মঁসিয়ে ম্যাদলেনই যে জাঁ ভলজাঁ তাতে কারও কোনও আর সন্দেহ ছিল না। সে সত্য এখন স্বরূপে প্রকটিত। যে কথা কয়েক মিনিট আগেও দুর্বোধ্য ছিল সকলের কাছে, ম্যালেনের সকরুণ চেহারাটাই এখন সে কথা সব প্রকাশ করে দিচ্ছে। যে মানুষটি অন্য একটি লোক তার জায়গায় বৃথা দুঃখ ভোগ করবে বলে নিজে থেকে আত্মসমর্পণ করতে এসেছে, তার মহত্ত্বের কথাটা উপস্থিত সকলে কারও কোনও সাহায্য ছাড়াই সরলভাবে বুঝতে পারল। এই সরল সত্য ঘটনাটার সামনে অন্য সব প্রশ্ন তাদের সব গুরুত্ব হারিয়ে ফেলল। এই মহান পুরুষটির প্রতি এক দুর্বার শ্রদ্ধা আর করুণার আবেগে বিগলিত হয়ে উঠেছিল যেন সকলের অন্তর।
জাঁ ভলক্স বলল, আমি আর মাননীয় আদালতকে বিরক্ত করব না। এখন যদি আমাকে গ্রেপ্তার করা না হয়, তা হলে চলে যাব আমি। আমার কাজ আছে। আদালত জানেন, আমি কে এবং কোথায় আমি যাচ্ছি। আদালত ইচ্ছা করলেই আমাকে ডেকে পাঠাতে পারেন।
ভলজাঁ এই কথা বলেই দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কেউ তাকে বাধা দিল না, হাত বাড়িয়ে কেউ তাকে ধরল না। সবাই তার যাবার জন্য পথ করে দিল। সেই মুহূর্তে সে এমন এক স্বর্গীয় জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল যা দেখে উপস্থিত জনতা তাকে শ্রদ্ধা না করে পারছিল না।
ভলজাঁ ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছিল দরজার দিকে। দরজাটা খোলাই ছিল। কাউকে খুলতে হল না। যাবার আগে একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে ভলজাঁ সরকারপক্ষের উকিলকে বলল, মঁসিয়ে, আমি আপনারই হাতে।
এরপর ঘরের সবাইকে লক্ষ্য করে সে বলল, আপনারা যারা এখানে উপস্থিত আছেন তাঁদের কাছে আমি এখন করুণার পাত্র, তাই নয় কি? যখন আমি ভাবি এ সব কাজ কেন করেছি তখন আমার মনে হয় এসব না করলেই ভালো হত।
ঘর থেকে বেরিয়ে তার পেছনের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে চলে গেল ভলজাঁ।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে জুরিরা একমত হয়ে শ্যাম্পম্যাথিউকে মুক্তি দান করল। সব অভিযোগ থেকে মুক্ত হয়ে সে বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে চলে গেল এক মুহূর্তে। কী করে কী ঘটে গেল তার কিছুই বুঝতে পারল না সে। তার মনে হল সব লোকই পাগল।
১.৮ ভোরের আলো
অষ্টম পরিচ্ছেদ
তখন ভোরের আলো সবেমাত্র ফুটে উঠছিল। সারারাত ঘুম হয়নি ফাঁতিনের। শেষরাতের দিকে এক মধুর কল্পনার বশবর্তী হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। এই সুযোগে সিস্টার সিমপ্লিস তার কাছ থেকে ওষুধের শিশি থেকে এক দাগ কুইনাইন আনার জন্য গেল। জানালা দিয়ে আসা ভোরের আলোয় ওষুধের শিশিগুলোকে খুঁটিয়ে দেখছিল সে।
সহসা মুখ ঘুরিয়ে দেখেই বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল। দেখল মঁসিয়ে ম্যাদলেন নীরবে ঘরে ঢুকছে। সে বলল, মঁসিয়ে লে মেয়র?
ম্যাদলেন নিচু গলায় বলল, সে কেমন আছে?
সিস্টার সিমপ্লিস বলল, এখন কিছুটা ভালো আছে বটে, কিন্তু তার জন্য গতকাল আমরা সব উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।
এরপর সে ম্যাদলেনকে বলল, গতকাল ফাঁতিনের অবস্থা খুবই খারাপের দিকে যায়। তার পর সে যখন বিশ্বাস করে আপনি তার মেয়েকে আনার জন্য মঁতফারমেলে গেছেন তখন সে হঠাৎ ভালো হয়ে ওঠে। মেয়র কোথায় গিয়েছিল তা জিজ্ঞাসা করতে সাহস পেল না। কিন্তু সে মেয়রের মুখের হাবভাব দেখে বুঝল মেয়র সেখানে যায়নি।
ম্যাদলেন বলল, আমি খুশি। তোমরা তার ভুল না ভেঙে ঠিকই করেছ।
সিস্টার বলল, তা হয়তো ঠিক। কিন্তু আপনি তার মেয়েকে আনেননি, এখন তাকে কী বলব?
ম্যাদলেন দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল। তার পর বলল, ঈশ্বর আমাকে পথ বলে দেবেন।
তখন দিনের আলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। সে আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল সিস্টার সিমপ্লিস, হা ভগবান! মঁসিয়ে মেয়র, কী হয়েছে আপনার? আপনার মাথার চুল সব সাদা হয়ে গেছে।
সাদা!
তার কোনও আয়না ছিল না। মৃত রোগীরা শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছে কি না সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য ডাক্তাররা একরকম ছোট আয়না ব্যবহার করত। সেই আয়নাটা নিয়ে ম্যাদলেন নিজের মাথাটা দেখল। সে অন্য কথা ভাবতে ভাবতে আনমনে বলল, তাই তো।
এক অজানিত আশঙ্কায় হিম হয়ে গেল সিস্টারের অন্তরটা।
ম্যাদলেন বলল, আমি একবার তাকে দেখতে পারি?
সিস্টার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞাসা করল, মঁসিয়ে কি তার মেয়েকে আনতে যাচ্ছেন না?
ম্যাদলেন উত্তর করল, হ্যাঁ যাব। কিন্তু দু-তিন দিন দেরি হবে।
সিস্টার বলল, তার মেয়েকে না আনা পর্যন্ত সে আপনাকে দেখতে না পেলে ভাববে আপনি এখনও ফেরেননি সেখান থেকে। তা হলে আমরা তাকে সহজেই শান্ত করতে পারব। তার পর ওর মেয়ে এসে পড়লে ও ভাববে আপনিই তাকে নিয়ে এসেছেন। তা হলে আর আমাদের মিথ্যা কথা বলতে হবে না।
ম্যাদলেন আবার ভাবতে লাগল। তার পর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল, না সিস্টার, এখনি তার সঙ্গে দেখা করতে হবে আমায়। হয়তো আমি খুব কম সময় পাব।
সিস্টার হয়তো কথাটার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে লাগল। এ কথাটা যেন সমস্ত ব্যাপারটাকে আরও রহস্যময় করে তুলল। সে মুখ নামিয়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে বলল, তা হলে সে এখন ঘুমিয়ে থাকলেও ভেতরে যেতে পারেন।
ফাঁতিনের ঘরের দরজাটা খোলা বা বন্ধ করার সময় জোর শব্দ হয়। ম্যাদলেন ঘরের ভেতর ঢুকে গিয়ে তার বিছানার মশারিটা তুলল। সে তখন ঘুমোচ্ছে। কিন্তু তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মুমূর্ষ সন্তানকে দেখে মা’র যেমন অন্তরটা বিদীর্ণ হয়ে যায় ম্যালেনেরও তাই হচ্ছিল। ফাঁতিনের মুখ ও গালের ম্লান ফ্যাকাশে ভাবটা এক শান্ত শুভ্রতায় পরিণত হয়ে উঠেছিল। তার নিষ্পাপ যৌবন জীবনের একমাত্র অবশিষ্ট সৌন্দর্য টানা টানা চোখ দুটো মুদিত থাকলেও সে চোখের পাতাগুলো অল্প অল্প কাঁপছিল। অদৃশ্য পাখা মেলে ঊর্ধ্বলোকে উড়ে চলার এক অপ্রাকৃত প্রস্তুতি হিসেবে তার গোটা অচেতন দেহটা যেন অশান্ত হয়ে উঠেছিল। এ অবস্থায় কেউ তাকে দেখে ভাবতে পারবে
