খাটের মাথার উপর লোহার রডে কনুই রেখে হাতের তালুতে মুখ রেখে ফাঁতিনের নিথর নিস্পন্দ দেহটার দিকে তাকিয়ে নীরবে কী ভাবতে লাগল ভলজাঁ। ফাঁতিনের মৃত্যুর কথাটাই তখন তার সমস্ত মন জুড়ে বিরাজ করছিল। এক অনির্বচনীয় করুণা ফুটে উঠেছিল তার মুখের ওপর। কিছুক্ষণ পরে সে ফাঁতিনের মৃতদেহটার উপর ঝুঁকে পড়ে খুব নিচু গলায় কী বলতে লাগল।
সে তাকে কী বলল? একজন মৃত মহিলাকে একজন দণ্ডিত ব্যক্তি কী বলতে পারে? কোনও জীবন্ত মানুষ তার যে কথা শুনতে পেল না, সে কথা কি মৃতজন শুনতে পেল? অনেক সময় এমন সব অপ্রাকৃত অবান্তর ঘটনা ঘটে যা এক মহান বাস্তবতা হিসেবে শ্রদ্ধা পায় মানুষের কাছ থেকে। সিস্টার সিমপ্লিস সেই দৃশ্যের একমাত্র সাক্ষী হয়ে পরে বলেছিল, ভলজাঁ যখন ফাঁতিনের কানে কানে অশ্রুত শব্দে কী সব বলছিল, তখন ফাঁতিনের ফ্যাকাশে সাদা ঠোঁট দুটোয় আর তার শূন্য চোখে এক মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। মৃত্যুর মাঝেও তার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে ওঠে।
ফঁতিনের মাথাটা দু হাতে ধরে মৃত্যুশোকাহত মাতার মতো পরম যত্নে বালিশের উপর রেখে দিল ভলজাঁ। তার নাইট গাউনের ফিতেটা বেঁধে দিল। তার মাথার চুলগুলো ঠিক করে গুছিয়ে দিয়ে তার উপর টুপিটা লাগিয়ে দিল। শেষে তার চোখের পাতাগুলো বন্ধ করে দিল।
ফাঁতিনের একটা হাত বিছানার পাশে ঝুলছিল। ভলজাঁ সেই হাতটা নিয়ে চুম্বন করল।
এরপর সে জেভার্তের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, এবার কী করতে হবে বল।
.
৫
জাঁ ভলজাঁকে গ্রেপ্তার করে মন্ত্রিউল থানার হাজত-ঘরে বন্ধ করে রাখল জেভাৰ্ত।
মঁসিয়ে ম্যালেনের গ্রেপ্তারের ঘটনা দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করল সারা শহরে। সে একজন ভূতপূর্ব কয়েদি এ কথা শুনে সকলেই ঘৃণায় পরিত্যাগ করল তাকে। সে যেসব ভালো কাজ করেছিল এতদিন ধরে সেসব কাজের কথা ভুলে গেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। অবশ্য অ্যারাসে কী ঘটনা ঘটেছিল তা শহরের কেউ জানত না।
শহরের নানা জায়গায় একদল করে লোক জটলা পাকিয়ে তার কথা বলাবলি করতে লাগল। কেউ বলল, শুনেছ, লোকটা জেলফেরত কয়েদি।
আর একজন বলল, কে? মঁসিয়ে ম্যাদলেন? অসম্ভব!
কিন্তু একথা সত্যি। তার নাম ম্যাদলেন নয়, বর্জা না কি। তাকে গ্রেপ্তার করে শহরে থানায় রাখা হয়েছে। পরে অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হবে। কয়েক বছর আগের এক ডাকাতির ঘটনার অভিযোগে অ্যারাসের আদালতে তার বিচার হবে।
আর একজন বলল, আমি কিন্তু মোটেই আশ্চর্য হইনি এ ঘটনায়। আমার প্রায়ই মনে হত লোকটা এত ভালো কাজ কেন করছে। আমার মনে সন্দেহ ছিল। সে নিজে কোনও সাজপোশাক করত না। শুধু অকাতরে দান করত। কোনও একটা রহস্য আছে এর মধ্যে–এই কথাই শুধু আমার মনে হত।
শহরের অনেক অভিজাত লোকের বাড়ির বৈঠকখানাতেও তার কথা আলোচিত হল। একদিন এক বৃদ্ধা বলল, ভালোই হল। বোনাপার্টপন্থীদের শিক্ষা হওয়া উচিত।
এইভাবে ম্যালেনের প্রেতাত্মাটা মন্ত্রিউল শহর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। কেবল তিন-চারজন লোক বিশ্বস্ত রয়ে গেল তার স্মৃতির প্রতি। তাদের মধ্যে ছিল সেই বুড়ি মেয়েটি যে ম্যালেনের বাড়িতে থেকে তার দেখাশোনা করত।
সেদিন সন্ধ্যায় বুড়িটি দারোয়ানের ঘরের কাছে বসে ভাবতে লাগল। আজ সারাদিন কারখানা বন্ধ ছিল। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। হাসপাতালে ফাঁতিনের মৃত্যুশয্যার পাশে শুধু সিস্টার সিমপ্লিস আর সিস্টার পার্পেচুয়া বসে ছিল।
ম্যাদলেন বাড়ি ফিরে আসবে এই আশায় সেদিনও বসে ছিল সে। ম্যাদলেন বাড়ি ফিরলে সে তার ঘর থেকে চাবি বার করে দিত। তার বাতি জ্বেলে দিত। তার পর ম্যাদলেন তার নিজের ঘরে চলে যেত।
এমন সময় তার ছোট জানালাটা খুলে কে একটা হাত ঢুকিয়ে নির্দিষ্ট জায়গা থেকে চাবিটা বার করে নিল।
ভয়ে ও বিস্ময়ে কোনও কথা বলতে পারল না বুড়িটি। তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ঈশ্বর আমায় ক্ষমা করুন মঁসিয়ে মেয়র। আমি ভেবেছিলাম আপনি
ম্যাদলেন বলল, তুমি ভেবেছিলে আমি জেলে গেছি। হ্যাঁ, আমি জেলেই গিয়েছিলাম। হাজতে ছিলাম। জানালার একটা রড ভেঙে আমি এখানে এসেছি। আমি উপরতলায় আমার ঘরে যাচ্ছি। একবার সিস্টার সিমপ্লিসকে ডেকে দেবে? সে বোধ হয় হাসপাতালেই আছে।
বুড়ি মেয়েটা চলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। ভলজাঁ জানত সে বড় বিশ্বস্ত এবং সে কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করে না।
ভলজাঁ উপরতলায় গিয়ে নিজের ঘরের দরজাটা খুলল। তার পর বাতি জ্বালাল। জানালার সার্সিগুলো বন্ধই রেখে দিল সতর্কতা হিসেবে। কারণ জানালাগুলো বড় রাস্তা থেকে দেখা যায়। আলো দেখলে লোকে সন্দেহ করবে।
এবার ভলজাঁ ঘরের খাট, চেয়ার, আসবাবপত্রগুলো দেখতে লাগল। বিছানাটাতে সে তিন রাত শোয়নি। সেদিন রাতে সে যেসব আসবাবগুলো সরিয়ে ঘরটা ওলটপালট করেছিল, চাকরে আবার সেগুলো সব গুছিয়ে ঠিক করে রেখেছে। ঘরে আর আগুন জ্বালানো হয়নি। আগুনের জায়গাটায় ছাইয়ের গাদায় তার আগের লাঠিটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পেতিত গার্ভের মুদ্রাটা আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে।
ভলজাঁ একটা কাগজ বার করে তার উপর লিখল, এইখানে আমার আগের পোড়া লাঠিটা আর পেতিত গার্ভের কাছ থেকে চুরি করা মুদ্রাটা রইল। এই মুদ্রার কথাটা আমি আদালতে বলেছিলাম। লেখার পর কাগজটা আর মুদ্রাটা ঘরের এমন এক জায়গায় রাখল যাতে কেউ ঘরে ঢুকলেই সেগুলো তার নজরে পড়ে। এরপর ড্রয়ার থেকে একটা পুরনো শার্ট বার করে সেটা ছিঁড়ে বিশপের দেওয়া রুপোর বাতিদান দুটো জড়িয়ে নিল। জেল থেকে দেওয়া যে কালো রুটিটা এতদিন ধরে সে রেখে দিয়েছিল সেটা সে টুকরো টুকরো করে ফেলল। পরে যখন পুলিশ এসে ঘরটা তছনছ করে তখন সেই টুকরোগুলো পায়।
