প্রথমত কথাটা বলে থেমে গেল শ্যাম্পম্যাথিউ। সে তার টুপি আর ছাদের কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেল।
সরকারপক্ষের উকিল তখন কড়াভাবে বলল, শোন, তুমি প্রশ্নের উত্তর দিতে চাইছ না এবং এই না চাওয়ার জন্যই শাস্তি হবে তোমার। এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে তুমি শ্যাম্পম্যাথিউ নও, তুমিই জেলফেরত কয়েদি জাঁ ভলজাঁ, একদিন যার নাম ছিল জাঁ ম্যাথিউ। তোমার জন্ম হয় ফেবারোলে, কাঠ কাটার কাজ করতে। তুমিই পিয়েরনের বাগান থেকে আপেল চুরি করো। জুরিরা এই সিদ্ধান্তে এখন উপনীত।
আসামি এতক্ষণ বসে ছিল। সে এবার হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, তোমরা হচ্ছ দুষ্ট প্রকৃতির। আমি তখন এই কথাটাই বলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু ভাষাটা খুঁজে পাইনি। আমার তখন রোজ খাওয়া জুটত না। আমি পায়ে হেঁটে এইলি থেকে চলে যাচ্ছিলাম। তখন ওই অঞ্চলটা খালের জলে ডুবে যায়। চারদিকে শুধু জল আর কাদা। পথ হাঁটতে হাঁটতে পথের উপর আপেল ফল সমেত একটা গাছের ডাল পড়ে থাকতে দেখে আমি তা কুড়িয়ে নিই। আমি কারও কোনও ক্ষতি করতে চাইনি। অথচ এই জন্য আমাকে তিন মাস জেল খাটতে হয়। আর এই জন্যই তোমরা সকলে আমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করে আমাকে তোমাদের প্রশ্নের জবাব দিতে বাধ্য করছ আর আমার পাশের এইসব পুলিশরা আমাকে তো দিয়ে বলছে, উত্তর দাও। কিন্তু আমি জানি না, কিভাবে তোমাদের কথার জবাব দেব। আমি লেখাপড়া শিখিনি। আমি গরিব ঘরের ছেলে। তাই তোমরা আমার কথা বুঝতে পারছ না। আমি কখনও কিছু চুরি করিনি, শুধু পথ থেকে কুড়িয়ে নিয়েছিলাম। তোমরা জাঁ ভলজাঁর কথা বলছ, জাঁ ম্যাথিউ’র কথা বলছ। কিন্তু আমি তাদের কাউকেই চিনি না। ওরা হচ্ছে গাঁয়ের লোক আর আমি প্যারিসে বাজারের কাছে মঁসিয়ে বালুপের দোকানে কাজ করতাম। তোমরা চালাকি করে আমার জন্মস্থানের কথা বলেছ। কিন্তু আমি জানি না আমার কোথায় জন্ম হয়েছে। আমার বাবা-মা মনে হয় ভবঘুরে ছিল। আমি যখন ছোট ছিলাম তারা আমাকে শ্যাম্পম্যাথিউ বলে ডাকত। এখন আমি বুড়ো হয়ে গেছি। তোমরা যা খুশি বলতে পার। আমি অভানে গেছি, ফেবারোলেও গেছি। কিন্তু কয়েদি ছাড়া আর কোনও লোককে কি কোথাও যেতে নেই? আমি কখনও কিছু চুরি করিনি। তোমরা প্রশ্ন করে করে আমাকে বিরক্ত করে তুলছ।
সরকারপক্ষের উকিল এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে বিচারপতির দিকে তাকিয়ে কথা বলতে শুরু করল। মঁসিয়ে প্রেসিডেন্ট, আসামি সুচতুরভাবে সব অভিযোগ। অস্বীকার করে নিজেকে যতই বোকা বলে চালাতে চাক না কেন সে তাতে সফল হবে। আমি ব্রিভেত, কোশেপেন, শিনেলদো আর ইন্সপেক্টর জের্তের সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য মহামান্য আদালতের অনুমতি প্রার্থনা করছি। তারা যাতে এই আসামিই যে ভূতপূর্ব কয়েদি জাঁ ভলজাঁ তা তাদের সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত করতে পারে।
বিচারপতি বললেন, আমি আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই ইন্সপেক্টার জেভাৰ্ত এখন আদালতে নেই। তিনি আদালত, সরকারপক্ষ ও আসামিপক্ষের উকিলদের অনুমতি নিয়ে তাঁর কাজের জায়গায় মন্ত্রিউল চলে গেছেন।
সরকারপক্ষের উকিল তখন বলল, ইন্সপেক্টারের অনুপস্থিতিতে তিনি একটু আগে যে বিবৃতি দিয়ে গেছেন আমি জুরিদের তা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। জেভার্ত একজন কর্তব্যপরায়ণ ও সম্মানিত ব্যক্তি। জেভার্ত যে বিবৃতি দিয়েছেন তা হল এইরূপ : ‘আসামি তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহ খণ্ডন করতে গিয়ে যেসব বাস্তব তথ্যাদির কথা বলেছে তার ওপর নির্ভর করার কোনও প্রয়োজন অনুভব করি না আমি। আমি ভালোভাবে তাকে চিনি। সে শ্যাম্পম্যাথিউ নয়, সে হচ্ছে বিপজ্জনক জেলফেরত কয়েদি জাঁ ভলজাঁ। কারাদণ্ড শেষ হলে সে জেল থেকে মুক্তি পায় যে মুক্তি সে আসলে পেতে। চায়নি। চুরি-ডাকাতি ও বলপ্রয়োগের অপরাধে উনিশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ। করতে হয় তাকে। সে পাঁচ-ছ বার জেল থেকে পালাবার চেষ্টা করে। পেতিত গার্ভের পয়সা ও পিয়েরনের ফলচুরি ছাড়াও দিগনের বিশপের ঘরে চুরি করে বলে আমার ধারণা। আমি তুলঁ’র জেলখানায় চাকরি করার সময় তাকে প্রায়ই দেখেছি এবং আমি আবার বলছি আমি তাকে চিনি।
এই জোরালো স্বীকারোক্তি দর্শক ও জুরিদের মনের ওপর বেশই রেখাপাত করে। জের্তের অনুপস্থিতির জন্য সরকারপক্ষের উকিল সাক্ষীদের ডেকে ডেকে আবার জেরা
করার দাবি জানাল। বিচারপতি আদেশ দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একজন পুলিশের সাক্ষী বিভেত সাক্ষীর কাঠগড়ায় এসে দাঁড়াল।
ব্রিভেত কালো পোশাক পরেছিল। তার গায়ে ছিল জেলখানার কয়েদিদের নীল আলখাল্লা। তার বয়স প্রায় ষাট। তাকে দেখে মনে হয় সে বেশ বাস্তববুদ্ধিসম্পন্ন অথচ দুষ্ট প্রকৃতির। জেলকর্তৃপক্ষ তাকে বিশ্বাস করত এবং বলত, লোকটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। তার যে ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মে মতিগতি আছে, সে কথা জেলপ্রহরী কর্তৃপক্ষকে বলে।
বিচারপতি বললেন, ব্রিভেত, তুমি এক লজ্জাজনক কারাদণ্ডে দণ্ডিত, যার জন্য তুমি শপথ করে কিছু বলতে পারবে না।
ব্রিভেত মাথা নত করল। বিচারপতি বললেন, যাই হোক, কোনও মানুষ আইনের বিচারে যতই অধঃপতিত হোক না কেন, ঈশ্বরের কৃপায় তার মধ্যে কিছুটা সততা এবং ন্যায়পরায়ণতা থাকে। আমার আবেদন তোমার সেই সততা আর ন্যায়পরায়ণতার কাছে। যদি তা অবশিষ্ট থাকে তোমার মধ্যে, এবং আমার বিশ্বাস তা আছে, তা হলে উত্তর দেবার আগে তা ভালো করে ভেবে দেখ। তোমাকে ভেবে দেখতে হবে, একদিকে। তোমার প্রদত্ত উত্তর একটি লোকের জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে, আবার অন্যদিকে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করতে পারে। তুমি হয়তো ভুলও করতে পার। আসামি এখনি উঠে দাঁড়াবে… ব্ৰিভেত, কাঠগড়ায় দাঁড়ানো লোকটিকে ভালো করে দেখ, এবং তোমার বিবেক-বুদ্ধি সহকারে মহামান্য আদালতকে বল এই ব্যক্তি তোমার জেলখানার পুরনো সাথি কি না।
