ম্যাদলেন তার হাতটা ধরে ছিল তখনও। ফাঁতিনের দিকে তাকিয়ে ছিল সে একদৃষ্টিতে। একটা কথা বলার ছিল তাকে। কিন্তু বলতে গিয়েও বলতে পারছিল না। ডাক্তার চলে গেছে, শুধু সিস্টার সিমপ্লিস ঘরে ছিল তখনও।
হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে চিৎকার করে উঠল ফাঁতিনে, আমি তার কথা শুনতে পাচ্ছি। তার কথা শুনতে পাচ্ছি।
হাসপাতালের উঠোনে একটি বাচ্চা মেয়ে খেলা করছিল। হাসপাতালের কোনও মেয়ে কর্মীর সন্তান। মেয়েটি ছোটাছুটি করছিল। নাটকে কল্পিত দুটি সাজানো দৃশ্যের মতো অনেক সময় বিচ্ছিন্ন ঘটনা পরস্পরের কাছে কেমন অদ্ভুতভাবে মিলে যায়।
ফাঁতিনে বলল, আমি বেশ বুঝতে পারছি, এ কসেক্তের কণ্ঠস্বর।
মেয়েটি ছুটতে ছুটতে সেদিকে একবার এসে আবার চলে গেল। তার কণ্ঠস্বরটা ক্রমে মিলিয়ে গেল দূরে। যতদূর পারল সে কণ্ঠস্বর শুনতে লাগল ফাঁতিনে। কণ্ঠস্বর আর শুনতে না পাওয়ার ফলে তার মুখটা কালো হয়ে উঠল। সে বলল, ডাক্তারটা কী নিষ্ঠুর! একবার মেয়েটাকে দেখতে দিল না আমায়। ওর মুখটা দেখলেই নিষ্ঠুর মনে হয়।
কিন্তু অন্য এক বড় আশায় উদ্দীপিত হয়ে সে বালিশে মাথাটা এলিয়ে দিয়ে নিজের মনে কথা বলে যেতে লাগল। আমরা সত্যিই খুব সুখী হব। আমাদের একটা ছোটখাটো বাগান থাকবে। মঁসিয়ে ম্যাদলেন কথা দিয়েছেন, সেখানে কসেত্তে খেলা করে বেড়াবে। এতদিনে তার হয়তো অক্ষর পরিচয় হয়ে গেছে। আমি তাকে এবার থেকে বানান শেখাব। সে যখন ঘাসের উপর দিয়ে প্রজাপতি ধরে বেড়াবে আমি তখন তার পানে তাকিয়ে থাকব। এখন তার বয়স সাত। বারো বছর বয়সে তার প্রথম কমিউনিয়ন হবে। তার মাথায় থাকবে সাদা ঘোমটা।….ও সিস্টার, আমি কত স্বার্থপর! আমি আমার মেয়ের কমিউনিয়নের কথা ভাবছি।
এই বলে হাসতে লাগল সে।
ম্যাদলেন এবার ফাঁতিনের হাতটা ছেড়ে দিল। অতল চিন্তার গভীরে ডুব দিয়ে ফাঁতিনের কথা শুনতে শুনতে তার মনে হচ্ছিল সে যেন কোনও বৃক্ষশাখায় প্রবাহিত বনমর্মরের ধ্বনি শুনছে।
কিন্তু কথা বলতে বলতে সহসা থেমে গেল ফাঁতিনে। সে থেমে যেতেই তার পানে তাকাল ম্যাদলেন। ফাঁতিনের চোখমুখ কেমন যেন ভয়াবহ হয়ে উঠল। সে কনুই-এর উপর ভর দিয়ে বসে ফ্যাকাশে মুখে ভয়ে চোখদুটো বিস্ফারিত করে ঘরের প্রান্তে তাকিয়ে কী দেখছিল।
ম্যাদলেন ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, কী হল ফাঁতিনে? কী ব্যাপার?
ফাঁতিনে কোনও কথা বলল না। ম্যালেনের হাতটা ধরে দরজার কাছে কী দেখাল।
মুখ ঘুরিয়ে ম্যাদলেন দেখল জেভার্ত দাঁড়িয়ে।
.
৩
সত্যিই তাই।
সেদিন রাতে সাড়ে বারোটা বাজতেই ম্যাদলেন অ্যারাসের কোর্ট ছেড়ে হোটেলে চলে গেল। কারণ মন্ত্রিউলগামী ডাকগাড়িতে একটা সিট সংরক্ষণ করে রেখেছিল। সেই গাড়িতেই সে ফিরে যাবে। মন্ত্রিউল-সুর-মেরে পৌঁছেই সে প্রথমে লাফিত্তেকে লেখা চিঠিটা পাঠিয়ে দেবে। তার পর সে হাসপাতালে ফাঁতিনেকে দেখতে যাবে।
এদিকে ম্যাদলেন কোর্ট-ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে সরকারপক্ষের উকিল উঠে দাঁড়িয়ে মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর মেয়রের এই হঠকারিতার সমালোচনা করে বলল, উনি হঠাৎ কী করে ধরে নিলেন শ্যাম্পম্যাথিউ’র জায়গায় উনিই কারাদণ্ড ভোগ করবেন এবং তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে অবশ্য উনিই যে জাঁ ভলজাঁ সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তবে আরও অনেক কিছু প্রমাণ করার আছে।
কিন্তু বিচারপতি ও জুরিরা একমত হতে পারলেন না সরকারপক্ষের উকিলের সঙ্গে।
আসামিপক্ষের উকিল বলল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন যে প্রমাণ দিয়ে গেছেন তাতে শ্যাম্পম্যাথিউ-এর বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ খণ্ডিত হয়ে গেছে। সুতরাং তাকে মুক্তি না দেওয়ার কোনও কারণ থাকতে পারে না। বিচারপতি তার কথা সমর্থন করলেন। ফলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই মুক্তি পেল শ্যাম্পম্যাথিউ। যদি সে জাঁ ভলজাঁ না হয় তা হলে কে সেই ভলজাঁ? তা হলে ম্যাদলেনই হবে সেই জাঁ ভলজাঁ।
কোর্টের কাজ সেদিনকার মতো বন্ধ করে বিচারপতি তার খাস কামরায় সরকারপক্ষের উকিলকে নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন। মন্ত্রিউলের মেয়রকে। অবিলম্বে গ্রেপ্তার করার ব্যাপারে তারা দু জনেই একমত হলেন। বিচারপতি নিজের হাতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা লিখলেন। আইন তার নিজের পথে চলবে। বিচারপতি একজন বুদ্ধিমান, যুক্তিপ্রবণ ও সহৃদয় ব্যক্তি হলেও আইন ও ন্যায়বিচারের দিক থেকে তিনি ছিলেন কঠোর প্রকৃতির এবং আপোষহীন রাজতন্ত্রী। মেয়র ম্যাদলেন যখন ম্রাটের চেলস-এ অবতরণের কথা বলার সময় বোনাপার্ট না বলে সম্রাট বলে তখন তিনি তা শুনে ব্যথিত হন।
তিনি সঙ্গে সঙ্গে ম্যাদলেনকে গ্রেপ্তার করার জন্য এক পরোয়ানা লিখে এক বিশেষ। দূতকে সে পরোয়ানা দিয়ে মন্ত্রিউলে পাঠিয়ে দেন, যাতে ইন্সপেক্টর জেতার্ত ম্যাদলেনকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে পারে।
জেভার্ত অ্যারাসে সাক্ষ্য দিয়েই মন্ত্রিউলে চলে আসে। সে সকালে ঘুম থেকে উঠেই। পরোয়ানা পায়। দূত ছিল একজন অভিজ্ঞ পুলিশ অফিসার। সে অ্যারাসের কোর্টে যা যা গতকাল সন্ধ্যায় ঘটে তা জেভাৰ্তকে বলে। জেভার্তের প্রতি বিচারপতির নির্দেশ ছিল, মন্ত্রিউলের মেয়র ম্যাদলেনকে জেল-ফেরত কয়েদি জাঁ ভলজাঁ হিসেবে শনাক্ত করা হয়। জেভার্ত যেন তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হেফাজতে রাখে।
