকল্পনা করে যুদ্ধ পরিচালনা করুক না কেন, তার ফল কী হবে তা কেউ বলতে পারে না। যুদ্ধের প্রতিটি ক্রিয়ার প্রতিটি প্রতিক্রিয়াই সাধারণত হয়ে থাকে অপ্রত্যাশিত এবং অকল্পনীয়। একজন সেনাপতির পরিকল্পনা অপর পক্ষের সেনাপতির পরিকল্পনাকে কখনও সার্থক আবার কখনও ব্যর্থ করে দেয় অপ্রত্যাশিতভাবে। অববাহিকার ভূমিপ্রকৃতি অনুসারে যেমন জলধারা কমবেশি প্রবাহিত হয় তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রে এক-একজন যোদ্ধা শত্রুপক্ষের বেশি সৈন্য নিধন করে অল্প সময়ের মধ্যে। এক-এক জায়গায় বেশি সৈন্য পাঠাতে হয়। এইভাবে আগের পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যায়। বাতাসে উড়তে থাকা সুতোর মতো সৈন্যদের সারি ভেঙে যায়, এলোমেলো হয়ে যায়। রক্তস্রোত যখন প্রবাহিত হয় তখন তা কোনও যুক্তি মেনে চলে না। সৈন্যবাহিনী সমুদ্রতরঙ্গের মতোই লীলাচঞ্চল। সমুদ্রের তরঙ্গমালা যেমন বেলাভূমির দিকে এগিয়ে আসে, আর চলে যায় তেমনি সেনাবাহিনীর মধ্যেও তরঙ্গলীলা চলে। সৈন্যবাহিনী অপস্রিয়মাণ বালুকারাশির মতোই অস্থায়ী। যেখানে যা থাকার কথা সেখানে তা থাকে না। যেখানে পদাতিক থাকে, সেখানে অস্ত্রবাহিনী এসে যায়। আবার যেখানে অস্ত্রবাহিনী থাকার কথা সেখানে অশ্বারোহী বাহিনী এসে যায়। সৈন্যবাহিনী ধোয়ার মতো বিলীয়মান। অসংখ্য লোক চারদিকে ছোটাছুটি করে। একটা জায়গায় এইমাত্র একটা জিনিস দেখলে, কিন্তু পরমুহূর্তেই দেখবে অন্য একটা জিনিস। আঙ্কিক নিয়মে খাড়া করা কোনও পরিকল্পনা অথবা জ্যামিতিক নিয়মে আঁকা কোনও ছক যুদ্ধক্ষেত্রে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। যুদ্ধের মতিগতির সঙ্গে একমাত্র ঝড়েরই তুলঁনা চলে। কোনও সাদা কাগজে এলোমেলোভাবে তুলির আঁচড় কাটলেই যুদ্ধের ছবি হয়ে যায়। সেদিক থেকে উঁদার মূলের থেকে রেমব্রা যুদ্ধের ছবি আঁকার ব্যাপারে বেশি সিদ্ধহস্ত। যুদ্ধের জয়-পরাজয় সম্বন্ধে যে নিশ্চয়তা বেলা বারোটার সময় দেখা দেয়, সে নিশ্চয়তা বেলা তিনটে বাজতেই অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রে দুই পক্ষের ব্যবধান লুপ্ত হয়ে যায়; দুই পক্ষের সৈন্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ছেড়ে হাতাহাতি, জনে জনে লড়াই করতে থাকে। সে যুদ্ধের বর্ণনা করা কোনও ঐতিহাসিকের পক্ষেই সম্ভব নয়। এ জন্য নেপোলিয়ন নিজে বলতেন, কোনও ইতিহাস নয়, যুদ্ধের আসল বিবরণ সেনাবাহিনীর লোকেরাই দিতে পারে ঠিকমতো। ঐতিহাসিক শুধু কোনও যুদ্ধের মোটামুটি একটা বিবরণ দিতে পারেন। নিয়ত গতিপরিবর্তনশীল যুদ্ধের ভাসমান কুৎসিত মেঘের প্রকৃত রূপরেখা কেউ ঠিকমতো আঁকতে পারে না।
ওয়াটারলু যুদ্ধ সম্বন্ধেও এই কথাই খাটে। তবু বিকালের দিকে সে যুদ্ধটা এমন এক জায়গায় এসে স্থিত হয় যেখানে তার চেহারা খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
.
৬
বিকাল প্রায় চারটে নাগাদ ওয়েলিংটনের বাহিনী দারুণ মুশকিলে পড়ে। প্রিন্স অফ অরেঞ্জ সেনাবাহিনীর মধ্যভাগে থেকে সৈন্য পরিচালনা করছিলেন। বাঁ দিকে ছিলেন হিল আর ডান দিকে ছিলেন পিকটন। বীরবিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে প্রিন্স অফ অরেঞ্জ সহসা হতাশ হয়ে লাসাউ আর ব্রানসউইক-এর বাহিনীদের তাড়াতাড়ি তার পাশে এসে দাঁড়াতে বলেন। ইংরেজরা যখন ফরাসিদের ১০৫তম বাহিনীকে পরাস্ত করে তখন মাথায় গুলি লেগে পিষ্টন মারা যান। ফরে হিলের শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তিনি ওয়েলিংটনের কাছে চলে আসেন সাহায্যের আশায়। ওয়েলিংটনের সামনে তখন ছিল দুটো সমস্যা হুগোমঁত আর লা হাই সেন্ত। কিন্তু হুগোর্মত তখন জ্বলছে আর হাই সেন্তের আগেই পতন ঘটেছে। সেখানকার খামারবাড়িতে যুদ্ধ হবার সময় তাদের পক্ষের তিন হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। যে জার্মান বাহিনী প্রতিরক্ষার কাজে নিযুক্ত ছিল সেই বাহিনীর মধ্যে মাত্র পাঁচজন অফিসার আর বিয়াল্লিশ জন সৈন্য বেঁচে আছে। বারো শো অশ্বারোহী সৈন্যের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মারা যায়। যখন সেখানে কাছ থেকে দু পক্ষে হাতাহাতি যুদ্ধ চলে তখন ফরাসিদের বর্শা আর দা-এর আঘাতে স্কট বাহিনীর অনেক অফিসার নিহত হয়। পঞ্চম ও ষষ্ঠ পদাতিক বাহিনী একেবারে বিধ্বস্ত হয়।
