কিন্তু সরকারপক্ষের উকিল আর আসামিপক্ষের অ্যাটর্নির মধ্যে বিতর্ক হওয়ার জন্য মামলাটা রাত পর্যন্ত চলবে। সরকারপক্ষের উকিলের বেশ নামডাক ছিল। তিনি কোনও মামলায় হারতেন না। তিনি বেশ মার্জিত রুচির লোক ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন।
বিচারপতি যে ঘরে দরজা বন্ধ করে ছিলেন সেই ঘরের দরজায় একজন ঘোষক দাঁড়িয়ে ছিল। ম্যাদলেন তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ঘরের দরজা এখন খোলা হবে না?
ঘোষক বলল, না, ভোলা হবে না।
কোর্টের কাজ আবার শুরু হলেও ভোলা হবে না?
কোর্টের কাজ আবার শুরু হয়েছে। হলঘর ভরে গেছে। এখন ভোলা হবে না।
তার মানে একেবারেই কোনও বসার জায়গা নেই?
ঘোষক বলল, বিচারপতির পেছনে দু-একটা সিট আছে। কিন্তু সে সিট পদস্থ সরকারি কর্মচারীদের জন্য।
এই বলে সে পেছন ফিরল।
গতকাল সন্ধ্যা থেকে ম্যাদলেনের মনে যে প্রবল অন্তর্দ্বন্দ্ব চলছিল সে দ্বন্দ্বের অবসান হয়নি। তার ওপর আরও অনেক চিন্তা এসে ভিড় করল তার মনে। সে সিঁড়ির দিকে সরে গিয়ে তার বড় কোটের পকেট থেকে একটা নোটবই আর পেন্সিল বার করে লিখল, মঁসিয়ে ম্যাদলেন, মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর মেয়র। তার পর সেই কাগজটা ঘোষকের হাতে দিয়ে বলল, এইটা বিচারপতির হাতে দাও।
.
৮
ম্যাদলেন জানত না মন্ত্রিউল-সুর-মের-এর মেয়র হিসেবে সে এক বিশেষ খ্যাতিলাভ করেছে। তার নাম-যশ মন্ত্রিউল অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে উত্তরোত্তর বাড়তে বাড়তে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। সমগ্র অঞ্চলের ব্যবসা ও কাজকারবারের উন্নতিতে তার অবদান সারা মন্ত্রিউল জেলার অন্তর্গত ১৪১টা কমিউনের মধ্যে এমন কোনও কমিউন ছিল না যার অধিবাসীরা কোনওভাবে উপকৃত হয়নি তার দ্বারা। বুলোনের কাঁচের কারখানা ছাড়াও ফ্রিভেন্ত ও বুবার-সুর-কাশের সুতোর কারখানাগুলো তারই আর্থিক সাহায্যে উন্নতি করেছিল। ম্যালেনের নামটা উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধা জাগত সবার মনে। অ্যারাস, দুয়াই প্রভৃতি শহরগুলো মন্ত্রিউল শহরের সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধি দেখে ঈর্ষা অনুভব করত।
দুয়াই-এর রাজ-আদালতের কাউন্সিলার যিনি অ্যারাসের বিচারপতি হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি ম্যাদলেনের নামটার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ঘোষক যখন বিচারপতির হাতে কাগজটা দিয়ে তার কানের কাছে ঝুঁকে বলল, মেয়র মঁসিয়ে ম্যাদলেন এই মামলার শুনানি শুনতে চান, তখন বিচারপতি সঙ্গে সঙ্গে ম্যাদলেনকে নিয়ে আসতে বললেন। তিনি ম্যাদলেনের কাগজটার তলায় একটা লাইন লিখে দিলেন।
এদিকে ম্যাদলেন ঘোষকের হাতে কাগজটা দিয়ে অস্বস্তির সঙ্গে সেইখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। ঘোষক ফিরে এসে তার সামনে নত হয়ে বিনয়ের সঙ্গে বলল, দয়া করে হুজুর আমার সঙ্গে আসতে পারেন।
এই বলে সেই কাগজটা সে ম্যালেনের হাতে দিল। ম্যাদলেন দেখল তাতে লেখা আছে, বিচারপতি মঁসিয়ে ম্যাদলেনকে যথাযোগ্য সম্মান জানাচ্ছে। কাগজটা মুড়ে গুটিয়ে ঘোষকের সঙ্গে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। বিচারপতির লেখা কথাগুলো তার মুখে তিক্ত একটা জিনিস ফেলে দিয়েছে।
যে ঘরটায় ম্যাদলেনকে রেখে ঘোষক চলে গেল সে ঘরটার মাঝখানে সবুজ কাপড়পাতা একটা টেবিলের উপর দুটো বাতি জ্বলছিল। ম্যাদলেন তখন এমন একটা মানসিক অবস্থার মধ্যে পড়েছিল যে অবস্থায় বাইরের বেদনার্ত পরিস্থিতির সঙ্গে আমাদের চিন্তাভাবনা সব সংগতি সব সামঞ্জস্য হারিয়ে ফেলল। ম্যাদলেন ভাবল এই সেই ঘর, যে ঘরে বিচারকরা একসঙ্গে মিলিত হয়ে আলোচনা করেন নিজেদের মধ্যে, এই ঘরে বসে তারা এমন সব বিচারের রায় লেখেন যাতে কত জীবন নষ্ট হয়ে যায়, যে ঘরে তারও নাম উচ্চারিত হবে এবং তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে। ভাবতে ভাবতে সামনের দেয়ালের দিকে তাকাল সে। এই ঘরে সে এসে দাঁড়িয়ে আছে ভেবে আশ্চর্য হয়ে গেল সে।
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সে কিছু খায়নি। গাড়ির ঝাঁকুনিতে তার সর্বাঙ্গ ব্যথাহত হয়েছে তবু এই মুহূর্তে ক্ষুধা বা ব্যথার কোনও অনুভূতিই ছিল না তার।
ম্যাদলেন দেখল সামনের দেয়ালে আঁ নিকোলাস পাশের লেখা একটা চিঠি কাঁচের ফ্রেমে বাঁধানো অবস্থায় ছবির মতো ঝুলছিল। পাশে ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের আমলে প্যারিসের মেয়র। তিনিই ছিলেন ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা অথবা মৃত্যু’ এই বৈপ্লবিক ধ্বনির রচয়িতা। এই পাশেই রাজতন্ত্রের যুগের মন্ত্রী ও ডেপুটিদের একটি তালিকা প্রকাশ করেন। এইসব মন্ত্রী ও ডেপুটিদের আপন আপন বাড়িতে অন্তরীণ করে রাখা হয়েছিল। যে মনোযোগের সঙ্গে ম্যাদলেন সেই চিঠিটা পড়ছিল তাতে মনে হচ্ছিল এ বিষয়ে যেন তার একটা বিশেষ আগ্রহ আছে। আসলে কিন্তু চিঠিটার প্রতি তার কোনও সচেতনতাই ছিল না। সে শুধু সেই চিঠিটার দিকে তাকিয়ে ফাঁতিনে আর তার মেয়ের কথা ভাবছিল।
সহসা কোর্টের হলঘরে যাবার দরজার দিকে নজর পড়ল তার। পিতলের হাতলওয়ালা সেই দরজাটার কথা মনেই ছিল না তার। এতক্ষণে সেদিকে তার নজর পড়তেই ভয় পেয়ে গেল সে। তার কপালে ও গালে কিছু কিছু ঘাম ফুটে উঠল।
হঠাৎ তার মনে যেন একটা বিদ্রোহের ভাব দেখা দিল। কে যেন তার ভেতর থেকে বলল, কে বলছে তোমাকে এইসব করতে? ঘর থেকে বেরিয়ে যে পথে এসেছিল সেই পথে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। মনে হল সে যেন কার তাড়া খেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। কেউ তাকে সামনে বা পেছন থেকে ডাকছে কি না, তা কান খাড়া করে শুনতে লাগল। কিন্তু কোনও শব্দই শুনতে পেল না। সে দেয়াল ধরে একবার দাঁড়াল। দারুণ ঠাণ্ডাতেও তার কপালে ঘাম ফুটে উঠেছিল। শীতে কাঁপতে কাঁপতে ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিল সে। সে যেন কী ভাবছিল। গতকাল সারারাত এবং সারাদিন সে ভেবে এসেছে। অশ্রুত কণ্ঠে কে যেন তার ভেতর থেকে বলে উঠল, হায়!
