জেতার্ত বলল, তা হলে তাড়াতাড়ি কর।
কথাগুলো সে এমন নির্মমভাবে এবং এত তাড়াতাড়ি বলল যে মনে হল যেন কোনও মানুষ কথা বলছে না, একটা পশু গর্জন করছে। প্রথাগত কোনও রীতিনীতি মেনে চলল না সে। সে গ্রেপ্তারের কথাটা সরকারিভাবে ঘোষণা করল না অথবা পরোয়ানাটা দেখাল। তার কাছে জাঁ ভলজাঁ ছিল যেন তার বিরামহীন দুশ্চিন্তার এক রহস্যময় বস্তু, এক ছায়াশ যার সঙ্গে পাঁচ বছর ধরে লড়াই করে এসে আজ তাকে ধরাশায়ী করতে পেরেছে। এই গ্রেপ্তার যেন সেই লড়াইয়ের শেষ পরিণতি, কোনও ঘটনার সূচনা নয়। যে তীক্ষ্ণদৃষ্টির শলাকা দিয়ে আজ হতে দু মাস আগে তিনের দেহটাকে ভেদ করে তার অস্থিমজ্জাকে বিদ্ধ করেছিল, সেই দৃষ্টিশলাকা দিয়ে আজ আবার জাঁ ভলকে বিদ্ধ করল সে। ‘নাও তাড়াতাড়ি কর’ নির্মমভাবে এই কথাগুলো ছুঁড়ে দিল তার দিকে।
জেভার্তের কড়া কথাগুলো ফাঁতিনের কানে যেতেই সে আবার চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু মেয়র কাছে থাকায় মনে সাহস পেল সে।
জেভার্ত ঘরের ভেতর কিছুটা এগিয়ে গিয়ে বলল, তা হলে তুমি আসছ?
ফাঁতিনে হতবুদ্ধি হয়ে তার চারদিকে তাকাল। ঘরের মধ্যে তখন সে ছাড়া শুধু ছিল সিস্টার সিমপ্লিস আর মেয়র। তা হলে ফাঁতিনে ছাড়া আর কাকে সে কথা বলবে জেভাৰ্ত? সহসা এমন এক অবিশ্বাস্য ও অবাঞ্ছিত ঘটনা সে নিজের চোখে দেখল যা সে রোগের ঘরেও কল্পনা করতে পারেনি কোনও দিন, যা দেখার সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে কাঁপন ধরে গেল তার। সে দেখল পুলিশ ইন্সপেক্টার জেভার্ত মেয়র মঁসিয়ে ম্যাদলেনের জামার কলার ধরেছে আর মেয়র তা নতশিরে মেনে নিয়েছে।
ফাঁতিনে বলে উঠল, মঁসিয়ে মেয়র। সব দাঁত বার করে এক কুটিল অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল জেভাৰ্ত। বলল, সে আর মেয়র নেই।
জাঁ ভলজাঁ জেভাতের হাত থেকে তার ঘাড়টা ছাড়াবার কোনও চেষ্টা করল না। সে শুধু মুখে বলল, জেভার্ত–
জেভার্ত বলল, বল ইন্সপেক্টার।
ঠিক আছে ইন্সপেক্টার, আমি গোপনে তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।
জেভার্ত বলল, যা কিছু বলার আছে বলে ফেল। আমার সঙ্গে কেউ চুপি চুপি কথা বলে না।
জাঁ ভলজাঁ চাপা গলায় বলল, আমি একটা বিষয়ে তোমার অনুগ্রহ চাই।
আমি বলছি, বলে ফেল।
কিন্তু সেটা শুধু তোমাকেই একান্তভাবে বলতে চাই।
আমি সে কথা শুনতে চাই না।
জাঁ ভলজাঁ জেভার্তের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, আমাকে মাত্র তিন দিনের সময় দাও। এই হতভাগিনী মহিলার মেয়েটিকে আনার জন্য তিন দিনের সময় দাও। এর জন্য তোমাকে আমি যে কোনও পরিমাণ টাকা দেব। ইচ্ছা করলে তুমি আমার সঙ্গেও যেতে পার।
জেতার্ত বলল, তুমি কি ঠাট্টা করছ? তুমি কি বোকা! তিন দিন বাইরে থাকবে এই মেয়েটার মেয়েকে আনার জন্য? চমৎকার!
ফাঁতিনে কাঁপতে লাগল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, আমার মেয়েকে আনতে হবে? সে তা হলে আসেনি? সিস্টার, আমার কথার জবাব দাও, কসেত্তে কোথায়? আমি তাকে দেখতে চাই। মঁসিয়ে ম্যাদলেন—
জেভার্ত মেঝের উপর পা-টা ঠুকল। বলল, চুপ কর ব্যভিচারিণী কোথাকার! এ বেশ রাজত্ব হয়েছে, যেখানে জেলমুক্ত কয়েদিরা ম্যাজিস্ট্রেট হয় আর বারবনিতারা কাউন্টপত্নীদের মতো সেবা-শুশ্রূষা পায়। কিন্তু আমরা এ সবকিছুর অবসান ঘটাতে চলেছি এবং তার সময় এসেছে।
ভলজাঁ’র জামার কলারটা আরও জোরে ধরে জেতার্ত ফাঁতিনেকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল, আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি। এখানে মঁসিয়ে ম্যাদলেন বা মেয়র বলে কেউ নেই। এখানে আছে শুধু এক দাগি অপরাধী, এক কয়েদি, যার নাম জাঁ ভলজাঁ এবং যাকে আমি ধরে আছি।
ফাঁতিনে তার হাতে ভর দিয়ে বিছানার উপর খাড়া হয়ে বসল। তার দৃষ্টি জেতার্ত থেকে ভলজাঁ, আর ভলজাঁ থেকে সিস্টারের দিকে ঘুরে বেড়াতে লাগল। সে কী বলতে গেল, কিন্তু পারল না, শুধু একটা গোঙানির মতো কাতর শব্দ বেরিয়ে এল তার মুখ থেকে। তার দাঁতগুলো কড়মড় করতে লাগল। জলে ডুবে যাবার সময় কোনও লোক যেমন কিছু একটা ধরার চেষ্টা করে তেমনি করে সে দু হাত বাড়িয়ে কী করতে গেল। তার পর বালিশের উপর ঢলে পড়ল। মাথাটা খুঁজে পড়ল তার। চোখ দুটো বড় বড় করে বন্ধ করল সে আর মুখটা হাঁ করে রইল।
ফাঁতিনের দেহটা নিষ্প্রাণ হয়ে গেল।
ভলজাঁ এবার জোর করে জের্তের হাতটা সরিয়ে দিয়ে অনায়াসে তার ঘাড়টা মুক্ত করল। তার পর জেতার্তকে বলল, তুমি এই মেয়েটিকে হত্যা করেছ।
জেভার্ত প্রচণ্ড রাগের সঙ্গে বলল, ঠিক হয়েছে। আমি এখানে তর্ক করতে আসিনি। অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। নিচে পুলিশ পাহারা আছে। তুমি যাবে, নাকি তোমার হাতে হাতকড়া লাগাব?
ঘরের কোণে অব্যবহৃত একটা লোহার খাট ছিল। ভলজাঁ সেখানে গিয়ে তার থেকে একটা লোহার রড টেনে বার করে সেটা হাতে নিয়ে জেভার্তের সামনে এসে দাঁড়াল। জেভার্ত ভয়ে দরজার কাছে পিছিয়ে গেল।
ভলজাঁ সেই লোহার রডটা হাতে নিয়ে ফাঁতিনের বিছানাটার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে মুখ ঘুরিয়ে জেভার্তকে বলল, এই মুহূর্তে তুমি আমার কাজে হস্তক্ষেপ করবে না।
ভয়ে কাঁপতে লাগল জেভাৰ্ত। সে একবার ভাবল নিচে গিয়ে পুলিশদের ডেকে আনবে। কিন্তু আবার ভাবল, সে বাইরে যেতে গেলে ভলজাঁ দরজায় খিল দিয়ে তাকে আটকে দিতে পারে। তাই সে দরজার কাছে নীরবে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল ভলজাঁ কী করে।
