ব্রিভেত বলল, হ্যাঁ মঁসিয়ে প্রেসিডেন্ট। আমিই তাকে প্রথমে চিনি এবং এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত। এ-ই হল জাঁ ভলজাঁ যে ১৭৯৬ সালে তুল’র জেলখানায় প্রবেশ করে এবং ১৮১৫ সালে মুক্তি পায়। আমি তার এক বছর পরে ছাড়া পাই। এখন তাকে বোকা বোকা দেখাচ্ছে, কিন্তু সেটা বয়সের জন্য। আগে কিন্তু তাকে বেশ চালাক দেখাত জেলখানায়। আমি তাকে ভালোভাবেই চিনি।
বিচারক বললেন, ঠিক আছে তুমি বস। আসামি দাঁড়িয়ে থাকবে।
এরপর শিনেলদোকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় আনা হল। সে ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। তুল’র জেলখানা থেকেই সাক্ষ্য দেবার জন্য তাকে আনা হয়েছে। তার পরনে ছিল লাল জামা আর মাথায় সবুজ টুপি। তার চেহারাটা ছিল বেঁটেখাটো এবং বয়স প্রায় পঞ্চাশ। তার চেহারা দেখে বোঝা যায় তার মধ্যে একটা স্নায়বিক দুর্বলতা আছে। অথচ তার দৃষ্টির মধ্যে প্রচুর ইচ্ছাশক্তির আভাস পাওয়া যায়। জেলখানার অন্যান্য কয়েদিরা তাকে ‘ঈশ্বরহীন নাস্তিক’ বলে উপহাস করত।
বিচারপতি ব্রিভেতকে যে কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছিলেন, শিনেলদোকেও সেই কথা বললেন। কারাদণ্ডের জন্য সে-ও শপথগ্রহণের অধিকার হতে বঞ্চিত। এ কথা তাকে বলা হতে সে দর্শকদের দিকে লজ্জায় তাকাল। তাকে যখন সে আসামিকে চেনে কি না জিজ্ঞাসা করা হল তখন সে জোরে হেসে উঠল। বলল, সে কি, তাকে না চিনে পারি কখনও? আমরা পাঁচ বছর ছিলাম একসঙ্গে। কী সাথি, কেমন আছ? তুমি যে একেবারে ভেঙে পড়েছ?
বিচারপতি তাকে বললেন, বস।
তার পর আনা হল কোশেপেনকে। সে-ও ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। প্রথম জীবনে লর্দে অঞ্চলের এক চাষি, পরে সে পিরেনিজে গিয়ে ডাকাতি করতে থাকে। পিরেনিজের পার্বত্য অঞ্চলে সে প্রথমে ভেড়া চরাত, তার পর ডাকাত হয়ে যায়। তার চেহারা দেখে তাকে দুর্বৃত্ত বলে মনে হয়, তবে আসামির থেকে তাকে বেশি মাথামোটা বলে মনে হচ্ছিল। প্রকৃতি যেন তার চেহারাটাকে হিংস্র পশুর মতো করে তুলেছে। হিংস্র জন্তুর পরিবর্তে সে হয়ে উঠেছে জেল-কয়েদি।
বিচারক প্রথমে তাকেও সেই একই কথা বললেন ভূমিকাস্বরূপ।
কোশেপেন তখন বলল, হ্যাঁ, এই সেই জাঁ ভলজাঁ। তার গায়ে খুব জোর ছিল বলে আমরা তাকে ‘ক্রোবার’ বলতাম।
এই তিনজন সাক্ষী এমন স্পষ্ট আর পরিষ্কারভাবে তাদের বক্তব্য জানাল যে তা শুনে দর্শকরা সকলেই আসামির ওপর রেগে গেল এবং তাদের মধ্য থেকে একটা চাপা কলগুঞ্জন ধ্বনিত হয়ে উঠল। আসামি নিজেও তাদের কথা শুনতে শুনতে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। বাদীপক্ষের মতে এই বিস্ময়ই হল তার প্রতিরক্ষার একমাত্র অস্ত্র। আসামির পাশে যেসব পুলিশ দাঁড়িয়েছিল তারা তিনজন সাক্ষীর সাক্ষ্যদান শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামির মুখে তিনটে কথা উচ্চারিত হতে শোনে। প্রথম সাক্ষীর সাক্ষ্য শেষ হলে ঠিক আছে, একটা হল। দ্বিতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যশেষে সে আরও জোরে বলে ওঠে ‘চমৎকার। আর তৃতীয় সাক্ষীর সাক্ষ্যশেষে বলে, ‘বিখ্যাত।
বিচারক এবার তাকালেন আসামির দিকে। তিনি বললেন, কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান হে আসামি, এইসব সাক্ষ্যের কথা তুমি শুনেছ। তোমার কিছু বলার আছে?
আসামি বলল, আমি শুধু বলছি এটা বিখ্যাত।
এ কথা শুনে দর্শকরা একযোগে হাসিতে ফেটে পড়ল। জুরিরাও সে হাসিতে যোগ দিলেন। আসামির আর কোনও আশা নেই।
বিচারপতি ঘোষককে সবাইকে চুপ করতে বলার জন্য আদেশ দিলেন। বললেন, আমি এবার রায় দেব।
এমন সময় পেছন থেকে এক কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
সেই কণ্ঠস্বর বলল, ব্রিভেত, শিনেলদো ও কোশেপেন, আমার দিকে একবার তাকাও তো।
এই কণ্ঠস্বরের দিকে সকলের দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। সেই কণ্ঠস্বর একই সঙ্গে এমনই বিষাদময় ও সকরুণ এবং ভয়ঙ্কর যে সে কণ্ঠস্বর শোনার সঙ্গে সঙ্গে সকলের অন্তর হিমশীতল হয়ে গেল। বিচারপতির পেছনে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সিটে বসে থাকা এক ভদ্রলোক এবার উঠে দাঁড়াল। সে ধীরে ধীরে কোর্টঘরের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বিচারপতি, সরকারপক্ষের উকিল, জুরিদের অন্যতম মঁসিয়ে বামাতাবয় ও আরও কুড়িজন চিনতে পেরে একবাক্যে বলে উঠল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন!
.
১১
হ্যাঁ, সে ছিল সত্যিই মঁসিয়ে ম্যাদলেন। কেরানিদের টেবিলের উপর জ্বলতে থাকা বাতির আলোটা তার মুখের উপর পড়ল। তার হাতে টুপিটা ধরা ছিল। তার পোশাকটা ছিল বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। তার বড় কোটটার সব বোতামগুলো দেওয়া ছিল। তার মুখখানি ছিল স্নান এবং সে কিছুটা কাঁপছিল। তার যে চুলগুলো সে অ্যারাসে আসার সঙ্গে সঙ্গে ধূসর হয়ে যায়, সেগুলো এখন যেন একেবারে সাদা হয়ে গেছে।
তার আকস্মিক আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সকলে হতবুদ্ধি আর স্তব্ধ হয়ে যায়। তার বেদনার্ত কণ্ঠস্বর আর তার বহিরঙ্গের প্রশান্ত ভাবের মধ্যে এমন একটা বৈপরীত্য। ছিল যে সে-ই একথা বলেছে তা বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না। বিচারপতি বা সরকারপক্ষের। উকিল কোনও কথা বলার আগে অথবা পুলিশরা নড়াচড়ার আগেই ম্যাদলেন সাক্ষী তিনজনের সামনে এগিয়ে গিয়ে বলল, তোমরা আমাকে চিনতে পারছ না?
সাক্ষীরা তার দিকে চরম বিস্ময়ের সঙ্গে তাকিয়ে নীরবে মাথা নাড়ল। কোশেপেন সামরিক কায়দায় অভিবাদন জানাল তাকে। ম্যাদলেন এবার জুরিদের দিকে মুখ তুলে বলল, জুরি মহোদয়গণ, আপনারা আসামিকে ছেড়ে দিন। আমি মহামান্য আদালতের। কাছে প্রার্থনা করছি, আমাকে গ্রেপ্তার করার হুকুম দিন। আপনারা যাকে খুঁজছেন আমিই হচ্ছি সেই লোক। আমিই হচ্ছি জাঁ ভলজাঁ।
