গেলাপ্পে থেকে লিভেলের দিকে যে রাস্তা চলে গেছে তার দু দিকে দুটি বাহিনী পরস্পরের সম্মুখীন হয়। দার্লন পিকটনের আর রেইলি হিলের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। মঁ সেন্ট জাঁ মালভূমির শীর্ষদেশের ওপারেই শুরু হয়েছে সয়নের বনভূমি। সমগ্র মালভূমিটা ক্রমশ ধাপে ধাপে ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে বনভূমির উপান্তে গিয়ে মিলে গেছে।
যে কোনও যুদ্ধে দুই পক্ষের বাহিনী যে কোনওভাবে পরস্পরকে পরাভূত করার চেষ্টা করে। সেই যুদ্ধক্ষেত্রের ভূ-প্রকৃতির অন্তর্গত সব কিছুরই একটা বিশেষ তাৎপর্য আছে। সামান্য একটা বন বা ঝোঁপ বা পাঁচিলের একটা কোণ পশ্চাদপসরণরত বাহিনীকে আশ্রয় দিতে পারে। আবার এই ধরনের কোনও আশ্রয় না পেলে কোনও বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। আবার পলায়নরত সেনাবাহিনীর পথে যদি বন বা খাদ, খাল, বিল বা নদী থাকে তা হলে তাদের গতি ব্যাহত হয়। আবার পালাবার পথে পলাতক বাহিনী যদি দেখে দু দিকে দুটো রাস্তা চলে গেছে তা হলেও তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এই জন্যই বিভিন্ন বাহিনীর সেনাপতিদের পারিপার্শ্বিক ভূ-প্রকৃতির অন্তর্গত সব বস্তুও খুঁটিয়ে দেখতে হয়।
ইংরেজ ও ফরাসি দু পক্ষেরই সেনাপতিরা যুদ্ধের আগে ম জা’র মালভূমিটাকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখে নেয়। এটাকে বলা হয় ওয়াটারলু’র সমভূমি। ইংরেজ সেনাপতি ওয়েলিংটনের এক প্রশংসনীয় দূরদৃষ্টি ছিল বলেই যুদ্ধের এক বছর আগে ঘোড়ায় চড়ে জায়গাটা ঘুরে দেখে নেন, এক বিশাল রণক্ষেত্র হবার এক বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পান তিনি এ জায়গাটার মধ্যে। যুদ্ধের সময় ব্রিটিশবাহিনী ফরাসিদের থেকে আরও উঁচু জায়গায় ছিল বলে যুদ্ধের অবস্থা তাদের অনুকূলেই বেশি যায়।
১৮ জুন সকালবেলায় নেপোলিয়ন যখন তার ঘোড়ার উপরে বসে রসোম পাহাড়ের উপর থেকে ফিল্ডগ্লাস হাতে সামনের যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তখনকার সেই চিত্রটা নতুন করে আঁকার কোনও প্রয়োজন নেই। কারণ এ চিত্রটা প্রায় সকলেরই পরিচিত। বাঁকানো টুপির নিচে তাঁর মুখের প্রশান্ত ভাব, তার সবুজ টিউনিক, ধূসর রঙের কোট, সুচিশিল্পের কাজ করা ‘এন’ অক্ষর ঈগল আঁকা নীলচে মখমলের কাপড়ের জিন দিয়ে সাজানো সাদা ঘোড়া, তাঁর পায়ে সিল্কের মোজার উপর ক্যাভালরি বুট, রুপোর লাগাম, ম্যারঙ্গো তরবারি–এ যেন শেষ সিজারের চিত্র যা সকল মানুষের মনেই জেগে আছে, যে চিত্র অনেকের দ্বারা বন্দিত হয়, অনেকের দ্বারা নিন্দিত হয়।
অন্যান্য মহান পুরুষদের মতো নেপোলিয়নের এই মূর্তিটি রূপকথা আর জনশ্রুতির কুয়াশা ভেদ করে এক আশ্চর্য আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে বেরিয়ে আসে। কিন্তু সে মূর্তির আড়ালে আসল সত্যটা লুকিয়ে থাকে। আজ যেন ইতিহাস আর উজ্জ্বল দিবালোক এক হয়ে গেছে।
ইতিহাসের দিবালোক বড় নির্মম। সে আলোর মধ্যে আলোকের উপাদান থাকলেও তার মধ্যে এমন একটি ঐন্দ্রজালিক অশুভ শক্তি থাকে যা ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তির সব উজ্জ্বলতার উপর এক ছায়া বিস্তারের দ্বারা সে ব্যক্তির পরস্পর-বিরুদ্ধ দুটি মূর্তিকে তুলে ধরে। এইভাবে দেখা যায় কোনও স্বৈরাচারী শাসকের অন্ধকারাচ্ছন্ন মূর্তির ঊর্ধ্বে নেতৃত্বসূলভ এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব বড় হয়ে ওঠে। এইভাবে সব ঐতিহাসিক ব্যক্তির দুটি মূর্তি দেখে এক সংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ বিচারবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় আমাদের। বিধ্বস্ত ব্যাবিলন আলেকজান্ডারের মহত্ত্বকে খর্ব করে, পরাধীন রোম সিজারের ভাবমূর্তিকে ম্লান করে, লুণ্ঠিত জেরুজালেম টিটাসকে হীন করে তোলে। এটা খুবই দুঃখের বিষয় যে সব মানুষই তার উজ্জ্বল মূর্তিটার পেছনে মৃত্যুর পর একটা ছায়া রেখে যায়।
.
৫
ওয়াটারলুর যুদ্ধের প্রথম স্তরের কথা সকলেই জানে। এক ভয়ঙ্কর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। সে অনিশ্চয়তা উভয় দলের পক্ষেই ছিল বিপজ্জনক। ফরাসিদের থেকে ইংরেজদের পক্ষে বিপদের সম্ভাবনা ছিল বেশি।
আগের দিন সারারাত ধরে বৃষ্টি হয়। বৃষ্টির জলে কাদা হয়ে যায়। চারদিকে জল জমে যায়। পাপেলোত্তের চারদিকে ছোট্ট উপত্যকাটায় মাঠ থেকে সব গমের শুকনো গাছগুলো এনে কাদার উপর বিছিয়ে দিয়ে অস্ত্রবোঝাই গাড়িগুলোকে নিয়ে যাওয়া হয়।
যুদ্ধ শুরু হতে দেরি হয়। নেপোলিয়ন সব যুদ্ধে অস্ত্রবাহিনী তাঁর নেতৃত্বাধীনে রাখতেন। এক বিশেষ লক্ষ্যাভিমুখে ধরে থাকা এক পিস্তলের মতো তার অস্ত্রবাহিনী যুদ্ধের এক বিশেষ মুহূর্তে প্রয়োগ করার জন্য সব সময় প্রস্তুত হয়ে থাকতেন তিনি। ঠিকমতো অস্ত্রপ্রয়োগের জন্য সূর্য ওঠার এবং মাঠটা শুকনো হওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু মেঘ কেটে সূর্য বেরিয়ে এল না। এটা অস্টারলিস-এর যুদ্ধ নয়। ফলে যুদ্ধ আরম্ভ হতে দেরি হল। ওয়াটারলু যুদ্ধে যখন প্রথম কামানের গোলা বর্ষিত হয় তখন জেনারেল কলভিল ঘড়ি দেখে বললেন, বেলা সাড়ে এগারোটা বাজে।
ফরাসিদের পক্ষ থেকে জোর আক্রমণের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ হয়। হুগোমঁতে অবস্থানরত ফরাসি বাহিনীর বাঁ দিকের সেনারা প্রথমে এমন জোরে আক্রমণ করে যে সম্রাট নিজেও তা ভাবতে পারেননি। নেপোলিয়ন নিজে ফরাসি বাহিনীর মাঝখানে থেকে আক্রমণ করেন। তিনি ইংরেজদের লা হাই সেন্তের বাহিনীর বিরুদ্ধে কুয়োত বাহিনীকে ঝাঁপিয়ে পড়ার হুকুম দেন। জেনারেল লে পাপেলোত্তে দখল করে থাকা বাঁ দিকের ইংরেজ বাহিনীকে ডান দিক থেকে এক ফরাসি বাহিনী নিয়ে আক্রমণ করেন।
