১৮১৫ সালের জুন মাসের যুদ্ধেও তিনি তাঁর অস্ত্রসম্ভারের ওপরেই জোর দেন বেশি। কারণ তাঁর সৈন্যসংখ্যা বেশি ছিল। ইংরেজ সেনাপতি ওয়েলিংটনের যেখানে ছিল ১৫৯টি কামান, নেপোলিয়নের ছিল ২৪০টি কামান।
যুদ্ধক্ষেত্রের মাটি শুকনো থাকলে এবং অস্ত্রবাহিনীর গাড়িগুলো ঠিকমতো চলতে পারলে যুদ্ধ সকাল ছ’টায় শুরু হতে পারত এবং বেলা দুটোর মধ্যেই তা শেষ হয়ে যেত। প্রশীয় বাহিনী এসে যুদ্ধের গতি ফিরিয়ে দেবার তিন ঘণ্টা আগেই ফরাসিরা জয়লাভ করতে পারত।
এই পরাজয়ের জন্য নেপোলিয়নকে কতখানি দায়ী করা চলে? জাহাজডুবির জন্য নাবিক কি সত্যিই দায়ী?
এই সময় নেপোলিয়নের যে শারীরিক অবক্ষয় ঘটে সেই অবক্ষয়ের ফলেই কি তাঁর মানসিক শক্তি দুর্বল হয়ে ওঠে? কুড়ি বছর ধরে ক্রমাগত যুদ্ধ করে করে তার শরীর আর মন কি একই সঙ্গে ভেঙে পড়ে? সৈন্য পরিচালনা বা যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তার এই অবক্ষয় কি প্রকটিত হয়ে ওঠে? অনেক প্রখ্যাত ঐতিহাসিকের মতে নেপোলিয়নের সমপ্রতিভা এই সময় ম্লান হয়ে আসছিল এবং তিনি উন্মাদের মতো তার এই প্রতিভার সামগ্রিক অবক্ষয়ের ব্যাপারটাকে যথাসম্ভব গোপন রাখার চেষ্টা করেছিলেন। এই ধারণা কি সত্যি? সামরিক ব্যর্থতার আঘাতে তিনি কি দোদুল্যচিত্ত হয়ে ওঠেন–যে দোদুল্যচিত্ততা একজন সেনাপতির পক্ষে এক বিরাট ত্রুটি? অথবা তিনি বিপদ সম্পর্কে উদাসীন ছিলেন? যারা কর্মবীর এবং কর্মক্ষমতায় দানবিক ক্ষমতার অধিবারী, তাঁদের জীবনে কি এই ধরনের একটা সময় আসে যখন তাদের অন্তদৃষ্টি কোনও কারণে আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে এইভাবে? অসাধারণ মানসিক শক্তিসম্পন্ন মহান পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়সের চাপ কোনও বাধা সৃষ্টি করতে পারে না। যে বার্ধক্য দান্তে ও মিকালাঞ্জেলোর জীবনে প্রকৃত গতিশক্তি দান করে, সে বার্ধক্য কি হ্যাঁনিবল ও বোনাপার্টের শক্তিকে দমিয়ে দেয়? জয়ের উদ্যম বা উৎসাহ কি হারিয়ে ফেলেন নেপোলিয়ন? তিনি কি চলার পথে তাঁর সামনে কোথায় গর্ত আছে, কোথায় ফাঁদ পাতা আছে, কোথায় খাদের পাড়ের মাটি ধসে যাচ্ছে তা দেখতে পাননি? বিপদকে এড়িয়ে যাবার প্রবৃত্তি কি হারিয়ে ফেলেন তিনি? যিনি তার আগ্নেয় রথের উপর থেকে এক অপরাজেয় বীরের মতো অঙ্গুলি সঞ্চালন করে কত জয়ের পথ দেখিয়েছেন আজ কি তিনি তার বিশাল বাহিনীকে ভুল পথে চালিত করে এক অতল খাদের মধ্যে ফেলে দেন? ছেচল্লিশ বছর বয়সেই তিনি কি শেষে উন্মাদ হয়ে যান? যিনি ছিলেন এক বিরাট মহাদেশের অবিসংবাদিত ভাগ্যবিধাতা, তিনি কি শেষে ঘাড়ভাঙা এক সামান্য গাড়িচালকে পরিণত হন?
আমরা এটা বিশ্বাস করতে পারি না।
তার যুদ্ধ পরিকল্পনা যে অপূর্ব ও অসাধারণ ছিল একথা সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, মিত্রবাহিনীর মধ্যে যে ফাঁক ছিল তার মধ্যে ঢুকে গিয়ে শত্রুপক্ষকে দু ভাগে বিভক্ত করে দেওয়া, ব্রিটিশ বাহিনীকে হালের দিকে আর প্রুশীয় বাহিনী তংগ্রেসের দিকে ঠেলে দেওয়া। তাঁর ইচ্ছা ছিল ব্রাসেলস দখল করে জার্মানদের রাইন নদীতে আর ইংরেজদের সমুদ্রে ফেলে দেবেন তিনি। এইভাবে এ যুদ্ধে এক বিরল কৃতিত্ব লাভ করতে চেয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন তার পর তাঁর অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখবেন তিনি।
একথা বলা নিষ্প্রয়োজন যে আমরা ওয়াটারলুর যুদ্ধের পূর্ণ বিবরণ লিখতে বসিনি। আমাদের কাহিনীর এক সংকটজনক কাল এই যুদ্ধের সঙ্গে জড়িত হলেও এ যুদ্ধের পূর্ণ ইতিবৃত্ত বর্ণনার কোনও প্রয়োজন নেই। এ যুদ্ধের কাহিনী নেপোলিয়ন নিজেই ভালো বর্ণনা করেছেন এবং অনেক ঐতিহাসিকও তা বর্ণনা করেছেন।
যুদ্ধ বর্ণনার ভার উপযুক্ত ঐতিহাসিকদের ওপর ছেড়ে দিয়ে আমরা শুধু পর্যবেক্ষক ও পথিক রূপে নররক্তে রঞ্জিত যুদ্ধক্ষেত্রটিকে খুঁটিয়ে দেখছি আর আপাতদৃষ্ট বস্তুগুলোকে সত্য বলে ভাবছি। যেসব তথ্যপুঞ্জ আমরা পাচ্ছি সেগুলো থেকে আসল সত্যকে নিষ্কাশিত করার মতো পাণ্ডিত্য আমাদের নেই। সে তথ্যের মধ্যে হয়তো অনেক ভুলভ্রান্তি আছে। সেগুলোর সত্যাসত্য নির্ণয় করার মতো আমাদের সামরিক জ্ঞান নেই। যে সব বিপর্যয় ওয়াটারলুর যুদ্ধের ঘটনাবলিকে নিয়ন্ত্রিত করে সেগুলো আমরা সরলমনা সাধারণ মানুষের মতোই বিচার করে দেখি।
.
৪
ওয়াটারলু যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে ঠিকমতো এক পরিষ্কার ধারণা লাভ করতে হলে ইংরেজি ভাষায় প্রথম ‘A’ আঁকতে হবে। এ অক্ষরের বাঁ দিকের রেখাঁটিকে লিভেলে থেকে বেরিয়ে আসা রাস্তাটাকে ধরে নিতে হবে আর তার ডান দিকের রাস্তাটিকে গেলাপ্পে থেকে বেরোনো রাস্তাটিকে ধরে নিতে হবে। মাঝখানের যে সংযোগরেখাঁটিকে দু দিকের দুটি রেখাকে যুক্ত করেছে সেই সংযোগরেখাঁটিকে ওহেন থেকে ব্রেন লালিউদগামী রাস্তাটিকে ধরে নিতে হবে। মাথার যে শীর্ষবিন্দু থেকে দুটি রেখা বেরিয়েছে সে বিন্দু হল মঁ সেন্ট জা, যেখানে বিয়েন জেরোম আর বোনাপার্ট অবস্থান করছিলেন। ডানদিকের রেখার পায়ের তলায় লা বেল এলায়েন্স ছিল নেপোলিয়নের সদর অফিস। যে সংযোগরেখাটা বাঁ দিক থেকে ডানদিকের রেখার সঙ্গে মিলিত হয়েছে তার কিছু নিচে লা হায়াসেন্তে নামে একটা জায়গা আছে। এই সংযোগরেখার মধ্যবর্তী অঞ্চলেই যুদ্ধের ভাগ্য নির্ণীত হয়। এই জায়গাতেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও বীরত্বের প্রতীক হিসেবে একটি পাথরের সিংহকে স্থাপন করা হয়েছে। শীর্ষবিন্দু থেকে সংযোগরেখা পর্যন্ত ত্রিভুজাকার যে ক্ষেত্র আছে তা হল মঁ সেন্ট জা’র মালভূমি। এই মালভূমি অঞ্চল দখলের সংগ্রামই হল ওয়াটারলু যুদ্ধের মূল কথা।
