জেতার্তকে যারা ভালো করে চেনে না তারা সে যখন হাসপাতালে ম্যাদলেনের খোঁজে যায় তখন তার মনের মধ্যে কী ধরনের চিন্তা বা অনুভূতির খেলা চলছিল তা ঠিক বুঝতে পারবে না। তার বাইরের ভাবটা ছিল শান্ত ও আত্মস্থ এবং তার ধূসর চুলগুলো ছিল ভালোভাবে আঁচড়ানো। যারা তাকে চিনত তারা তখন তাকে ভালোভাবে খুঁটিয়ে দেখলে আশ্চর্য হয়ে যেত।
জেভার্ত ছিল শৃঙ্খলাপরায়ণ লোক। তার চেহারা ও পোশাক-আশাক সব সময় গুছানো থাকত। তার কোর্টের বোতাম সব সময় দেওয়া থাকত। কখনও যদি তার সরকারি পোশাকের কিছুটা অগোছালো থাকত তা হলে বুঝতে হবে তার মনের ভেতর কোনও কারণে ঝড় বইছে।
জেভার্ত হাসপাতালে ম্যাদলেনকে গ্রেপ্তার করতে যাবার সময় চার-পাঁচজন পুলিশ সঙ্গে নিয়ে যায়। তাদের হাসপাতালের উঠোনে রেখে সে সোজা ফাঁতিনের ঘরে চলে যায়। সে মেয়রের কাছে যেতে চাইলে দারোয়ান তাকে নিয়ে যায় বিনা বাধায়। জেভাৰ্ত ফাঁতিনের ঘরে ঢুকে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে দরজার কাছে।
জেভার্তের টুপিটা তার মাথার উপরেই ছিল। তার বাঁ হাতটা ছিল তার কোটের বোতামের উপর। তার বগলের মধ্যে ছিল ধাতব হাতলওয়ালা ছড়িটা। তাকে প্রথমে কেউ দেখতে পায়নি। তার ওপর প্রথমে ফঁতিনের চোখ পড়তেই সে চিৎকার করে ওঠে ভয়ে।
ম্যাদলেন তার দিকে তাকাতেই জেভার্তের চেহারাটা ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। তার আনন্দের চাপা আবেগটা ভয়ঙ্কর হয়ে ফুটে ওঠে মুখের ওপর। তার মুখটা এমন এক শয়তানের মতো হয়ে ওঠে যেন তার হারানো শিকার খুঁজে পেয়েছে হঠাৎ।
সে যে অবশেষে জাঁ ভলজাঁকে হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে গেছে এই চিন্তার সুতো ধরে তার আন্দোলিত আত্মাটা গম্ভীর হয়ে চোখ-মুখের উপরে উঠে এল। মাঝখানে সে সন্ধানের সুতোটা হারিয়ে ফেলে শ্যাম্পম্যাথিউ নামে লোকটাকে ভলজাঁ বলে ধরে নেওয়ায় যে অপমানের কবলে পড়েছিল, সে অপমান-জয়ের গর্বে ও আনন্দের আবেগের স্রোতে কোথায় ভেসে গেল। সে বুঝতে পারল তার চোখ কখনও ভুল করে না। এক কুৎসিত জয়ের আত্মম্ভরী আনন্দ আর গভীর পরিতৃপ্তি যেন তার উদ্ধত চেহারাটার ওপর ঢেউ খেলে যাচ্ছিল।
জেতার্ত তখন যেন স্বর্গসুখ অনুভব করছিল তার মনে। সে তার গুরুত্ব খুব বেশি করে অনুভব করছিল। সেই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিল সে যেন ন্যায়বিচার, আলো আর সত্যের মূর্ত ও জীবন্ত প্রতীক হয়ে উঠেছে। সে মূর্তি যত সব অশুভ অন্ধকার শক্তিকে পদদলিত করার মহান কার্যে নিরত। সে যেন বাস্তব জগতে নেই, এক মহাশূন্যে ভাসছে আর তার চারদিকে আইনের অবিসম্বাদিত কর্তৃত্ব, বিচারে অমোঘ রায়, জনগণের ধিক্কার নৈশ আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির মতো কিরণ দিচ্ছে। সে যেন তখন আইন-শৃঙ্খলার অভিভাবক, ন্যায়বিচারের বিদ্যুলোক, সমাজের প্রতিশোধ এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রশক্তির প্রতিনিধি রূপে এক অনাস্বাদিতপূর্ব গৌরবের আলোকবন্যায় অভিস্নাত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার উদ্ধত আত্মম্ভরী চেহারাটা এক অতিপ্রাকৃত শক্তিলীলায় প্রমত্ত ধ্বংসোন্মাদ এক দেবদূতের মতো নীলনির্মল আকাশে বিচরণ করে বেড়াচ্ছিল যেন। তার হাতের বজ্রমুষ্টিটা হয়ে উঠেছিল যেন এক আতপ্ত তরবারি। এক নিবিড়তম তৃপ্তির হাসি হাসতে হাসতে সে যেন সমাজ ও সংসারের যত রকমের পাপ, অপরাধ, বিদ্রোহ ও নরকের উপর ঘৃণা ও দর্পভরে হেঁটে চলেছিল সব কিছু মাড়িয়ে দিয়ে।
তবুও এই উদ্ধত আত্মম্ভরী চেহারাটার মধ্যে কোথায় যেন একটা মহত্ত্ব ছিল। সে ভয়ঙ্কর হলেও তাকে ঘৃণ্য বলা যায় না। দৃঢ়তা, নিষ্ঠা, সততা, আত্মপ্রত্যয়, কর্তব্যবোধ প্রভৃতি গুণগুলো কুপথে চালিত হয়ে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেও তাদের মধ্যে কিছুটা মহত্ত্ব অবশিষ্ট থেকে যায়। সেই ভয়াবহতার মাঝেও মানবিক বিবেকরূপী এক মহত্ত্ব থেকে যায় তার মধ্যে। যে কারণ এইসব গুণগুলোকে ভুল পথে চালিত করে ভয়ঙ্কর করে তোলে তা হল এক ভ্রান্ত ধারণা। তাছাড়া আর কোনও কারণ নেই। কোনও অত্যুৎসাহী ব্যক্তি সততার সঙ্গে কোনও নিষ্ঠুর কাজ করে এক নির্মম আনন্দ লাভ করলেও সে আমাদের এক বিষাদগ্রস্ত শ্রদ্ধা আকর্ষণ করে। জেভার্ত না জানলেও তার ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর আনন্দ এক ধরনের অনুকম্পা লাভ করে আমাদের কাছ থেকে। এক নিষ্ঠুর কঠোরতার সঙ্গে সম্পন্ন যে কোনও শুভ কর্ম ও চিন্তার মধ্যে যেসব অশুভ শক্তি লীলাচঞ্চল হয়ে ওঠে, সেইসব অশুভ শক্তিগুলো একযোগে যেন মূর্ত হয়ে উঠেছিল জেভার্তের মুখের ওপর। তার মুখের সে দৃশ্য সত্যিই মর্মবিদারক।
.
৪
যেদিন জেভার্তের হাত থেকে ফাঁতিনেকে উদ্ধার করে ম্যাদলেন সেদিন থেকে জেভার্তের দিকে কখনও চোখ ফেরায়নি ফাঁতিনে। তার রুগণ মন জেভার্তের আসার কারণ কিছু বুঝতে না পারলেও জেভার্ত যে তারই জন্য এই হাসপাতালে এসেছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ রইল না তার মনে। তাকে চোখে দেখার সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর এক পূর্বাস্বাদ অনুভব করল যেন সে। সে দু হাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে উঠল কাতরভাবে, মঁসিয়ে ম্যাদলেন, আমাকে বাঁচাও।
জাঁ ভলজাঁ (ম্যাদলেনকে এবার থেকে আমরা এই নামেই ডাকব) উঠে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে বলল, ভয় পেও না, ও তোমার জন্য আসেনি।
এবার জেভাৰ্তের দিকে তাকিয়ে ভলজাঁ বলল, তুমি কী জন্য এখানে এসেছ আমি তা জানি।
