আসামি ভয়ে স্তম্ভিত হয়ে হাঁ করে সব কিছু দেখল। সরকারি পক্ষের উকিলের বক্তৃতা শুনে আশ্চর্য হয়ে যায় সে। কোনও মানুষ এত তাড়াতাড়ি এমনভাবে বক্তৃতা দিয়ে যেতে পারে সে বিষয়ে তার কোনও ধারণাই ছিল না। সরকারপক্ষের উকিল যখন আবেগের সঙ্গে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিল আসামি তখন শুধু তার ঘাড়টা নেড়ে সব সময় এক বিষাদঘন প্রতিবাদ জানায়। দর্শকদের মধ্যে অনেকে শুনতে পায় আসামি মাঝে মাঝে শুধু একটা কথাই বলে, বঁসিয়ে বালুপকে জিজ্ঞাসা না করার জন্যই এইরকম হয়েছে।
সরকারপক্ষের উকিল আসামির ক্রুদ্ধ হাবভাবের প্রতি বিচারক ও জুরিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সে বলে, এর থেকে বোঝা যায় আসামি মোটেই বোকা নয়। এ কাজ তার সুপরিকল্পিত এবং সে খুব ধূর্ত। সে চালাকি করে আইনের বিচারকে এড়িয়ে যেতে চায়। তার এই ভাব এবং অঙ্গভঙ্গি তার বিকৃত প্রবৃত্তি এবং স্বভাবের ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করে। পেতিত গার্ভের মামলাটা বাদ দিলেও আইন অনুযায়ী এই আসামির যোগ্য শাস্তি হল যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।
আসামিপক্ষের উকিল তার শেষ কথাটা জানাবার জন্য একবার উঠে দাঁড়াল। কিন্তু প্রথমেই সরকারপক্ষের উকিলের বাগ্মিতার প্রশংসা করল। তার যুক্তি তেমন জোরালো হল না। আসল কথা কিছু বলতে পারল না। কারণ সে বুঝল তার পায়ের তলার মাটি আগেই সরে গেছে।
.
১০
এবার মামলাটার নিষ্পত্তি করতে হবে। আসামিকে উঠে দাঁড়াতে বলে বিচারপতি তাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার আত্মপক্ষ সমর্থনে কিছু বলার আছে?
আসামি উঠে দাঁড়িয়ে টুপিটা মাথা থেকে খুলে হাতে নিয়ে এমন একটা ভাব দেখাল যাতে মনে হবে সে শুনতে পায়নি। বিচারপতি আবার সেই একই প্রশ্ন করলেন।
এবার লোকটা শুনতে পেয়েছে মনে হল। এমনভাবে সে তাকাতে লাগল যাতে মনে হচ্ছিল সে যেন এখনি ঘুম থেকে জেগে উঠেছে। সে দর্শক, জুরি, পুলিশ, অ্যাটর্নি, উকিল সকলের পানে তাকিয়ে ছিল। অবশেষে সে সরকারপক্ষের উকিলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে কথা বলতে শুরু করল। উত্তপ্ত অসংলগ্ন অজস্র কথার বন্যা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের মতো বেরিয়ে আসতে লাগল তার মুখ থেকে।
সে বলল, আমি শুধু এইটুকুই বলতে চাই। আমি প্যারিসে মঁসিয়ে বালুপের অধীনে চাকা মেরামতের কাজ করতাম। খুবই কষ্টের কাজ। কারণ জানেন তো, চাকা মেরামঁতকারীকে এখানে-সেখানে ঘুরে ঘুরে বা একটা ফাঁকা জায়গায় চালার তলায় কাজ করতে হয়। তার কাজের কোনও নির্দিষ্ট ঘর নেই। শীতে তাদের গরম জামাকাপড়ও নেই। তাকে এমন সব ধাতু নিয়ে কাজ করতে হয় যেগুলোর উপর বরফ পড়ে এবং তা করতে গিয়ে দেহে রোগ ধরে। শরীরটা ক্ষয় হয়ে যায় ধীরে ধীরে। অকালে তাকে বুড়ো হয়ে যেতে হয়। চল্লিশেই তার জীবনীশক্তি স্তিমিত হয়ে আসে। আমার বয়স ছিল তিপ্পান্ন এবং আমাকে সবাই বুড়ো বলে উপহাস করত। সারাদিন খেটে আমি পেতাম মাত্র তিরিশ স্যু, আমি বুড়ো বলে আসল বেতন থেকে ধোপার কাজ করেও অল্প কিছু রোজগার করত। এইভাবে আমাদের দু জনের চলে যেত কোনওরকমে। তার কাজটাও বেশ কঠিন ছিল। জলের টবের উপর ঝুঁকে দাঁড়িয়ে কোমর পর্যন্ত ভিজিয়ে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাস আর বৃষ্টি সহ্য করে সারাদিন ধরে কাপড় কেচে যেতে হত তাকে। শীতে জমে গেলেও তাকে কাপড় কেচে যেতে হবে, তা না হলে খরিদ্দার থাকবে না, অনেকেরই বেশি জামাকাপড় নেই। সে আবার এলফাত-রোগ নামে একটা লড্রিতেও কাজ করে। সে কাজ ঘরের মধ্যে হলেও গরম জলের ভাপ চোখে লাগে অনবরত। সে রোজ সন্ধে সাতটায় বাড়ি ফিরে ক্লান্তিতে শুয়ে পড়ত। তার স্বামী তাকে মারত। এখন আর সে নেই। মরে গিয়ে সে যেন বেঁচেছে। কারণ আমরা মোটেই সুখে ছিলাম না। অথচ মেয়েটা খুব ভালো ছিল। এই ছিল আমার জীবন। আমি সব সত্য কথা বলছি। প্যারিস শহরে কে কার খবর রাখে? শ্যাম্পম্যাথিউ কথা কেই-বা শুনেছে? তবে মঁসিয়ে বালুপকে জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন। আর আমি কী-ই বা বলব।
এবার সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে মোটা কর্কশ গলায় এক ক্রুদ্ধ বিক্ষুব্ধ সরলতার সঙ্গে সব কথা বলে শেষ করেছে; বলতে বলতে একবার সে দর্শকদের মধ্যে একজনের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়েছিল। কথা বলতে বলতে সে প্রায়ই তার হাতটা নাড়ছিল ঠিক যেমন কোনও মানুষ কাঠ কাটার সময় তার হাত দুটো সঞ্চালিত করে। তার কথা শেষ হয়ে গেলে সমবেত জনতা হেসে ওঠে। তাদের হাসির অর্থ বুঝতে না পেরে সে-ও হেসে ওঠে।
এবার বিচারপতি সব কিছু শুনে কথা বলতে শুরু করলেন। তিনি প্রথমে জুরিদের স্মরণ করিয়ে দিলেন, একসময় প্যারিসে মঁসিয়ে বালুপের চাকা মেরামতের একটা দোকান ছিল। তাকে সাক্ষী হিসেবে আনার জন্য তার খোঁজ করা হয়। কিন্তু তার দোকান উঠে যাওয়ায় তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এরপর বিচারপতি আসামির দিকে তাকিয়ে বললেন, মন দিয়ে শোেন। তুমি তোমার অবস্থাটা ভালো করে ভেবে বুঝে দেখ। তুমি এখন এক গভীর সন্দেহের বস্তু। তোমার স্বার্থেই আমি তোমাকে অনুরোধ করছি তুমি কতকগুলি প্রশ্নের সঠিক জবাব দেবে। তুমি কি পিয়েরনের বাগানের পাঁচিলে উঠে গাছের ডাল ভেঙে আপেল চুরি করেছিলে না করনি? অর্থাৎ অবৈধ অনধিকার প্রবেশের মাধ্যমে চুরির অপরাধে তুমি কি অপরাধী নও? দ্বিতীয়ত তুমি কি জেলফেরত কয়েদি জাঁ ভলজাঁ, নাকি তা নও?
