আরও কিছুটা গিয়ে সে একটা উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছয়। উপত্যকাটার মাঝখান দিয়ে একটা নদী বয়ে গেছে। নদীর উপরে ছিল ছোট্ট একটা সেতু। উপত্যকার একদিকে ছিল ঢালা-ঢালা পাতাওয়ালা অনেক গাছে ভরা এক বন আর তার অন্য দিকে ছিল আবাদযোগ্য জমিতে ভরা এক প্রকাণ্ড মাঠ।
ডান দিকে পথের ধারে একটা হোটেল দেখতে পেল। চার-চাকার একটা ওয়াগন দাঁড়িয়েছিল হোটেলটার সামনে। দরজার সামনে একটা লাঙল, একগাদা কাঠ আর একটা মই ছিল। পাশে ছিল একটা শস্যভাণ্ডার।
হোটেলটার পাশে যে জমি ছিল তাতে একটা মেয়ে কাজ করছিল। মাঠের ধারে এক জায়গায় হলুদ রঙের একটা বড় পোস্টার বাতাসে উড়ছিল। তাতে এক আসন্ন গ্রাম্য মেলার কথা লেখা ছিল। হোটেলটার ওপাশে পায়ে-চলা একটা এবড়ো-খেবড়ো পথ একটা পুকুরের পাশ দিয়ে একটা ঝোঁপের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। পথিক সেই পথটা ধরল।
পথটা ধরে সে একশো গজ যেতেই সামনে একটা বড় পাঁচিল দেখতে পেল। হয়তো সেটা পঞ্চদশ শতকে নির্মিত হয়েছে। সেই পাঁচিলের গাঁয়ে একটা দরজা ছিল। তার দু পাশে ছিল চতুর্দশ লুই-এর আমলের কতকগুলি চারকোনা স্তম্ভ। দরজার সামনে বুনো ফুলে ভরা একটা পতিত জায়গা ছিল। দরজাটা বন্ধ ছিল। তার কড়ায় মরচে ধরেছিল।
দরজার পাশে স্তম্ভগুলোর একটা গাঁয়ে একটা বড় গর্ত দেখে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে ছিল পথিক। এমন সময় দরজা খুলে এক গ্রাম্য মহিলা বেরিয়ে এসে পথিকের মনের ভাব বুঝে বলল, ফরাসি কামানের গোলায় ওই গর্তটা হয় স্তম্ভের গায়ে। ওই দরজার গায়েও বুলেটের আঘাতে একটা গর্ত হয়।
পথিক সেই মহিলাটিকে বলল, এ জায়গাটার নাম কী?
মহিলা বলল, হুগোমঁত।
পথিক আরও কিছুদূর গিয়ে গাছপালা আর ঝোঁপঝাড়ের উপর সিংহের একটা মূর্তি দেখতে পেল। আসলে সে ওয়াটারলু যুদ্ধক্ষেত্রে এসে পড়েছে।
.
২
হুগোমঁত। বড় গুরুত্বপূর্ণ এক ভাগ্য নির্ধারক স্থান। এক বিপুল বিপর্যয়ের প্রারম্ভিক ক্ষেত্র। যে নেপোলিয়ন এক ধ্বংসাত্মক কুঠার হাতে ইউরোপের রাজনীতির ক্ষেত্রে বড় বড় বনস্পতিগুলোকে একে একে ছেদন করে অপ্রতিহত বেগে এগিয়ে চলেছিলেন সে নেপোলিয়ন এখানেই প্রথম বাধা পান। এখানেই প্রথম প্রতিহত হয় তাঁর গতিবেগ, তাঁর সর্বধ্বংসী কুঠারটিকে কেড়ে নেওয়া হয় এখানেই।
আগে হুগোর্মত ছিল এক সামন্তের বাসভবন, এখন সে বাসভবন আর নেই। এখন এটি শুধু খামারবাড়ি। আসল নাম হল হুগোমঁত। সমারেলের জমিদার হুগো এখানে এক প্রাসাদ নির্মাণ করেন বলে এখানকার নাম হয় হুগোমঁত, পরে এ নাম হয়ে দাঁড়ায় হুগোমঁত।
পথিক সদরদরজা ঠেলে ভেতরকার উঠোনটায় চলে গেল। যে জিনিসটা তার প্রথম চোখে পড়ল সেটা হল ষোড়শ শতাব্দীর তোরণের মতো এক দরজা। সে দরজার আশপাশের শান বাঁধানো কাজগুলো ভেঙে গেছে আর ভেঙে যাওয়ার জন্যই তার গুরুত্ব বেড়ে যায় যেন। যে কোনও প্রাচীন ধ্বংসাবশেষই স্মৃতিস্তম্ভের এক বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। সামনে আবার একটা দেয়াল দেখা গেল। সেই দেয়ালের মাঝখানে একটা তোরণের মতো দরজা ছিল। তার মধ্যে দিয়ে অনেক গাছপালায় ঘেরা এক বাগান দেখা যাচ্ছিল। উঠোনের প্রশস্ত জায়গাটায় গোবরের স্তূপ, অনেক কোদাল, বেলচা প্রভৃতি পড়ে ছিল। দু-একটা গাড়ি আর একটা ঘোড়ার ছোট্ট বাচ্চা ছিল। একটা ছোটখাটো গির্জাও ছিল। তার উপর একটা ঘণ্টা ছিল। সেই গির্জার জানালার পাশে নাশপাতি গাছে ফুল ফুটেছিল। বর্তমান খামারবাড়ির এই উঠোনটাই নেপোলিয়ন জয় করতে চেয়েছিলেন। এই জমিটুকু জয় করতে পারলেই যেন তিনি গোটা পৃথিবীটাকে জয় করতে পারতেন। কতকগুলি মুরগি মাটিতে আঁচড় কাটছিল। একটা বড় কুকুর দাঁত বার করে গর্জন করছিল, যেন সে ওয়াটারলুর যুদ্ধে ইংরেজদের প্রতিনিধিত্ব করছিল। সাত ঘণ্টা ধরে কুকের অধীনে ইংরেজ সৈন্যদের চারটি দল ফরাসিদের একটি সেনাদলের প্রচণ্ড আক্রমণকে প্রতিহত করে।
মানচিত্রে দেখলে হুগোত জায়গাটাকে এমন এক আয়তক্ষেত্রাকার বলে মনে হয় যার কোণটা ছাঁটা পড়ে গেছে। হুগোর্মতের দু দিকে দুটো গেট আছে। আগেকার জমিদারবাড়িতে ঢোকার জন্য দক্ষিণ দিকে একটা গেট আছে আর উত্তর দিকের গেট দিয়ে খামারবাড়িতে ঢোকা যায়। নেপোলিয়ন তার ভাইয়ের ওপর দিয়েছিলেন এই আক্রমণের ভার। গিলেসিনেত্তে, ফর ও বেশনুর সেনাদলগুলো হুগোর্মতে সমবেত ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইংরেজ সেনাবাহিনী ছিল দক্ষিণ দিকে। ফরাসি সেনাদলগুলো ছিল উত্তর দিকে।
খামারের বাড়িগুলো ছিল দক্ষিণ দিকে। উত্তর দিকের গেটটা ফরাসি বাহিনীর দ্বারা বিধ্বস্ত হয়। উত্তর দিকের গেট সংলগ্ন প্রাচীরটির নিচের দিকটা পাথর দিয়ে তৈরি এবং তার উপর দিকটা ইট দিয়ে তৈরি। এখানে যুদ্ধ খুব ঘোরতর হয়। এই প্রাচীরে অনেকদিন রক্তের দাগ ছিল। এই যুদ্ধেই বদিন নিহত হন। অতীতের জীবন-মৃত্যুর এক যুদ্ধের বিভীষিকা ও প্রবলতা আজও যেন প্রাচীরগাত্রে খোদাই করা আছে। ভগ্ন প্রাচীরের অংশগুলো অসংখ্য ক্ষতমুখের মতো বেদনায় হাঁ করে আছে যেন আজও। এখানকার প্রাচীরগুলো ১৮১৫ সালে নির্মিত হয়।
ইংরেজ বাহিনী এই হুগোমঁতে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। ফরাসি বাহিনী সে অবরোধ ভেঙে ফেলে। কিন্তু দাঁড়াতে পারেনি সেখানে। গির্জার পাশে জমিদারদের প্রাচীন বাসাভবনটির ধ্বংসাবশেষটি আজও সেই যুদ্ধের সাক্ষ্য বহন করছে। ফরাসি বাহিনী চারদিকে সেই প্রাচীন প্রাসাদটিকে আক্রমণ করে। অবশেষে কাঠ এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের জ্বলন্ত শিখা দিয়ে শত্রুদের বন্দুকের গুলির মোকাবিলা করা হয়।
