এইভাবে পনেরো মিনিট কেটে গেল। অবশেষে গভীর বেদনায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথাটা নত করে ফিরে গেল সে। সে ধীর পায়ে আবার কোর্টঘরের দিকে হেঁটে চলল। সে পালিয়ে যাচ্ছিল। কে যেন তাকে আবার ধরে নিয়ে চলল।
কোর্টঘরে যেতেই প্রথমেই তার দরজায় পিতলের চকচকে হাতলটার ওপর নজর পড়ল। সেটা যেন তারার মতো জ্বলজ্বল করছিল। সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে চলল দরজার দিকে। পাশের ঘর থেকে কিছু লোকের চাপা গুঞ্জনধ্বনি আসছিল। কিন্তু সেসব কিছুই শুনল না সে।
হঠাৎ কী যেন ঘটে গেল। সে কিছু বুঝতে পারল না। সে দরজার হাতল ধরে দরজাটা খুলে ঘরে ঢুকে পড়ল।
.
৯
তার পেছনে দরজাটা বন্ধ করে সামনে তাকাল। সমবেত জনতার সামনে যে ঘরে অপরাধীর বিচার চলছিল সে ঘরটা বেশ প্রশস্ত আর আলোকিত। ঘরটার একপ্রান্তে একদল পোশাকপরা ম্যাজিস্ট্রেট বসে ছিল। ঘরটার মধ্যে এক একসময় অনেকগুলো মানুষের কলগুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল আর এক একসময় সবাই চুপ করে যাওয়ায় ঘরটা স্তব্ধ। হয়ে উঠছিল। দেয়ালে কতকগুলি বাতি ঝুলছিল আর টেবিলের উপর পিতলের বাতিদানে বাতি জ্বলছিল। আলো-ছায়ায় ভরা সমস্ত ঘরখানায় এক বিষাদময় কঠোরতা বিরাজ করছিল। মানুষের জগতে যাকে বলে আইন আর ঈশ্বরের জগতে যাকে বলে ন্যায়বিচার তার নির্মম রথচক্র যেন অত ধ্বনিতে সমস্ত ঘরখানার সব কিছুকে পিষ্ট করে চলে বেড়াচ্ছিল।
ম্যালেনের দিকে কেউ তাকাল না। সকলের দৃষ্টি তখন একদিকে নিবদ্ধ ছিল। দেয়ালের গাঁয়ে একটা বেঞ্চ পাতা ছিল। তার উপর একটা বাতি জ্বলছিল। সেই বেঞ্চের উপর একটা লোক বসে ছিল। তার দু দিকে দু জন পুলিশ তাকে পাহারা দিচ্ছিল।
এই সেই লোক।
তাকে খুঁজে নিতে হল না ম্যাদলেনকে। তার চোখ আপনা থেকে সেদিকে চলে গেল। তার বুঝতে দেরি হল না এই হল সেই আসামি। ম্যাদলেন নিজের দিকে তাকিয়ে দেখল দু জনের চেহারা একেবারে এক নয়। তবে সে যখন উনিশ বছর কারাবাসের পর এলোমেলো রুক্ষ চুল, অশান্ত দৃষ্টি আর নীল রঙের আলখাল্লা পরে দিগনের পথে ঘুরে। বেড়াত তখন তাকেও ওই লোকটার মতো দেখাত।
সে মনে মনে একটা কথা ভেবে কেঁপে উঠল। মনে মনে বলল, হে ভগবান, আসামির বয়স অন্তত ষাট হবে। তার মুখ-চোখ দেখে তাকে বোকা বোকা দেখাচ্ছিল। তার চেহারার মধ্যে একটা রুক্ষ ভাব ছিল।
ম্যাদলেন ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে অনেকে সরে গিয়ে তার জন্য পথ করে দিল। বিচারপতি তাকে দেখেই বুঝতে পারলেন এই লোকই মন্ত্রিউল শহরের মেয়র। তাকে দেখে মাতা নত করে অভ্যর্থনা জানালেন তিনি। অ্যাডভোকেট জেনারেল অফিসের কাজে কয়েকবার মন্ত্রিউল শহরে গিয়েছিলেন এর আগে। তাই তিনিও ম্যাদলেনকে দেখেই চিনতে পারলেন। তিনিও অভ্যর্থনা জানালেন।
এইসব সৌজন্য বা অভ্যর্থনায় ম্যালেনের কোনও খেয়াল ছিল না। সে হতবুদ্ধি হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছিল।
সে আগে এইসব কিছুই দেখেছে। কোর্টঘরের এই বিচারের দৃশ্য সম্বন্ধে তার অভিজ্ঞতা আছে–এই বিচারপতি, উকিল, মুহুরি, পুলিশ, কৌতূহলী জনতা আজ হতে সাতাশ বছর আগে দেখেছে সে। আজ আবার দেখছে। এগুলো আজ আর কোনও দুঃস্বপ্নে দেখা অলীক বস্তু নয়, এগুলো সব জীবন্ত সত্য। অতীতে যে ভয়ঙ্কর সত্যের অন্ধকার অতল গহ্বরটা তাকে গ্রাস করেছিল, আজ আবার সেই গহ্বরটা তার সামনে গ্রাস করতে আসছে তাকে। ভয়ে চোখ বন্ধ করল সে। তবে আত্মার গভীরে কে যেন চিৎকার করে উঠল কাতরভাবে, না না, কখনও না।
যে মর্মান্তিক ঘটনা এই অবস্থার মধ্যে ফেলেছে তাকে, সে ঘটনা তাকে যেন হতবুদ্ধি করে দিয়েছে একেবারে। তার মনে হল সে যেন পাগল হয়ে যাবে। তার মনে হল আজ হতে সাতাশ বছর আগে যে এক বিচারসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল আজকের এই বিচারসভার সঙ্গে কোনও দিক দিয়েই কোনও অমিল নেই। সেই বিচারক, উকিল, পুলিশ–সেদিনও ছিল এমনি এক সন্ধ্যা। কোনও কিছুরই পরিবর্তন হয়নি। শুধু সেদিনকার বিচারসভায় বিচারপতির মাথার উপরে কোনও ক্রস ছিল না। আজ কিন্তু বিচারপতির মাথার উপর একটা ক্রস আছে দেয়ালে। আর আজ তার জায়গায় অন্য একটা লোক দাঁড়িয়ে আছে, যাকে লোকে জাঁ ভলজাঁ বলেই জানে। সেদিন ঈশ্বরের অনুপস্থিতিতেই বিচার হয় তার।
বিচারপতির পেছনে একটা খালি চেয়ার ছিল। ম্যাদলেন বসল তার উপর। তার কেবলই ভয় হচ্ছিল একজন হয়তো তাকে লক্ষ করছে। টেবিলের উপর একরাশ ফাইল থাকায় ওপাশের লোকরা তাকে দেখতে পাচ্ছিল না। অথচ সে সব কিছু দেখতে পাচ্ছিল। ক্রমে তার বুদ্ধি ফিরে আসতে লাগল। বাস্তব অবস্থার প্রতি সচেতন হয়ে উঠল সে। সব কথাবার্তা কান পেতে শোনার চেষ্টা করতে লাগল সে।
জুরিদের মধ্যে মঁসিয়ে বামাতাবয় ছিল। ম্যাদলেন চোখ মেলে চারদিকে তাকিয়ে জেতার্তের খোঁজ করতে লাগল। কিন্তু তাকে দেখতে পেল না। সাক্ষীদের বেঞ্চির পাশে কেরানিদের টেবিল থাকায় সে ঠিক চিনতে পাচ্ছিল না। তাছাড়া ঘরের আলোর তেমন জোর ছিল না।
উপস্থিত সকলেই তার কথা মন দিয়ে শুনছিল। তিন ঘণ্টা ধরে শুনানি চলছিল। তিন ঘণ্টা ধরে সকলে একটা লোককে দেখে এসেছে। লোকটি এ অঞ্চলে সম্পূর্ণ অপরিচিত। লোকটি হয়তো একেবারে বোকা, অথবা খুব বেশি চালাক–ভয়ঙ্কর এক বিপদের শঙ্কা আর সম্ভাবনার বোঝাভারে সে মূক অসহায় এক প্রাণীর মতো নিষ্পেষিত হচ্ছে অহরহ। তার সম্বন্ধে কে কতটুকুইবা জানে?
