সকলেই এমনভাবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল যে কেউ একটা নিশ্বাস পর্যন্ত ছাড়ল না। সমস্ত হলঘরের মধ্যে মৃত্যুশীতল এক স্তব্ধতা বিরাজ করতে লাগল। কোনও অস্বাভাবিক বা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটলে যেমন উপস্থিত জনতাকে এক ধর্মীয় ভীতি আচ্ছন্ন করে ফেলে, কোর্টঘরের জনতারও সেই দশা হল। শুধু বিচারপতির মুখের ওপর একটা বিষাদ আর সহানুভূতির ভাব ফুটে উঠল। তিনি সরকারপক্ষের উকিল ও তার পাশের জুরিদের সঙ্গে নিচু গলায় কী বললেন। তার পর সামনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এখানে কোনও ডাক্তার আছে?
সরকারপক্ষের উকিল এবার কথা বলতে শুরু করল, জুরি মহোদয়গণ, এই আশ্চর্যজনক ঘটনা আমাদের এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করেছে, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমরা সকলেই মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর মেয়র পরম শ্রদ্ধেয় মঁসিয়ে ম্যাদলেনকে চিনি। তার নাম ও যশের সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। এখানে যদি কোনও ডাক্তার উপস্থিত থাকেন তা হলে আমি তাকে অনুরোধ করছি তিনি যেন এই ভদ্রলোককে একবার দেখে নিরাপদে বাড়ি পৌঁছে দেন।
তিনি আরও কী বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ম্যাদলেন তাঁকে থামিয়ে দিয়ে শান্ত অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলতে শুরু করে। সে যা বলেছিল তা সঙ্গে সঙ্গে লিখে নথিবদ্ধ করে রাখা হয় এবং যারা নিজের কানে সে কথা শুনেছিল তারা চল্লিশ বছর পরেও সে কথা মনে রাখে।
ম্যাদলেন বলতে থাকে, আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ মাননীয় অ্যাডভোকেট জেনারেল। কিন্তু আমি পাগল নই। আপনারা মস্ত বড় একটা ভুল করতে চলেছেন আর আমি আমার এক সাধারণ কর্তব্য পালন করছি। এই লোকটিকে অবশ্যই মুক্তি দিতে হবে। আমিই সেই হতভাগ্য কয়েদি! এখন আমি যা আপনাদের বলব সেটাই হল প্রকৃত সত্য। ঈশ্বর হচ্ছেন একমাত্র আমার সাক্ষী। এই আমি দাঁড়িয়ে আছি আপনারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারেন। আমি আমার নাম পাল্টে অনেক কিছু করেছিলাম, আমি ধনী হয়ে উঠেছিলাম, মেয়র হয়েছিলাম। আমি একজন সৎ লোক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা হবার নয়, আমার ভাগ্যে তা হয়তো নেই। অবশ্য আমার সমগ্র জীবনকাহিনী আপনাদের বলার কোনও প্রয়োজন নেই। যথাসময়ে তা জানতে পারবেন। তবে একথা সত্য যে আমি দিগনের বিশপের জিনিস আর পেতিত গার্ভের পয়সা চুরি করেছিলাম। আপনারা ঠিকই অনুমান করেছিলেন, জাঁ ভলজাঁ একজন দুর্বৃত্ত, যদিও সব দোষ তার ঠিক নয়। আমার মতো একজন সামান্য নিচুস্তরের লোক ঈশ্বরের বিধানের বিরুদ্ধ প্রতিবাদ করতে পারে না অথবা সমাজকে উপদেশ দিতে পারে না। কিন্তু যে অধঃপতনের হাত থেকে বাঁচার জন্য আমি পালাতে চেয়েছিলাম তা সত্যিই সমাজের পক্ষে কলঙ্কজনক ব্যাপার। জেলখানার অবস্থাই জেলপলাতকদের সৃষ্টি করে–এ-কথা আপনাদের অবশ্যই মনে রাখা উচিত। জেলে যাবার আগে আমি ছিলাম একটা বোকা গ্রাম্য চাষি। কিন্তু জেলখানায় গিয়েই আমার পরিবর্তন হল স্বভাবের। আমার মধ্যে কুপ্রবৃত্তি জেগে উঠল। যেন একটা ধূমায়িত কাঠ সহসা জ্বলে উঠল। পশুপ্রবৃত্তি যখন আমার আত্মাকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলেছিল তখন একটি মানুষের সততা এবং অনুকম্পা আমার আত্মাকে রক্ষা করল। কিন্তু এসব কথা আপনাদের বুঝে কোনও লাভ নেই। আমি পেতিত গার্ভের কাছ থেকে যে চল্লিশ ব্যু চুরি করেছিলাম সেই মুদ্রাটা আমি যেখানে থাকি সেই ঘরের মধ্যে এখনও দেখতে পাবেন। আমার আর কিছু বলার নেই। আপনারা শুধু আমাকে গ্রেপ্তার করুন। কিন্তু অ্যাডভোকেট জেনারেল মাথা নাড়ছেন। আপনারা হয়তো আমার কথা বিশ্বাস করছেন না, পাগল ভাবছেন। এতে আমার আরও কষ্ট হচ্ছে। একটি নির্দোষ মানুষের যেন কারাদণ্ড না হয়। এটা দুঃখের বিষয় যে জেতার্ত এখানে নেই, সে আমাকে চেনে। সাক্ষীরা বলছে, তারা আমাকে চিনতে পারছে না।
তার কণ্ঠস্বরে যে বিষাদ আর একটা প্রশান্ত ভাব ফুটে উঠেছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এবার সে সাক্ষী তিনজনের দিকে ঘুরে বলল, আমি তোমাকে চিনি ব্রিভেত। তোমার মনে আছে, তুমি একটা চেকওয়ালা জামা পরতে?
ব্রিভেত আশ্চর্য হয়ে তার মুখের দিকে চোখ দুটো বড় বড় করে তাকিয়ে রইল।
ম্যাদলেন তখন শিনেলদোকে সম্বোধন করে বলতে লাগল, আর তুমি শিনেলদো, ওরা তোমাকে নিরীশ্বর বলত। তুমি নিজেকেও তাই বলতে। তোমার বাঁ কাঁধে একটা ক্ষতের দাগ আছে। তাতে টি. ই. পি. এই তিনটে অক্ষর খোদাই করা আছে।
শিনেলদো বলল, হ্যাঁ, কথাটা সত্যি।
এবার সে কোশেপেনকে বলল, কোশেপেন, তোমার বাঁ হাতে সম্রাট যেদিন চেলস্-এ অবতরণ করেন সেই তারিখটি অর্থাৎ ১৮১৫ সালের ১ মার্চ উল্কিতে লেখা আছে, তোমার জামার আস্তিনটা গোটাও।
কোশেপেন আস্তিনটা গোটাতেই একজন পুলিশ লণ্ঠনের আলো নিয়ে দেখল সত্যিই তারিখটা তার হাতে উল্কির মধ্যে খোদাই করা আছে।
এবার মুখে ক্ষীণ একটু হাসি নিয়ে ম্যাদলেন বিচারপতির দিকে তাকাল। এক জয়ের গর্ব আর হতাশার বেদনায় ভরা সে হাসি যে দেখেছে তার অন্তর ব্যথায় মোচড় দিয়ে উঠল। ম্যাদলেন বলল, এবার বিশ্বাস হচ্ছে তো আমিই জাঁ ভলজাঁ?
কোর্টঘরের মধ্যে তখন যেন বিচারক, উকিল, পুলিশ বলে কেউ ছিল না, শুধু কতকগুলি কৌতূহলী চোখ আর ব্যথিত অন্তর ছাড়া সে ঘরে যেন আর কেউ ছিল না। কার কী কাজ তা যেন কেউ জানত না। সবাই তাদের আপন আপন কর্তব্য যেন ভুলে গিয়েছিল। সরকারপক্ষের উকিল ভুলে গিয়েছিল তাকে আসামির অভিযোগ প্রমাণিত করতে হবে। বিচারপতি রায় দেবার কথা ভুলে গিয়েছিলেন। আসামিপক্ষের উকিল আত্মপক্ষ সমর্থনের কথাও ভুলে গিয়েছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা কেউ কোনও প্রশ্ন করেনি, কেউ আইনের কাছে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেনি। যেন কোনও ভীতিপ্রদ ঘটনা উপস্থিত সকলের অন্তরাত্মাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল নিবিড়ভাবে। সেখানে উপস্থিত কেউ সে কী অনুভব করছে তা বুঝতে পারেনি, তার অনুভূতির কথা সে নিজেই ধরতে পারেনি। অকস্মাৎ এক বিরাট আলোর ছটায় সকলের চোখ যেন ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। সে আলোর মূর্তিটাকে কেউ স্থিরভাবে দেখতে পারেনি। বুঝতে পারেনি।
