হোটেলমালিকের স্ত্রী ঘরে ঢুকে বলল, মঁসিয়ে রাত্রিতে থাকবেন তো? আপনার খাবার লাগবে?
ম্যাদলেন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
হোটেলওয়ালী বলল, শুনছি আপনার ঘোড়াটা খুব ক্লান্ত। তার দু দিন বিশ্রাম দরকার।
ম্যাদলেন বলল, এখানে ডাকঘর আছে?
হোটেলওয়ালী বলল, হ্যাঁ, মঁসিয়ে।
সে ম্যাদলেনকে ডাকঘরে নিয়ে গেল। সেখানে সে জানতে পারল মন্ত্রিউল-সুর-মের যাওয়ার জন্য যে ডাকগাড়ি ছাড়বে তাতে ডাকপিয়নের পাশে একটা সিট আছে। টাকা দিয়ে সেই সিটটা সংরক্ষণ করে রাখল মাদলেন। কেরানি তাকে সতর্ক করে দিল গাড়ি ছাড়বে রাত ঠিক একটার সময়।
ম্যাদলেন হোটেল থেকে রেরিয়ে শহরে গেল। শহরের রাস্তাগুলো অন্ধকার। অ্যারাসে সে কখনও আসেনি এর আগে। এখনকার পথঘাট তার অচেনা। কিন্তু কাউকে পথনির্দেশের জন্য কোনও কথা বলল না। ক্রিনশান নদী পার হয়ে সে একটা সরু গলিপথ ধরল। একটা লোক লণ্ঠনের আলো হাতে আসছিল।
ম্যাদলেন তাকে জিজ্ঞাসা করল, মঁসিয়ে, আমাকে আদালতে যাওয়ার পথটা বলে দিতে পারেন?
লোকটি ছিল বয়োপ্রবীণ। সে বলল, আপনি বোধ হয় এ শহরে নতুন? আমি আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। কারণ আমি সেখানেই যাচ্ছি। আমি যাচ্ছি পুলিশ অফিসে। কোর্টঘর এখন মেরামত করার জন্য পুলিশ অফিসেই কোর্ট বসে।
দাগি আসামিদের জটিল মামলার বিচার সেখানেই হয়?
হ্যাঁ। বিপ্লবের আগে বর্তমানের এই পুলিশ অফিস ছিল বিশপের বাড়িতে। বিশপের নাম ছিল মঁসিয়ে কলদো। তিনি বিরাশি বছর বয়সেও বিশপের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি একটা বড় হলঘর নির্মাণ করেন। এখানেই এখন মামলার শুনানি হয়।
ওরা দু জনে একসঙ্গে পথ চলতে লাগল। বয়স্ক লোকটি জিজ্ঞাসা করল, আপনি কি কোনও বিচার দেখার জন্য এসেছেন? কিন্তু আপনার দেরি হয়ে গেছে। ছ’টাতে কোর্ট বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু ওরা কোর্টঘরের কাছাকাছি গিয়ে দেখল একটা বড় বাড়ির বড় বড় চারটে খোলা জানালা দিয়ে আলোর ছটা আসছে।
লোকটি বলল, আপনার ভাগ্য ভালো। হয়তো কোনও বিচারে বেশি সময় লাগার জন্য এখনও শেষ হয়নি কোর্টের কাজ। নিশ্চয় কোনও ফৌজদারি মামলা। আপনি কি সাক্ষ্য দিতে এসেছেন?
ম্যাদলেন বলল, না। আমি কোনও বিশেষ মামলার জন্য আসিনি। আমি একজন অ্যাটর্নির সঙ্গে কথা বলতে চাই।
ভদ্রলোক বলল, তা হলে আপনি সোজা ওই সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে যান। দারোয়ান আছে ওখানে।
ম্যাদলেন মিনিটকতকের মধ্যেই একটা বড় ঘরে গিয়ে ঢুকল। ঘরটাতে তখন অনেক মানুষের ভিড় ছিল। এক একজন উকিল জটলা পাকিয়ে নিচু গলায় কথা বলছিল। আদালতের মাঝখানে কালো পোশাকপরা এইসব উকিলদের ঘোরাফেরা করতে দেখে ভয় লাগে। তাদের কথাবার্তা থেকে কোনও দয়া বা করুণার আভাস পাওয়া যায় না। করে কার বিরুদ্ধে হাকিম কী রায় দেবে, তা বোঝা যায় না। অন্ধকারে ঘুরে বেড়ানো এক ঝাঁক পোকার মতো দেখায় তাদের।
হলঘরের পাশে আর একটা বড় ঘর ছিল। একটামাত্র বাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছিল ঘরটা। ঘরের দুটো দরজাই বন্ধ ছিল।
প্রথমে সামনে যে উকিলটাকে দেখতে পেল তাকে ম্যাদলেন বলল, মামলাটা কতক্ষণ চলছে স্যার?
মামলা হয়ে গেছে।
হয়ে গেছে?
ম্যালেনের গলার স্বর শুনে উকিল তার পানে তাকাল। বলল, আপনি আসামিপক্ষের কোনও আত্মীয়?
না। এখানে আমি কাউকে চিনি না। একটা রায় বেরোবার কথা ছিল।
হ্যাঁ। কোনও কিছু করার ছিল না।
কী রায় বার হল?
যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড।
ম্যাদলেন এরপর খুব নিচু গলায় অস্পষ্টভাবে বলল, শনাক্তকরণের ব্যাপারটা?
শনাক্তকরণ? শনাক্তকরণের তো কোনও প্রশ্নই ছিল না। এ তো সোজা সরল ঘটনা। মহিলাটি তার সন্তানকে খুন করে। শিশুহত্যা প্রমাণিত হয়। জুরিরা শুধু পূর্বপরিকল্পিত এই কথাটা বাতিল করে দিয়েছেন। মহিলাটির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।
ম্যাদলেন আশ্চর্য হয়ে বলল, মহিলা!
হ্যাঁ। লিমোসিন তার নাম। আপনি কী ভেবেছিলেন?
সে যাই হোক, কোর্টের কাজ সব হয়ে গেলেও এখনও আলো জ্বলছে কেন?
আর একটি মামলার বিচার চলছে। কয়েক ঘণ্টা আগে মামলার কাজ শুরু হয়।
মামলাটি কী?
এটাও সোজা ব্যাপার। একজন ভূতপূর্ব কয়েদি, চুরির অপরাধে অপরাধী। নামটা ভুলে গেছি। দেখে বোঝা যায় লোকটা একটা পাকা বদমায়েস। তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গেই জেলে পাঠাতে ইচ্ছা করে।
আচ্ছা মঁসিয়ে, অফিসঘরে আমি একবার ঢুকতে পারি?
এটা কিন্তু খুবই মুশকিল। কোনও আসন খালি নেই। এখন বিরতি চলছে। তবে আবার কাজ শুরু হলে দু একজন উঠে যেতে পারে।
উকিল চলে গেলে ম্যাদলেন ভাবতে লাগল। উকিলের কথাগুলো বরফের সূচের মতো তার গায়ে যেন বিঁধছিল। উকিল যখন বলল, মামলাটা এখনও শেষ হয়নি তখন তা শুনে সে একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কিন্তু সে শ্বাস স্বস্তি না বেদনার তা সে নিজেই বলতে পারবে না।
ম্যাদলেন ভাবতে ভাবতে ঘরটার দিকে এগিয়ে গেল। কোর্টের হাতে অনেক মামলা থাকায় বিচারপতি একই দিনে দুটো মামলার নিষ্পত্তি করে ফেলার হুকুম দিয়েছেন। প্রথমে শিশুহত্যা এবং পরে জেলফেরত কয়েদির মামলাটা ওঠে। তার বিরুদ্ধে আপেল চুরির অভিযোগটা প্রমাণিত হয়নি। সে তুল’র জেলখানায় অনেকদিন ছিল, এটাই তার বিরুদ্ধে এখন সবচেয়ে বড় আপত্তি। তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণের কাজ সব হয়ে গেছে।
