উঠোনের শেষ প্রান্তে পাঁচিলের গাঁয়ে একটা গেট আছে। সেই গেটটার ওপারে একটা বাগান। সে বাগানের নামটা ফুলবাগান হলেও তার তিনটে অংশ আছে। প্রথম অংশে আমবাগান, দ্বিতীয় অংশে অর্থাৎ ফুলবাগান আর শেষ অংশে আছে ঝোঁপঝাড়। গোটা বাগানটার বাঁ দিকে ঝোঁপঝাড় আর ডান দিকে খামার আর ঘরবাড়ি। গোটা বাগানটাই পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। বাগানটা ঢালু হয়ে যেখানে নিচে নেমে গেছে সেখানে অনেক ফলের গাছ লাগানো হয়। গাছগুলোর আশপাশে এখন আগাছা গজিয়ে উঠেছে। এই বাগানটা ছিল এক ফরাসি জমিদারের। এখন আগাছা আর কাটাগাছে ভর্তি। পাথরের অনেক স্তম্ভ বাগানবাড়ির ছাদটাকে ধরে ছিল। অনেক স্তম্ভ যুদ্ধের সময় ভেঙে গেলেও এখনও তেতাল্লিশটা স্তম্ভ অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
যুদ্ধের সময় এই বাগানেই একদিন এক ফরাসি পদাতিক বাহিনীর দু জন সৈনিক দুটি ইংরেজ সেনাদলের সঙ্গে যুদ্ধ করছিল। গর্তে অবরুদ্ধ ভালুকের মতো দু জন ফরাসি সৈনিক আটকা পড়ে গিয়েছিল আর ছাদের উপর থেকে ইংরেজ সৈন্যরা গুলিবর্ষণ করছিল। দু জন বীর পুরুষ দু শোজন সৈনিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে মাত্র পনেরো মিনিটের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করে।
বাগানের প্রথম অংশ থেকে কয়েক পা এগোলেই যে ফুলবাগান পাওয়া যায় সেই ফুলবাগানে যুদ্ধ চলাকালে এক ঘণ্টার মধ্যে পনের’শ বীর সৈনিক প্রাণ দেয়। একদিকের পাঁচিলের গাঁয়ে এখনও আটত্রিশটা ছিদ্র দেখা যায়। মনে হয় আজও যেন ছিদ্রগুলো যুদ্ধের অপেক্ষায় উন্মুখ হয়ে আছে। ঝোপে-ঝাড়ে লুকিয়ে থাকা ফরাসি সেনারা জানত না পাঁচিলের কাছে এক পরিখার ভেতরে ইরেজ বাহিনীর সেনারা লুকিয়ে ছিল। তারা। ঝোঁপ থেকে এগিয়ে এলেই ইংরেজ সেনারা গুলিবর্ষণ করতে থাকে অতর্কিতে। পাঁচিলের কাছে দুটো পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ আছে। তা হল দু জন মৃত ইংরেজ সেনাপতির স্মৃতিস্তম্ভ। এইভাবে সূচনা হয় ওয়াটারলু যুদ্ধের।
তবু ফরাসি সেনারা বাগানটায় ঢুকে পড়ে। কোনও মই না পেলেও তারা হাত-পা দিয়ে গুঁড়ি মেরে পাঁচিলে ডিঙিয়ে বাগানের ভেতর পড়ে গাছের তলায় হাতাহাতি লড়াই করতে থাকে ইংরেজদের সঙ্গে। বাগানের সব ঘাস রক্তে ভিজে যায়। লাসাউ বাহিনীর সাত শো সৈনিক একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়।
অন্যান্য বাগানের মতো হুগোৰ্মতের এই ফুলবাগানটাও বসন্তের আগমনে চঞ্চল হয়ে ওঠে। উতল বাতাসে গাছপালার শাখাগুলো আন্দোলিত হয়। ঘাসের সবুজ বিছানাটা ঘন হয়ে ওঠে। খামারের ঘোড়াগুলো সেখানে চরতে থাকে। শ্যাওলাধরা একটা গাছের গুঁড়ি অনেক দিন ধরে পড়ে আছে। এর পাশে একদিন মেজর ব্ল্যাকম্যান মুমূর্ষ অবস্থায় পড়ে ছিল। কাছেই আর একটা গাছের তলায় জার্মান সেনাপতি জেনারেল দুপ্লাতের মৃত্যু হয়। পন্তের আদেশ বাতিল হবার সঙ্গে সঙ্গে এক ফরাসি পরিবার নির্বাসিত হয়। এর পাশেই ছিল একটা রুগ্ণ আপেলগাছ, যেটাকে এখন খড়-মাটি দিয়ে বেঁধে কোনও রকমে খাড়া করিয়ে রাখা হয়েছে। এখানকার সব আপেলগাছেরই প্রচুর বয়স হয়েছে। ওগুলো অনেক দিনের পুরনো। তার ওপর এমন একটা গাছও নেই যার গাঁয়ে গুলির দাগ নেই। অনেক মরা গাছের কঙ্কাল আছে ফুলবাগানে। কঙ্কালসার সেই গাছগুলোর শাখা-প্রশাখায় কাক উড়ে বেড়াচ্ছে। তার ওপাশেই আবার একটা গাছে কত ভায়োলেট ফুল ফুটে রয়েছে।
.
৩
সেই ভয়ঙ্কর যুদ্ধে বদিন মারা যায়, ফর মারা যায়, ইংরেজ, জার্মান ও ফরাসি সৈন্যদের রক্তের স্রোত বয়ে যায়। একটি গভীর কুয়ো মৃতদেহে ভরে যায়। হুগোর্মতের খামারবাড়িতে বুলেট, বেয়নেট, আগুন আর তরবারির আঘাতে লাসাউ আর ব্রানসউইক বাহিনী বিধ্বস্ত হয়। তেতাল্লিশ হাজার সৈন্যসমন্বিত কতকগুলি ফরাসি বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অগণ্য মানুষের রক্তপাতে কলঙ্কিত–এই হল ওয়াটারলু যুদ্ধের কাহিনী। কোনও পথিক হুগোমঁতে গেলেই মাত্র তিন ফ্রাঁ দিলেই প্রদর্শক বলবে, মঁসিয়ে, আমি ওয়াটারলু যুদ্ধের সব কথা ও কাহিনী আপনাকে বলব।
এই যুদ্ধের কাহিনীর সুতো ধরে এই গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে বর্ণিত ঘটনাগুলোর কিছু আগে ১৮১৫ সালের সেই বিভীষিকাময় বছরটিতে।
১৮১৫ সালের ১৭ থেকে ১৮ জুনের মধ্যে যদি বৃষ্টি না হত তা হলে ইউরোপের ভবিষ্যৎ অন্য রকম হত। মাত্র কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির জল নেপোলিয়নের ভাগ্য নির্ধারণ করে। নিয়তির বিধানে একপশলা বৃষ্টির সহায়তায় ওয়াটারলুর যুদ্ধ অস্টারলিৎস-এর যুদ্ধের প্রত্যুত্তর দেয়। অকালে ঘনিয়ে আসা এক আকাশ মেঘ একটি জগতের ধ্বংসকে ডেকে আনে।
বৃষ্টির জলে মাটি ভিজে থাকার জন্য ওয়াটারলুর যুদ্ধ সাড়ে এগারটার আগে শুরু হতে পারেনি। ভিজে মাটি একটু না শুকোলে অস্ত্রবাহিনীর গাড়িগুলো চলতে পারবে না।
নেপোলিয়ন নিজে একদিন অস্ত্রবাহিনীর অফিসার থাকায় একথা ভালোভাবে জানতেন। তাঁর সামরিক অভিযান পরিকল্পনার মূল কথা ছিল তার বিপুল অস্ত্রসম্ভার ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছে দেওয়া। যে কোনও যুদ্ধজয়ের এটাই ছিল মূলমন্ত্র। কোনও দুর্গ আক্রমণের মতো শত্রুপক্ষের সেনানায়কদের প্রতিরক্ষাগত কৌশলগুলোকে ব্যর্থ ও বিপর্যস্ত করে দিতেন। কামানের গোলা দিয়ে তিনি শুধু শত্রুপক্ষের দুর্বল জায়গাগুলোকে আঘাত করতেন। কামান থেকে ক্রমাগত গোলাবর্ষণ করে শত্রুবাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে ঢুকে গিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়াই ছিল তার সাফল্যের মূলমন্ত্র। তাঁর লক্ষ্য ছিল অব্যর্থ। এই ভয়ঙ্কর পদ্ধতি পনেরো বছর ধরে অনুসরণ করে এক বিরল প্রতিভার পরিচয় দিয়ে যুদ্ধে অজেয় হয়ে ওঠেন তিনি।
