এক দুরারোগ্য রোগ তার দেহটাকে ভেতরে ভেতরে জীর্ণ করে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছে তাকে। তাকে দেখে শুধু এই কথাই মনে হবে যে সে মরছে না, ঊর্ধ্বে উক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে তার প্রাণের পাখিটা।
যখন আমরা কোনও ফুল তুলতে যাই তখন সে ফুলের বৃন্তটা কেঁপে ওঠে। দেখে মনে হয় একই সঙ্গে আত্মদানে সংকুচিত এবং আগ্রহান্বিত হচ্ছে সে বৃন্ত। তেমনি মৃত্যুর রহস্যময় হাতটা যখন দেহের বৃন্ত থেকে আত্মাটাকে ছিন্ন করে নিতে আসে তখন আমাদের দেহটা কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে এমনি করে।
ফাঁতিনের বিছানার পাশে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল ম্যাদলেন। একবার ফাঁতিনের দিকে আর একবার তার মাথার উপর ক্রশটার দিকে তাকাতে লাগল সে। আজ হতে দু মাস আগে প্রথম যেদিন সে তাকে দেখতে আসে সেদিনও সে এমনি করে ক্ৰশটাকে দেখেছিল। সেদিনও এমনি করে ঘুমিয়েছিল ফাঁতিনে। আজ ফাঁতিনের চুলটা ধূসর আর তার চুলটা সাদা হয়ে গেছে একেবারে।
সিস্টার ম্যালেনের সঙ্গে ঘরে ঢোকেনি। ম্যাদলেন তার ঠোঁটে একটা আঙুল দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরে যেন অন্য কোনও লোক আছে এবং তাকে চুপ করতে বলছে। এমন সময় চোখ খুলল ফাঁতিনে। চোখ মেলে তাকাল সে। সে হাসিমুখে শান্তভাবে বলল, কসেত্তে কোথায়?
.
২
বিস্ময় বা আনন্দের আবেগ ছিল না তার কণ্ঠে। সে কোনও অঙ্গভঙ্গি করল না। সে নিজেই ছিল যেন আনন্দের এক প্রতিমূর্তি। এমন এক নিরুদ্বেগ নিশ্চয়তা আর আশ্বাসের সঙ্গে এই প্রশ্নটা উচ্চারিত হল তার কণ্ঠে যে তা শুনে অবাক হয়ে গেল ম্যাদলেন।
ফাঁতিনে বলতে লাগল, আমি জানতাম আপনি এসে গেছেন। আমি ঘুমের মধ্যেও আপনাকে দেখছিলাম, আমি সারারাত ধরে আপনাকে দেখেছি। মনে হচ্ছিল আপনি যেন এক জ্যোতির মূর্তি এবং কত দেবদূত আপনাকে ঘিরে ছিল।
দেয়ালের উপর ঝোলানো ক্রশটার পানে তাকিয়ে রইল ম্যাদলেন।
ফাঁতিনে বলল, কসেত্তে কোথায়? তাকে কেন আমার বিছানায় বসিয়ে দিলেন না? তা। হলে আমি জেগে উঠেই তাকে দেখতে পেতাম।
ম্যাদলেন অস্পষ্ট স্বরে কী বলল তা সে নিজেই বুঝতে পারল না। এমন সময় ডাক্তার এসে ঘরে ঢুকল। তাকে ডাকা হয়েছিল। ম্যালেনের মনে হল ডাক্তার যেন তাকে উদ্ধার করতে এসেছে।
ডাক্তার বলল, তুমি শান্ত হও বাছা। তোমার মেয়ে এসে গেছে।
ফাঁতিনের চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল এবং সেই উজ্জ্বলতা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল তার সারা মুখখানায়। আবেগের সঙ্গে সে তার দুটো হাত দিয়ে কী একটা জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল।
সে বলল, কেউ তাকে ঘরে নিয়ে আসবে না?
সে ভাবছিল কসেত্তে যেন তখনও কোলের সেই ছোট্ট শিশুটি আছে।
ডাক্তার বলল, এখন নয়। এখনও তোমার গায়ে জ্বর আছে। কোনও রকম উত্তেজনা ক্ষতিকর হবে তোমার পক্ষে। আগে সেরে ওঠ।
ফাঁতিনে বলল, কিন্তু আমি এখন ভালো হয়ে গেছি। আমি ভালো আছি। আপনি এত বোকা হলেন কী করে? আমি আমার মেয়েকে দেখতে চাই।
ডাক্তার বলল, কত তাড়াতাড়ি তুমি উত্তেজিত হয়ে পড়ছ। এ অবস্থায় তাকে আমি আনতে পারি না। তাকে শুধু দেখলেই হবে না। তার জন্যই তোমাকে বাঁচতে হবে। তুমি একটু শান্ত হলেই তাকে নিয়ে আসব আমি নিজে।
মাথাটা নাড়িয়ে ফাঁতিনে বলল, আমাকে মাপ করবেন মঁসিয়ে ডাক্তার, আমি ভালো থাকলে এত কথা বলতাম না। কিন্তু এখন কী বলছি ভুল হয়ে যাচ্ছে; মনে রাখতে পারছি না। অবশ্য আমি বুঝি আপনারা আমাকে উত্তেজিত হতে দিতে চান না। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি, আমার মেয়েকে দেখে আমি উত্তেজিত হব না। আমি তার সঙ্গে খুব আস্তে কথা বলব। আমি সারারাত ধরে তার হাসি-হাসি উজ্জ্বল মুখখানা দেখেছি। এখন আর আমার কোনও রোগ নেই। ঠিক আছে, আমি চুপ করে শান্ত হয়ে থাকব। তা হলে ওরা আমার মেয়েকে নিয়ে আসবে।
ফাঁতিনের বিছানার পাশেই একটা চেয়ারে বসে ছিল ম্যাদলেন। ফাঁতিনে জোর করে নিজেকে সামলে নিয়ে চুপ করে রইল, যাতে ওরা তার মেয়েকে নিয়ে আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সংযত করতে পারল না। একসঙ্গে পরপর অনেকগুলো প্রশ্ন করে বসল ম্যাদলেনকে।
সে বলল, আপনার অসীম দয়া মঁসিয়ে মেয়র। যেতে কোনও কষ্ট হয়নি তো? আমার মেয়ে কেমন আছে? আসতে তার খুব কষ্ট হয়নি তো? সে হয়তো এখন আমাকে চিনতে পারবে না। এখন হয়তো ভুলে গেছে। কতদিন আগে দেখেছে। শিশুরা পাখির মতো ক্ষীণ স্মৃতিশক্তিসম্পন্ন। তার পোশাক-আশাক ঠিক ছিল তো? থেনার্দিয়েররা তাকে খেতে দিত? তার যত্ন নিত? আমি যখন কপর্দকহীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছিলাম থেনার্দিয়েররা। আমায় দারুণ পীড়ন করতে থাকে টাকার জন্য। যাক, এখন সব কিছু মিটে গেছে। আমি এখন সুখী। মঁসিয়ে মেয়র, কসেত্তে দেখতে সুন্দরী তো? তাকে আপনি একবার আনতে পারেন না? আমার জন্য এইটুকু অন্তত করুন।
ফাঁতিনের একটি হাত টেনে নিয়ে ম্যাদলেন বলল, কসেত্তে সত্যিই সুন্দরী। সে ভালো আছে। তুমি শীঘ্রই দেখতে পাবে তাকে। তুমি কিন্তু খুব বেশি কথা বলছ। তোমার হাত দুটো চাদরের বাইরে বার করলেই কাশি হচ্ছে।
প্রায়ই কাশিতে তার কথাগুলো বাধা পাচ্ছিল। ফাঁতিনে কোনও প্রতিবাদ করল না। বুঝতে পারল তারই ভুল। বেশি কথা বলে ওদের বিশ্বাস হারাচ্ছে। তবু সে শান্তভাবে আবার বলতে লাগল, মঁতফারমেল জায়গাটা খুব সুন্দর, তাই নয় কি? গ্রীষ্মকালে সেখানে অনেক দর্শক যায়। বেনার্দিয়েররা ভালো আছে? জায়গাটার লোকবসতি ঘন নয়। ওদের হোটেলটা খুবই ছোট।
