দরজায় মৃদু একটা করাঘাত হল এবং সিস্টার সিমপ্লিস ঘরে ঢুকল। তার মুখটা ম্লান এবং চোখদুটো লাল হয়ে উঠেছিল। তার হাতে একটা বাতি ছিল এবং হাতটা কাঁপছিল। আমরা যতই আত্মস্থ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও শৃঙ্খলাপরায়ণ হই না কেন, দুর্ভাগ্যের নির্মম কশাঘাত এমনি করে আমাদের বিচলিত করে, এমনি আমাদের আসল স্বরূপটা টেনে বার করে বাইরে। সেদিনের ঘটনা যা তার সামনে ঘটে গেছে তাতে সন্ন্যাসিনীর মাঝে সুপ্ত নারীসত্তা আবার জেগে উঠেছে। সে সারাদিন কেঁদেছে। তার সর্বাঙ্গ শিহরিত হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে।
ভলজাঁ এর মধ্যে একটা চিঠি লেখে। চিঠিটা সে সিস্টারের হাতে দিয়ে বলল, এটা কুরেকে দেবে সিস্টার। তুমি এটা পড়ে দেখতে পার।
সিস্টার চিঠিটা পড়ল। তাতে লেখা ছিল, মঁসিয়ে লে কুরেকে আমি যে টাকা রেখে যাচ্ছি তার সব ভার নেবার জন্য অনুরোধ করছি। সেই টাকায় তিনি আমার মামলার খরচ চালাবেন এবং যে মেয়েটি হাসপাতালে মারা গেছে তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য যা লাগবে তা দিয়ে দেবেন। বাকি যা থাকবে গরিব-দুঃখীদের মধ্যে তা বিলিয়ে দেবেন।
সিস্টার কী বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারল না। শেষে সে জিজ্ঞাসা করল, ভলজাঁ শেষবারের মতো মৃত ফাঁতিনেকে দেখবে কি না।
ভলজাঁ বলল, না, ওরা আমাকে খুঁজছে। মৃত্যুশয্যার পাশে ওরা আমাকে গ্রেপ্তার। করলে তার শান্তি বিঘ্নিত হবে।
তার কথা শেষ হতেই নিচে কাদের পায়ের শব্দ শোনা গেল। সেই সঙ্গে শোনা গেল নিচে সেই বুড়ি মেয়েটি প্রতিবাদের সুরে জোর গলায় কী বলছে। সে বলছে, আমি সারাদিন এখানে বসে আছি। কাউকে বাড়িতে ঢুকতে দেখিনি।
একজন লোক বলল, কিন্তু উপরকার ঘরে আলো জ্বলছে।
ভলজাঁ বুঝতে পারল নিচে জেভাৰ্ত কথা বলছে।
ঘরের মধ্যে একটা জায়গা ছিল যেখানে কেউ থাকলে ঘরে কেউ ঢুকলে তাকে দেখতে পাবে না। জাঁ ভলজাঁ বাতির আলোটা নিবিয়ে দিয়ে সেইখানে লুকিয়ে পড়ল। সিস্টার সিমপ্লিস টেবিলের পাশে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করতে লাগল।
এমন সময় দরজা খুলে জেতার্ত ঘরে ঢুকল। বারান্দায় কয়েকজন লোকের গলা শুনতে পাওয়া গেল। বুড়ি তখনও তাদের সঙ্গে বাদ-প্রতিবাদ করছে। ঘরের মধ্যে একটা বাতি মিটমিট করে জ্বলছিল।
সিস্টারকে প্রার্থনা করতে দেখে জেতার্ত লজ্জা পেয়ে গেল।
জেভার্তের প্রকৃতিটা যত কঠোরই হোক না কেন ধর্মের প্রভুত্বের প্রতি তার একটা শ্রদ্ধা ছিল। তার মতে একজন যাজক বা সন্ন্যাসিনী কোনও ভুল করতে পারে না, কোনও পাপকাজ করতে পারে না। ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে সে ছিল একেবারে গোড়া। ধর্মের প্রভুত্ব সম্পর্কে তার মনে কোনও সংশয় বা প্রশ্ন ছিল না। তার মতে যাজক বা সন্ন্যাসিনীদের আত্মা আর বাস্তব জগতের মধ্যে ছিল এমন এক প্রাচীরের ব্যবধান, যার মধ্যে যাতায়াতের কেবল একটা মাত্রই দরজা ছিল। সে জাঁ হল সত্যের দরজা।
সিস্টার সিমপ্লিসকে প্রার্থনা করতে দেখে জেভার্তের চলে যেতে ইচ্ছা হল।
কিন্তু তার একটা কর্তব্য আছে। যে কর্তব্য পালন করার জন্য সে এখানে এসেছে। সে কর্তব্য সে অস্বীকার করতে পারে না।
জেতার্ত জানত সিস্টার সিমপ্লিস জীবনে কখনও মিথ্যা কথা বলেনি। তাই তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখত।
জেতার্ত এবার সিস্টারকে বলল, সিস্টার, আপনি কি এ ঘরে একা আছেন?
সিস্টার সিমপ্লিস এক কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়ল। সে বুড়ি মেয়েটি ভয়ে কাঁপতে লাগল। তার মনে হল সিস্টার মূৰ্ছিত হয়ে পড়বে।
সিস্টার সিমপ্লিস মুখ তুলে জেতার্তকে বলল, হ্যাঁ।
জেভার্ত বলল, মাপ করবেন। আজ সন্ধ্যায় আপনি জাঁ ভলজাঁ নামে একজন লোককে দেখেছেন? আজ সে হাজত থেকে পালিয়ে এসেছে। আমরা তাকে খুঁজছি। আপনি তাকে দেখেছেন?
সিস্টার বলল, না।
দ্বিতীয়বার মিথ্যা কথা বলল সিস্টার সিমপ্লিস। এ মিথ্যা তার আত্মত্যাগেরই সমতুল।
জেভার্ত বলল, আমি ক্ষমা চাইছি।
এই বলে ঘর থেকে চলে গেল সে।
যে সিমপ্লিস সংসার ত্যাগ করে দীর্ঘকাল ধর্মের কাজে যোগদান করেছে তার কথা সত্য বলে ধরে নিল। সে লক্ষ করল না একটা বাতি টেবিলের উপর নেভানো ছিল।
এক ঘণ্টা পরে একটা লোককে কুয়াশার মধ্য দিয়ে প্যারিসের পথে একা দেখা যায়। সে লোক হল জাঁ ভলজাঁ। দু একজন গাড়ির চালক গাড়ি চালিয়ে সে পথে যাবার সময় দেখে একটা লোক আলখাল্লা পরে আর হাতে একটা পুঁটলি নিয়ে প্যারিসের পথে হেঁটে চলেছে। সে আলখাল্লাটা কোথায় পেয়েছে ভলজাঁ তা কেউ জানে না।
যে পৃথিবীর মাটি আমাদের সকলের মাতা, আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল সেই পৃথিবীর মাটিতে চিরবিশ্রাম লাভ করে ফাঁতিনে।
জাঁ ভলজাঁ যে টাকা রেখে গিয়েছিল, কুরে সে টাকার বেশিরভাগ গরিব-দুঃখীদের জন্য রেখে দিয়ে তার থেকে খুব অল্প টাকাই ফাঁতিনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য খরচ করে। কবরখানার এক প্রান্তে দীন-দরিদ্রদের জন্য সংরক্ষিত এক জায়গায় তাকে অতি সাধারণভাবে কবর দেওয়া হয়। তার কবরটাও ছিল তার বিছানার মতোই দীন হীন।
২.১ ১৮৬১ সালের মে মাসে
দ্বিতীয় খণ্ড – প্রথম পরিচ্ছেদ
১.
গত বছর অর্থাৎ ১৮৬১ সালের মে মাসে কোনও এক সকালে এই কাহিনীর লেখক একজন পথিকের মতো লিভেলের থেকে লা হুলপের পথে এগিয়ে চলেছিল। সারবন্দি গাছে ঘেরা গ্রামাঞ্চলের একটা পথ ধরে ক্রমাগত হাঁটছিল সে। সে অঞ্চলজুড়ে ছিল সমুদ্রের নিশ্চল ঢেউয়ের মতো অসংখ্য পাহাড়। লীলয় আর বয়-সেনোর পার হয়ে পশ্চিম দিকে ব্রেন লালিউদের চার্চের বড় ঘণ্টাটা দেখতে পেল। বাঁ দিকে পাহাড়ের ধারে একটা বন দেখতে পেল। এরপর কিছুটা গিয়ে চৌরাস্তার মোড়ে একটা কাঠের প্লেটে ‘৪ নম্বর গেট’ লেখা ছিল। তার পাশেই ছিল একটা প্রাইভেট কাফে।
