সাক্ষীরা সাক্ষ্য দেবার সময় সকলেই একমত হয় তার পরিচয় সম্বন্ধে। বিচারের সময় আগের কিছু ঘটনার কথা জানা যায়। সরকারপক্ষের উকিল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করে বলে, আসামি শুধু এক পাকা চোরই নয়, সে শুধু ফল চুরিই করেনি, সে এক ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক জেলফেরত কয়েদি। সে অনেকবার জেল ভেঙে পালিয়ে যায়। তার নাম জাঁ ভলজাঁ, এক দাগি অপরাধী, পুলিশ যাকে অনেকদিন ধরে খুঁজছে। তুল’র জেল থেকে ছাড়া পাবার পরই সে বড় রাস্তায় পেতিত গার্ভে নামে একটি ছেলের কাছ থেকে বলপ্রয়োগ করে পয়সা চুরি করে। এই অপরাধের জন্য অপরাধবিধির ৩৮৩ ধারামতে তার বৈধ পরিচয় প্রমাণিত হলে তাকে আমরা শাস্তি দিতে পারব। সে আরও একটা চুরি করেছে। এই শেষের চুরির জন্য আগে তাকে শাস্তি দিন। আগের চুরির বিচার পরে হবে। অভিযোগের বহর আর সাক্ষীদের কথা শুনে আসামি শুধু যারপরনাই বিস্মিত হয়। অঙ্গভঙ্গির দ্বারা সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তাকে যেসব প্রশ্ন করা হয় সেগুলোর সে বোকার মতো উত্তর দেয়। তার মূল মনোভাব হল সব কিছুকে অস্বীকার করা। এতগুলো বুদ্ধিমান শিক্ষিত লোকের আক্রমণের সামনে সে ছিল অসহায় এবং নির্বোধ। যে সমাজের কবলে সে ঘটনাক্রমে পড়ে গেছে তার কাছে সে বিদেশি। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগই প্রমাণিত হতে চলেছে। তার বিরুদ্ধে মামলাটা জোরালো হয়ে উঠছে ক্রমশ এবং বিচারে তার কারাদণ্ডের সম্ভাবনাও বেড়ে চলেছে ক্রমশ। তার থেকে দর্শকরা যেন বেশি শঙ্কিত হয়ে উঠছে। এমনকি তার পরিচয় সাব্যস্ত হলে পেতিত গার্ভের পয়সা চুরির জন্য তার মৃত্যুদণ্ড হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু কী ধরনের লোক সে? তার এই আপাত ঔদাসীন্যের কারণ কী? সে কি খুব বেশি বোঝে, না কিছুই বোঝে না? দর্শকদের মনে এই প্রশ্নই জাগে বারবার এবং জুরিরাও এই কথাই ভাবতে থাকে। ব্যাপারটা কেমন যেন কুৎসিত, যেন দুর্বোধ্য রহস্যে ভরা এক নাটক।
প্রচলিত রীতি অনুসারে আসামিপক্ষের উকিল জোরালো ভাষায় বক্তৃতা করলেও তা তত ফলপ্রসূ হয়নি। তিনি প্রথমে আপেল চুরির অভিযোগটার কথা তুলে তার বক্তৃতা শুরু করেন। তিনি বলেন, এই চুরির অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। সে পাঁচিল ডিঙিয়ে গাছের ডাল ভেঙে আপেল চুরি করেছে কেউ তা চাক্ষুষ দেখেনি। তার হাতে শুধু গাছের ডাল পাওয়া যায়। কিন্তু সে সেটা পথে যেতে যেতে কুড়িয়ে পায়। কিন্তু চুরির প্রমাণ কোথায়? কেউ একজন নিশ্চয় পাঁচিল ডিঙিয়ে ডাল ভেঙে আপেল চুরি করেছে। কিন্তু আমার মক্কেল শ্যাম্পম্যাথিউই যে সেই চোর তার প্রমাণ কোথায়? তার সম্বন্ধে শুধু একটা কথাই বলা যেতে পারে যে সে জেলফেরত কয়েদি, কারণ সেটা প্রমাণিত সত্য। সে আগে ফেবারোলে বাস করত। সে গাছকাটার কাজ করত এবং তার আসল নাম ছিল জাঁ ম্যাথিউ। চারজন সাক্ষী শ্যাম্পম্যাথিউকে জাঁ ভলজাঁ হিসেবে শনাক্ত করেছে। আসামির অস্বীকার ছাড়া এই শনাক্তকরণের ব্যাপারে তার পক্ষের উকিলের কিছু বলার নেই। কিন্তু সে জেলফেরত কয়েদি হলেও এর থেকে কি এই কথাই প্রমাণ হয় যে সে-ই আপেল চুরি করেছে। এটা শুধু অনুমান মাত্র।
আসলে আসামি ভুল নীতি অবলম্বন করে। সে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই অস্বীকার করে। সে শুধু আপেল চুরির ব্যাপারটাই অস্বীকার করেনি, সে যে জেলে এতদিন ছিল সে কথাও অস্বীকার করে সে। সে যদি অন্তত জেলে যাওয়ার কথাটা স্বীকার করত তা হলে বিচারপতির মন অনেকটা নরম হত এবং তার শাস্তি লঘু হত। তাকে কি এ কথাটা বলার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, নাকি সে সে-পরামর্শ মানেনি? সে ভেবেছিল সব কথা, সব অভিযোগ অস্বীকার করলে সে বেঁচে যাবে। এটা ছিল এক মস্ত ভুল এবং এর জন্য তার বুদ্ধিহীনতা আর বোকামিই দায়ী। দীর্ঘ কারাবাস এবং জেল থেকে বেরিয়ে সে ভবঘুরে জীবন যাপন করেছিল, তাতে তার সব বুদ্ধি লোপ পায়। কিন্তু এর জন্যই সে দণ্ডিত হবে? পেতিত গার্ভের ব্যাপারটা এ মামলার মধ্যে না আসায় তার উকিল ও অভিযোগের বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। সরকারপক্ষের উকিল বিচারপতি ও জুরিদের এই কথাই বোঝাল যে আসামি যদি জাঁ ভলজাঁ হয় তা হলে জেল থেকে বেরিয়ে চুরি করার জন্য তাকে শাস্তি পেতেই হবে। সরকারপক্ষের উকিল জোরালো ভাষায় স্বভাবসিদ্ধ বাগ্মিতার সঙ্গে তার যুক্তি প্রতিষ্ঠিত করে।
আসামিপক্ষের উকিলও এ কথা মেনে নেয় যে এই আসামিই জাঁ ভলজাঁ।
সরকারপক্ষের উকিল ওজস্বিনী ভাষায় আবেগের সঙ্গে বলতে থাকে, দীর্ঘ কারাদণ্ড এই আসামির জীবনে কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি। জেল থেকে বেরিয়েও সে ভবঘুরের মতো বেড়াতে বেড়াতে একের পর এক অপরাধ করে যেতে থাকে। সে প্রকাশ্য রাজপথের উপর পেতিত গার্ভে নামে একটি ছেলেকে আক্রমণ করে। অথচ চুরি, অনধিকার প্রবেশ, নাম গোপন প্রভৃতি সব অপরাধ সে অস্বীকার করে। এইসব অপরাধের সপক্ষে প্রাপ্ত প্রমাণাদি ছাড়াও চারজন সাক্ষী তাকে শনাক্ত করে। এইসব সাক্ষী হল সৎ ও নীতিপরায়ণ। পুলিশ ইন্সপেক্টর জেভার্ত আর ব্রিভেত, শিনেলদো ও কোশেপেন নামে তিনজন ভূতপূর্ব কয়েদি। কিন্তু আসামি তবু সব কিছু অস্বীকার করে। সুতরাং জুরি মহোদয়গণ ন্যায়বিচারের নামে আসামিকে যথাযোগ্য শাস্তি প্রদান করুন।
