জড়িমা ভেঙ্গে নিজেকে কিছুটা টেনে তুলল উইনস্টন। অ্যাম্পলফোর্থের সঙ্গে তার কথা বলা উচিত, জানা আছে টেলিস্ক্রিন ঝাঁঝিয়ে উঠবে, তারপরেও। এমনও তো হতে পারে সে-ই মূলত রেজর ব্লেডের বাহক।
‘অ্যাম্পলফোর্থ,— বলল সে।
টেলিস্ক্রিন কোনো রা করল না। অ্যাম্পলফোর্থ থমকাল, কিছুটা চমকালোও। আর ধীরে ধীরে নজর ফেলল উইনস্টনের ওপর।
‘অ্যাহ, স্মিথ!’ বলল সে। ‘তুমিও’
‘তুমি কেন এখানে?’
‘তোমাকে সত্যি কথাটি জানাতে’—বলতে বলতে উইনস্টনের উল্টোদিকে বেঞ্চিতে বসে পড়ল সে। ‘অপরাধ তো ওই একটাই, নাকি?’
‘তাহলে তুমি কি সে অপরাধ করেই ফেলেছো?’
‘মনে হয় করে ফেলেছি। ’
একটি হাত কপালে রেখে একপাশে চাপ দিতে লাগল, যেন কোনো কিছু মনে করার চেষ্টা করছে।
‘এভাবেই ঘটনাগুলো ঘটে’—ভাসাভাসা শুরু তার। ‘একটি ঘটনা আমার মনে পড়ছে, হ্যাঁ সম্ভবত একটিই ঘটনা। নিঃসন্দেহে সেটা ছিল অসাবধানতাবশত। আমরা কিপলিংয়ের কবিতার একটি নির্দিষ্ট সংস্করণ তৈরির কাজ করছিলাম। তারই একটি পংক্তির শেষে ‘গড’ শব্দটিকে রেখে দিয়েছিলাম। আসলে উপায় ছিল না!’—উইনস্টনের পানে মুখ তুলে তাকিয়ে অনেকটা ক্রোধের উচ্চারণ তার। ‘লাইনটি পাল্টানো অসম্ভবই ছিল। ছন্দের অপর শব্দটি ছিল “রড”। তুমি জানো গোটা ভাষায় এই “রড”-এর সঙ্গে মিল হয় মাত্র বারোটি শব্দের। কয়েক দিন ধরে এ নিয়ে মাথা খাটিয়ে আর একটি শব্দকেও মেলানোর মতো পাইনি। ’
ওর মুখের অভিব্যক্তি পাল্টে গেল। একটা বিরক্তির ভাব মুখের ওপর দিয়ে বয়ে গেল ঠিকই, তবে এক দণ্ডের জন্য তাকে সন্তুষ্টও মনে হলো। নোংরা উশকোখুশকো চুলের মাঝেও এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক উষ্ণতা, পাণ্ডিত্যের আনন্দ ঝিলিক দিচ্ছিল।
‘তোমার কি কখনো মনে হয়েছে, বলো’—বলল সে, ‘ইংরেজি পদ্যের ইতিহাসে কি এই সত্যের মুখোমুখি কেউ হয়েছে কভু যে, এই ভাষায় অন্ত্যমিল শব্দের অভাব রয়েছে?’
নাহ, উইনস্টনের ক্ষেত্রে এমনটা কখনোই ঘটেনি। তবে এই এখন বিষয়টি তার কাছে খুব একটা গুরুত্বের কিংবা আগ্রহেরও মনে হচ্ছে না।
‘তুমি কি জানো দিনের কোন সময়টা এটা?’—প্রসঙ্গ পাল্টে প্রশ্ন তার।
ফের চমকাতে দেখা গেল অ্যাম্পলফোর্থকে। ‘এ নিয়ে ভাবিনি। ওরা আমাকে বন্দি করেছে দিন দুয়েক আগে, দিন তিনেকও হতে পারে। ’ দেয়ালের চারিদিকে ঘুরছে তার চোখ, যেন এখনো তার মাঝে আধা প্রত্যাশা জাগ্রত যে, এই দেয়ালের কোথাও মিলে যাবে একটি জানালা। ‘এইখানে রাত আর দিনে কোনো ফারাক নেই। কেউ সময় হিসাব করতে পারবে এমন কোনো পথ এখানে দেখছি না। ’
বাইরে থেকে অনেক বুটের ঝম-ঝম আওয়াজ আসছে। বিকট শব্দ তুলে খু
তাদের এমন অসংলগ্ন কথাবার্তা চলল মিনিট কয়েক, অতঃপর, আচমকা টেলিস্ক্রিন চিৎকার পাড়লো, আর সাথে সাথে দুজনই চুপ মেরে গেল। নিশ্চুপ বসে উইনস্টন, হাতদুটো আগের মতোই হাঁটুর ওপর আড়াআড়ি করে রাখা। সরু বেঞ্চটি বিশাল বপুর অ্যাম্পলফোর্থের জন্য আরামদায়ক হওয়ার কথা নয়, একটি হাঁটু ঘিরে দুই হাতের আঙুল কেচকি মেরে একবার এদিক আরবার ওদিক তাকাচ্ছে সে। ফের ঘেউ করে উঠল টেলিস্ক্রিন, অ্যাম্পলফোর্থকে সটান হয়ে থাকার নির্দেশ। সময় বয়ে যাচ্ছে। বিশ মিনিট কিংবা এক ঘণ্টা—হিসাব কষা কঠিন। আরো একবার বাইরে থেকে বুটের শব্দ এলো। উইনস্টনের অন্ত্র বার্তা দিল, খুব শিগগিরই, হতে পারে পাঁচ মিনিটে, হতে পারে এখনই এই যে বুটের ভারী শব্দ, যার মানেই হলো তার নিজের পালা এসে গেছে।
দরজা খুলে গেল। শীতল হলুদমুখো কর্মকর্তা প্রকোষ্ঠে পা ফেললেন। হাতের সামান্য ইশারায় তিনি অ্যাম্পলফোর্থকেই ইঙ্গিত করলেন।
‘রুম ১০১’—বললেন তিনি।
অনভ্যস্ত ভঙ্গিমায় নিরাপত্তারক্ষীদের মাঝখান দিয়ে এগিয়ে গেল অ্যাম্পলফোর্থ, তার চেহারায় একটা অস্পষ্ট উদ্বেগ আছে তবে ভয়ের দেখা নেই।
মনে হচ্ছিল দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে। পেটের ব্যথা ফিরে এসেছে উইনস্টনের। একই কৌশলকে ঘিরে তার মনটাও ঘুরপাক খাচ্ছে; ঠিক যেমন করে একই গর্তের ভেতরে পড়ে একটি বল একইভাবে ঘুরপাক খায়। তার চিন্তা জগতকে ঘিরে রয়েছে মোটে ছয়টি বিষয়। পেটের পীড়া; এক টুকরো রুটি; রক্ত আর চিৎকার; ও’ব্রায়েন; জুলিয়া; আর একটি রেজর ব্লেড। আবারও অন্ত্রে খিঁচুনি অনুভব করল। বুটের শব্দগুলো এগিয়ে আসছে। দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকে পড়া বাতাস বয়ে আনল শীতল ঘামের তীব্র কটু গন্ধ। পারসন্সের প্রবেশ কয়েদ খানায়। পরনে খাকি শর্টস আর স্পোর্টস-শার্ট। নিজের অজান্তেই এবার চমকাল উইনস্টন।
‘তুমি এখানে!’—বলল সে।
উইনস্টনের দিকে এক নজর তাকাল পারসন্স, তাতে নেই কোনো বিস্ময়, কোনো আগ্রহও, তবে রহস্যটুকু ঝুলে আছে। উপর-নিচে ঝাঁকি মেরে মেরে হাঁটহাঁটি জুড়ে দিল, সোজা হয়ে থাকা তো তার পক্ষে অসম্ভবই। থলথলে হাঁটু তুলে প্রতিবার পা ফেলার সময় কাঁপছে। চোখ দুটো বিস্ফোরিত, স্থির চাহনি, যেন কাছে ধারের কোনো একটা কিছু চোখ পাকিয়ে দেখছে।
‘তোমাকে ঢুকিয়েছে কেন?’—বলল উইনস্টন।
‘চিন্তা অপরাধ!’—বলল পারসন্স। অনেকটা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠ তার। তবে কণ্ঠস্বরই বলে দিচ্ছিল সে মেনে নিয়েছে যে, সে অপরাধী। আর এমন একটা শব্দ তার জন্যই খাটে। উইনস্টনের ঠিক উল্টোদিকে খানিকটা থামল সে, আর বলতে শুরু করল, ‘মনে করো না ওরা আমাকে গুলি করবে, ঠিক তাই বুড়ো ভাম! তুমি কিছু না করলে, ওরা তোমাকে গুলি করবে না—মোটে তো চিন্তা করা, চিন্তার ওপর তো তোমার নিয়ন্ত্রণ নেই। আমি জানি ওরা তোমার কথা শুনবে। ওদের ওপর এ ব্যাপারে আমার দৃঢ় বিশ্বাস! ওরা আমার নথিপত্র ঘাটবে, তাই না? তুমি তো জানো কেমন লোক ছিলাম আমি। আমি তো খারাপ ছিলাম না। মেধাবী নই কিন্তু বুদ্ধি তো ছিল। পার্টির জন্য যা কিছু করা সম্ভব ছিল করেছি, বলো করি নি? পাঁচ বছরের মধ্যে আমি ছাড়া পেয়ে যাব, তোমার কী মনে হয়? অথবা হতে পারে দশ বছর। শ্রম-শিবিরে আমার মতো লোক বেশ কাজে লাগবে। একবার লাইনচ্যুত হওয়ার জন্য ওরা নিশ্চয়ই আমাকে গুলি করে মারবে না?’
