এই নারী হতেই পারেন তার মা, ভাবল উইনস্টন। বয়স আর শরীরের গঠনে মিলে যায়, আর জবরদস্তি শ্রমের ক্যাম্পে বিশ বছর কাটালে মানুষের মধ্যে পরিবর্তন তো আসবেই।
আর কেউ অবশ্য তার সঙ্গে কথা বলেনি। বিস্ময়করভাবেই সাধারণ অপরাধীরা দলের কয়েদীদের অবজ্ঞার চোখে দেখে। ‘দ্য পলিটস’ এই নামেই ওরা তাদের ডাকে, যেন তাদের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। পার্টির কয়েদীরা কারো সঙ্গে কথা বলতে স্রেফ আতঙ্কিত বোধ করে, আর নিজেদের মধ্যে একে অপরের সঙ্গেও নয়। কেবল একবারই, পার্টির দুই নারী সদস্য ঠেলাঠেলিতে কিছুক্ষণের জন্য পাশাপাশি হয়ে পড়েছিল, তখন সে এই শোরগোলের মধ্যেও শুনতে পেল কিছু শব্দ অতি দ্রুততায় চালাচালি হয়ে গেল। তাদের যা বলতে শোনা গেল তা ছিল অনেকটা এরকম ‘রুম ওয়ান-ওহ-ওয়ান’—যা বস্তুত তার বোধগম্য হলো না।
হতে পারে, ঘণ্টা দুই কিংবা তিনেক আগে ওরা তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। পেটের ব্যথাটি এক লহমার জন্যও বন্ধ হয়নি, তবে ক্ষণে ক্ষণে কিছুটা কম অনুভূত হয়েছে আবার মাঝে মাঝে চাগাড় দিয়ে উঠছে, তার সঙ্গে মিল রেখে ভাবনার গাড়িও কখনো স্তিমিত কখনো জোর বেগে চলছে। যখন ব্যথাটি বাড়ে তখন ব্যথা আর খাবারের প্রত্যাশা ছাড়া অন্য কিছুই আর ভাবনায় থাকে না। আর যখন ব্যথাটি ধরে আসে তখন মন জুড়ে জেঁকে বসে আতঙ্ক। কোনো কোনো মুহূর্তে তার ভাবনায় ভর করে যা কিছু ঘটতে যাচ্ছে তার কপালে সে সবের কল্পনা। আর এতে তার হৃদযন্ত্রটি লাফাতে থাকে আর শ্বাস-প্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। অনুভবে আসে কনুইয়ে লাঠির আঘাত, লোহার পাত বসানো জুতোয় জঙ্ঘাস্থিতে কষে বসানো লাথি, নিজেকে সে দেখতে থাকে মেঝের ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে আর ভেঙ্গে ফেলা দাঁতের ফাঁকা দিয়ে করে যাচ্ছে ক্ষমার চিৎকার। জুলিয়ার কথা তার মনেই আসে না। এলেও ওর ওপর মনকে স্থির করতে পারে না। জুলিয়াকে সে ভালোবাসে আর তার সঙ্গে প্রতারণা করবে না, কিন্তু সে তো সত্য মাত্র, সেটা সে জানে ঠিক যেমনটি জানে অঙ্কের নিয়ম।
কিন্তু এখন এই মুহূর্তে তার প্রতি কোনো ভালোবাসা সে অনুভব করছে না, এমনকি তার কী হয়েছে সে নিয়ে কৌতূহলও হচ্ছে না। মাঝেমধ্যে ও’ব্রায়েনকেও মনে পড়ে, সূক্ষ্ম একটা আশা জাগানিয়া সে ভাবনা। ও’ব্রায়েন জানলেও জানতে পারেন সে এখন ধৃত। তিনি তো বলেইছিলেন, ব্রাদারহুড কখনোই তাকে রক্ষায় এগিয়ে আসবে না। তবে একটি রেজর ব্লেডের কথা বলেছিলেন, বলেছিলেন ওরা যদি পারে একটি রেজর ব্লেড তোমাকে পৌঁছে দেবে। আর নিরাপত্তারক্ষীরা ছুটে কারা প্রকোষ্ঠে পৌঁছানোর আগে পাঁচ সেকেন্ড সময়ও পাওয়া যাবে। এই ব্লেড তাকে জ্বলন্ত এক শীতল কামড় বসাবে, যে আঙুলে সেটি ধরা থাকবে সেটি কেটে যাবে হাড্ডি অবধি। কল্পনায় সবকিছুই যেন ফিরে এসেছে তার অসুস্থ শরীরে, সামান্য ব্যথা বেড়ে এখন কম্পমান অসহনীয় রূপ নিয়েছে। রেজর ব্লেড হাতে পেলেও তার ব্যবহার করবে কি না তা মোটেই নিশ্চিত নয় সে। নির্ঘাত নির্যাতন জেনেও আরও দশটি মিনিটের জীবন প্রত্যাশিত। একটি মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্ত পর্যন্ত বেঁচে থাকাই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
কুঠুরীতে কতগুলো ইট তা গুনে দেখে কখনো কখনো। গুনে ফেলাটা কঠিন কিছু কাজ নয়, কিন্তু প্রতিবারই কোনো না কোনো পর্যায়ে খেই হারিয়ে ফেলে। বারবার কৌতূহল জাগে, কোথায় সে, কয়টা বাজে এসব জানার। একটা সময় তার নিশ্চিত করেই মনে হয় বাইরে এখন রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিবালোক, আবার একটু পরে একই নিশ্চয়তায় তার মনে হয় বাইরে ঘুঁটঘুটে আঁধারের রজনী। এইখানে, গভীর উপলব্ধিতে সে বুঝতে পারে, আলো কখনোই নেভে না। এ এক স্থান যেখানে কোনো আঁধার নেই: এখন সে বুঝল কেন ও’ব্রায়েন সেদিনের সেই পরোক্ষ কথার মানে ঠিক ধরে ফেলেছিলেন। ভালোবাসা মন্ত্রণালয়ে কোনো জানালা নেই। তার প্রকোষ্ঠটি হতে পারে ভবনের ঠিক মাঝখানটিতে, অথবা পাশের কোনো দেয়াল ঘেঁষাও, হতে পারে মাটির নিচে আরো দশতলা গভীরে, কিংবা মাটি থেকে আরো ত্রিশ তলা উপরে। মনে মনে সে বিচরণ করতে লাগল ভবনের এখান থেকে সেখানে, আর শরীর ও মনানুভূতি দিয়ে বুঝতে চেষ্টা করল কোথায় সে, অতি উচ্চে বায়ুতে নাকি অতি গভীর তলদেশে।
বাইরে থেকে অনেক বুটের ঝম-ঝম আওয়াজ আসছে। বিকট শব্দ তুলে খুলে গেল ইস্পাতের দরজা। তরুণ এক অফিসার, কালো উর্দিতে টান টান শরীর, ঝকঝকে চামড়ার পোশাকে আরো চকচকে, কঠোর, নির্জীব চেহারাটি স্রেফ মোমের মুখোশ, দরজাপথে দৃঢ় পা ফেলে ভিতরে ঢুকলেন। সঙ্গে আনা অপর বন্দিকে প্রকোষ্ঠে ঢোকাতে নিরাপত্তারক্ষীদের নির্দেশ দিলেন। ধাক্কাতে ধাক্কাতে ভেতরে ঢোকানো হলো কবি অ্যাম্পলফোর্থকে। আর তখনই বিকট শব্দ তুলে ফের বন্ধ হলো দরজা।
অ্যাম্পলফোর্থ প্রথমেই কুঠুরীর দেয়াল ঘেঁষে কয়েকবার এপাশ থেকে ওপাশে অনিশ্চিত নড়াচড়া করল যেন মনে করেছে এই কক্ষে বাইরে যাওয়ার আরেকটি দরজা ঠিকই আছে, আর অতঃপর কুঠুরীর উপর থেকে নিচটা কয়েকবার দেখে নিল। তখনো উইনস্টনের উপস্থিতি তার নজরে আসে নি। তার পর্যুদস্ত চাহনি তখনও উইনস্টনের মাথারও এক মিটার উপর থেকে ঘুরপাক খাচ্ছে। পায়ে জুতো নেই, বড় বড় নোংরা দুটি বুড়ো আঙুল মোজা ছিঁড়ে বাইরে বের হয়ে আছে। তারও বেশ কিছুদিন দাঁড়ি কামানো হয়নি। খোঁচা খোঁচা দাঁড়িতে ভরে আছে মুখ-চোয়াল। সব মিলিয়ে চেহারাটি হিংস্র রাফিয়ানোদের মতো মনে হচ্ছে, তবে দুর্বল বপু আর ভয়ার্ত নড়াচড়ার সঙ্গে যা একেবারেই বেমানান।
