সরু বেঞ্চটিতে যতটুকু বসা যায় ততটুকুই বসে আছে, হাত দুটো হাঁটুর ওপরে ক্রস করে ফেলে রাখা। চুপচাপ অনড় বসে থাকা এরই মধ্যে সে শিখে গেছে। কোনো রকম অপ্রত্যাশিত নড়াচড়া হলেই টেলিস্ক্রিনে ওদের তারস্বর ভেসে আসে। কিন্তু ক্ষুধার ব্যাকুলতা ক্রমেই তাকে পেয়ে বসছে। এখন তার আর কিছুরই নয়, স্রেফ এক টুকরো রুটির অপেক্ষা। তার ধারণা আলখেল্লার পকেটে গুঁড়ো হয়ে যাওয়া রুটি কিছুটা রয়েছে। হতেও পারে—কারণ পায়ের ত্বকে কিছু একটা অনভূতও হচ্ছে। মনে হচ্ছে কিছু একটা রয়েছে পকেটে। ভাবতে ভাবতে ভয়কেও কিছুটা অতিক্রম করেছে সে, আর আলগোছে পকেটে হাতটি ঢুকিয়ে দিয়েছে মাত্র—
‘স্মিথ!’ টেলিস্ক্রিন থেকে ভেসে এলো তীব্র আওয়াজ। ‘৬০৭৯ স্মিথ ডব্লিউ! কারা প্রকোষ্ঠে হাত পকেটে নয়!’
ফের অনড় বসে রইল সে, হাত দুটো হাঁটুর ওপরে আড়াআড়ি হয়ে পড়ে আছে। এখানে আনার আগে তাকে আরেকটি স্থানে নেওয়া হয়েছিল, হতে পারে সেটি সাধারণ কারাগার অথবা টহলদারদের অস্থায়ী লক-আপ। জানে না সেখানে কতক্ষণ ছিল; তবে ঘণ্টা কয়েক তো হবেই; সেখানে কোনো ঘড়ি ছিল না, ছিল না দিনের আলোও, ফলে সময় হিসাব করা কঠিন। ভীষণ শোরগোলে, পুঁতি-গন্ধময় স্থান ছিল সেটি। ওই প্রকোষ্ঠটির আকার এইটির মতোই ছিল তবে ওটি ছিল নোংরা আর আরো দশ পনেরো জনে ঠাসা। ওদের অধিকাংশই ছিল সাধারণ অপরাধী, তবে গুটিকয় রাজনৈতিক বন্দিও ছিল। দেয়ালের সঙ্গে সেঁটে থেকে নিশ্চুপ হয়ে ছিল তারা সবাই, নোংরা শরীরের গন্ধ নাকে লাগছিল কিন্তু পেটের ব্যথা আর ভয়ের চোটে নিজেই এত বেশি কুঁকড়ে ছিল যে ওগুলোয় ধ্যান দেওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে দলের কারাবন্দি ও সাধারণ বন্দিদের মধ্যে যে ফারাকটি থাকে তা খুব করে লক্ষ্য করেছে সে। দলের বন্দিরা ভয়ে কুঁকড়ে নিশ্চুপ হয়ে থাকে, কিন্তু সাধারণ অপরাধীরা কেউ কাউরে কিছুতেই পাত্তা দেয় না। ওরা নিরাপত্তা কর্মীদের সঙ্গেও খিস্তিখেউর করে, নিজেরটা ঠিক মতো না পেলে ভয়ঙ্কর হামলা চালায়, গোপনে পাচার করে আনা খাবার খায়, নিজেদের কাপড়ের মধ্যেই কেমন করে কোনো রহস্যময় লুকোনো স্থানে করে বয়ে আনে সেই খাবার, আর টেলিস্ক্রিনে কোনো নির্দেশনা, হুমকি ধমকি এলে পাল্টা চিৎকার শোরগোল বাজিয়ে দেয়। এছাড়াও এদের কারো কারো নিরাপত্তা রক্ষীদের সঙ্গে বেশ খাতির। ওরা তাদের ডাকনামে ডাকে, কারো কারো হাতে দরজার গুপ্তফুঁকো দিয়ে এসে পড়ে দু’চারটি সিগারেটও। নিরাপত্তা রক্ষীরাও এই সাধারণ কয়েদীদের বেশ ধৈর্যের সাথে সামলায়, এমনকি যখন তাদের ওপর চড়াও হতে হয় তখনও। বহুল আলোচিত জবরদস্তিমূলক শ্রম ক্যাম্পও রয়েছে যেখানে অধিকাংশ কয়েদীকেই যেতে হয় অবধারিতভাবে। সে জেনেছে, এসব ক্যাম্পে সবই সই, কোনো ভাবনা নেই যতক্ষণ আপনার কিছু ভালো যোগাযোগ আছে, হাতে পেয়ে যাচ্ছেন ধরার মতো রশি। এখানে ঘুষ চলে, চলে পক্ষপাতিত্ব, আছে সব ফন্দি-ফিকির, সমকামিতা, পতিতাবৃত্তিও; আলু দিয়ে এখানে তৈরি হয় চোলাই মদ। আস্থার সবটুকুই এই সাধারণ অপরাধীদের ওপর ন্যস্ত, বিশেষ করে যারা গ্যাংস্টার, খুনি, যারা তৈরি করেছে এক ধরনের আভিজাত্য। আর এই সকল নোংরা কাজই ঘটে চলে রাজনীতির নামে।
যত রকমফের রয়েছে তার সব ধরনের অপরাধীদের আনাগোনা এখানে। মাদক ব্যবসায়ী, চোর, জোচ্চর, দস্যু, চোরা-কারবারি, মাতাল, মদ্যপ, বারবনিতা সব। কোনো কোনো মদ্যপ আবার এতটাই সহিংস ও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে যে তাদের দমাতে অন্য কয়েদীরা একজোট হয়।
ষাটের কাছাকাছি বয়স হবে এমন এক বিশালদেহী, থলথলে স্তন, আর মাথা ভর্তি সাদা চুলের জটওয়ালা এক নারীকে অনেকটা চ্যাংদোলা করে, লাথি-গুঁতো দিতে দিতে আর খিস্তি-খেউর করতে করতে প্রকোষ্ঠে ঢোকাল চার কারারক্ষী। বুটসহ দুই পা দুজন মুচড়ে ধরে আছে, তারই মাঝে নারীটি ওদের লাথি দিতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এভাবেই ঠিক উইনস্টনের কোলের ওপর ঝপ করে তাকে ফেলল কারারক্ষীরা। প্রচণ্ড চাপে তার রানের হাড় ভেঙ্গে যাওয়ার দশা। নারীটি নিজেকে সোজা করে তুললেন আর চিৎকার করে বললেন, ‘ফা… বাস্টার্ডস!’ তখনই খেয়াল করলেন অস্বাভাবিক কিছুর ওপর বসে আছেন, আর দ্রুতই উইনস্টনের হাঁটুর ওপর থেকে হড়কে গিয়ে বেঞ্চিতে বসলেন।
‘মাফ করো, প্রিয়’—বললেন তিনি। ‘আমি তোমার ওপর বসে পড়িনি, ওই জারজগুলো আমাকে তোমার ওপর ফেলেছে। একটা মেয়ে মানুষের সঙ্গে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় তা ওরা জানে না, তুমিই বলো, জানে নাকি?’ একটু থামলেন, বুকের ওপর হালকা চাপড় দিতে দিতে, বড় একটা ঢেঁকুড় তুললেন। ‘মাফ করো, সত্যি বলছি আমি নিজে কিন্তু বসিনি’—ফের বললেন নারীটি।
এরপর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে মেঝেতে হড়হড় করে বমি করে দিলেন।
‘ভালোই হলো’—চোখ বন্ধ করে পেছনে হেলান দিতে দিতে বললেন তিনি। ‘জিনিসটা পেটে পড়লে আর নিচে থাকতে চায় না, ঠিক বের হয়ে আসে। ’
আরেকটু ধাতস্ত হলে ফের উইনস্টনের দিকে তাকালেন আর তার প্রতি যেন একটু আগ্রহীই হয়ে উঠলেন। বিপুল দুটি বাহু তার কাঁধের ওপর ফেলে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলেন তাকে, মুখের ওপর এসে লাগছে বিয়ার আর বমির গন্ধের ধাক্কা।
‘তোমার নাম কী, বলো তো’—বললেন তিনি।
‘স্মিথ’—বলল উইনস্টন।
‘স্মিথ?’ বিস্ময় নারীটির কণ্ঠে। ‘মজার তো। আমার নামও স্মিথ। কেন’—একটু আবেগমাখা উচ্চারণ তার, ‘তাহলে হতে পারে আমি তোমার মা!’
