প্রাসাদটির রুদ্ধ জানালাগুলোর মধ্য দিয়ে তার ভেতরকার ঘরগুলো দেখা যায়। বাড়িটা ছিল দোতলা। ইংরেজ বাহিনী উপরতলায় আশ্রয় নেয়। বাইরের দিকে যে সিঁড়িটা নিচের তলা থেকে উপরতলায় উঠে গেছে তার পাশে দুটো গাছ ছিল। একটা গাছ একেবারে মৃত আর একটার নিচের দিকটা বিধ্বস্ত, তবু প্রতিবছর বসন্তকালে তাতে নতুন পাতা গজায়।
সেদিনকার যুদ্ধে হুগোর্মতের ছোট্ট গির্জাটা হয়ে উঠেছিল এক বিরাট হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যস্থল। তার নীরব নির্জন অভ্যন্তরভাগটা আজও অক্ষত অবস্থায় স্তব্ধ হয়ে আছে আশ্চর্যভাবে। এবড়ো-খেবড়ো পাথরের দেয়ালের গাঁয়ে কাঠের যে বেদিটাতে সেই যুদ্ধের পর থেকে কোনও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়নি সে বেদিটা আজও ঠিক আছে।
চারদিকের দেয়ালগুলো চুনকাম করা আছে। বেদির উল্টো দিকে একটা দরজার উপরে আছে বড় কাঠের ক্রস। দু দিকে দুটো জানালা। বেদির কাছ সেন্ট অ্যানির একটা কাঠের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। মেরির কোলে শিশু যিশুর মাথাটা বুলেটের আঘাতে উড়ে গেছে। ফরাসিরা গির্জাটার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য আশ্রয় নেওয়ার পর শত্রুদের চাপে পালিয়ে যাবার সময় গির্জাটায় আগুন ধরিয়ে দিয়ে যায়। সমস্ত গির্জাটা এক জ্বলন্ত চুল্লির আকার ধারণ করে। তার ছাদ খসে পড়ে। দরজা আগুনে পুড়ে যায়। কিন্তু যিশুর কাঠের মূর্তিটি পোড়েনি। জ্বলন্ত আগুনের শিখাগুলো মূর্তিটির পাগুলোকে গ্রাস করে। পায়ে এখনও পোড়র দাগ আছে। কিন্তু আর কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। কোন এক ঐন্দ্রজালিক কারণে মূর্তিটি পুড়ে যায়, তা কেউ বলতে পারে। লোকে বলে পূর্ণাঙ্গ প্রাপ্তবয়স্ক যিশুর কাঠের মূর্তির থেকে যিশুর ভাগ্য অনেক খারাপ।
গির্জার দেয়ালগুলোতে অনেক ছবি খোদাই করা ছিল। যিশুর মূর্তির পায়ের তলায় কতকগুলি ফরাসি নাম লেখা ছিল। সে নামগুলো হল হেসুইনেজ, কলে দ্য রিওমেয়র, মার্কোয়েসা দ্য আনমাদররা। ১৮৪৯ সালে দেয়ালগুলো আবার রঙ করা হয়। এই গির্জারই দরজার কাছে আহত সাব লেফটেন্যান্ট নেগ্রস যখন কুঠার হাতে হাঁপাচ্ছিল তখন তাকে তুলে আনা হয়।
গির্জার বাঁ দিকে দু-একটা কুয়ো আছে। কিন্তু কোনও বালতি নেই। কেউ জল তোলে নাসেই কুয়ো থেকে। কারণ সেই কুয়ো গরমকালে ভর্তি থাকে। যে লোক এই কুয়ো থেকে শেষবারের মতো জল তোলে তার নাম হল গিলম ভন কিনসম। সে ছিল হুগোৰ্মতের এক চাষি, বাগানে মালির কাজ করত। ১৮১৫ সালের ১৪ জুন তারিখে তার পরিবারের লোকজন সব বনে পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নেয়। ভিলিয়েরের গির্জার পাশে যে বন ছিল সেই বনে কয়েকদিন পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভীতসন্ত্রস্ত লোকরা আশ্রয় নেয়। তারা বনের মধ্যে যেখানে অস্থায়ী শিবির স্থাপন করে রান্নাবাড়া করত সেখানকার গাছগুলো আজও আধপোড়া অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
ইংরেজরা হুগোৰ্মত আক্রমণ করলে গিলম ভন কিনসম মাটির তলায় একটা ঘরের মধ্যে আশ্রয় নেয়। ইংরেজরা তাকে সেখান থেকে ধরে এনে ছোরা আর বন্দুকের বাঁট দিয়ে মারতে থাকে এবং জোর করে তাদের কাজ করতে বাধ্য করে। ইংরেজ সৈন্যরা পিপাসার্ত হয়ে পড়লে গিলম কুয়ো থেকে জল তুলে খেতে দেয়। শোনা যায় সেই জল খেয়ে নাকি অনেক ইংরেজসেনার মৃত্যু হয়। অনেকের মৃত্যু ঘটবার পর সেই কুয়োটারও মৃত্যু হয়। সেটা একেবারে অকেজো ও অকার্যকর হয়ে পড়ে।
যুদ্ধে বহু লোক মারা যাওয়ায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মৃতদেহগুলোর সৎকার করার প্রয়োজন দেখা দেয়। ইংরেজরা যুদ্ধে জয়লাভ করলেও জয়ের সঙ্গে সঙ্গে মহামারীর আক্রমণ শুরু হয়। ফরাসিদের হারিয়ে দিলেও মহামারীর আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারল না তারা। মৃত্যুর কালো হাত ম্লান করে দিল বিজয়গৌরবের সব উজ্জ্বলতাকে। টাইফাস রোগের এক বিশাল করাল ছায়া আচ্ছন্ন করে ফেলল জয়ের সব আনন্দকে। এ রোগেও অনেক সৈনিকের মৃত্যু হয়। অত মৃত লোকের জন্য কবর খোঁড়া সম্ভব নয়। তিন শো মৃতদেহ সেই গভীর কুয়োর মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো কি সব মৃতদেহই ছিল? পরে শোনা যায় কুয়োর মধ্যে ফেলে দেওয়া মৃতদেহগুলোর মধ্যে অনেক জীবন্ত মানুষও ছিল। অনেক মুমূর্ষ ও মৃতপ্রায় লোককেও ফেলে দেওয়া হয়। শোনা যায় যেদিন মৃতদেহগুলো ফেলে দেওয়া হয় সেইদিন রাতে কুয়োর ভেতর থেকে সাহায্যের জন্য অনেক কণ্ঠের কাতর আর্তনাদ ভেসে আসে।
কুয়োটার তিন দিক ঘেরা, তার মাথায় ছাদ। একদিক খোলা। সেই দিকে যাতায়াত হত। সেখানে যাবার কোনও বাধানো পথ ছিলনা।
বিধ্বস্ত বাড়িগুলোর মাঝে একটা বাড়িতে আজও কিছু লোক থাকে। এই বাড়ির সদর দরজাটা উঠোনের দিকে খোলা। এই দরজাটা বাইরে থেকে টানার জন্য একটা চামচে ধরনের হাতল আছে। যুদ্ধের কালে একজন হ্যাঁনোভারবংশীয় লেফটেন্যান্ট সেই বাড়িতে ঢোকার জন্য এই দরজার হাতলটা ধরতেই একজন ফরাসি সেনা কুড়ুল দিয়ে তার মাথাটা কেটে ফেলে।
বাগানের মালী গিলম বহুদিন আগেই মারা গেছে। তবে আজকের এই খামারবাড়িতে তারই পৌত্র ও বংশধরেরা বাস করে। সেই বাড়িতে আজ পাকা চুলওয়ালা এক বুড়িকে যুদ্ধের কথা জিজ্ঞাসা করলেই সে বলবে, আমি তখন এখানেই ছিলাম। আমার বয়স তখন মাত্র তিন। আমার কোনও জ্ঞান ছিল না। আমার বোন ছিল আমার থেকে বড়। সে তখন খুব কাঁদছিল। আমি ছিলাম আমার মা’র কোলে। আমরা ভয়ে বনে পালিয়ে গিয়েছিলাম। মাটিতে কান পেতে আমরা কামানের গোলার শব্দ শুনতে পেতাম। আমরা সেই শব্দ নকল করে মুখে কেবল বুম, বুম, বুম, শব্দ করতাম।
