কোরালের একটি খণ্ড, কেকের ওপর চিনির গোলাপী অঙ্কুরটি ঠিক যেমন হয়, তেমনি গোলাপী রঙের সামান্য একটি টুকরো ছিটকে এসে বিছানার ওপর পড়ল। কী ছোট! ভাবল উইনস্টন, কত ছোট ছিল এটি! অথচ কাচের ওপর থেকে কত বড় দেখাত! একটা থাবা তার পেছনে প্রস্তুত ছিল, আর ঠিক তখনই ভয়াবহ একটি লাথি এসে পড়ল তার গোঁড়ালির ওপর, এতে অনেকটাই ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। একজন এসে ঘুষি বসাল জুলিয়ার নাভীমূলে, কাঠপেন্সিলের মতো ছিটকে মেঝেতে পড়ে গিয়ে নিঃশ্বাস ফিরে পাওয়ার যুদ্ধে রত সে। উইনস্টন তার মাথাটি এক মিলিমিটারও ঘোরানোর সাহস করল না, তবে কৌণিকভাবে জুলিয়ার নীল-ধূসর ভয়ার্ত মুখখানি ঠেরে ঠেরে নজরে আসছে তার। এত ভয়ের মাঝেও নিজের শরীরের ব্যথা ছাপিয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে জুলিয়ার নিঃশ্বাস ফিরে পাওয়ার বিষয়টি। নিজের ক্ষেত্রে না হলেও সে বুঝতে পারে কী ভয়াবহ যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে এই আঘাত। কিন্তু এ সব ভাবনার চেয়ে জুলিয়ার শ্বাস নিতে পারাটাই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এরপর দুজন মিলে জুলিয়ার হাঁটু আর কাঁধের কাছে ধরে চ্যাংদোলা করে তুলল আর বস্তার মতো ঝুলিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। তার নিচের দিকে ঝুলে থাকা হলদেটে দুমড়ে যাওয়া মুখখানি এক নজর দেখতে পেল উইনস্টন। নির্মিলিত চোখ, গালের গোলাপী রুজের আভা তখনও জ্বলজ্বলে। আর সেটাই ছিল তাকে তার শেষ দেখা।
তখনও সটান দাঁড়িয়ে সে। ততক্ষণেও কেউ তার ওপর চড়াও হয়নি। বরং চিন্তাগুলোই নিজে নিজে এসে চড়াও হচ্ছে আর অনিচ্ছাতেও তা মনের মাঝে বিচরণ করে চলেছে। কৌতূহল হলো, ওরা কি মি. চ্যারিংটনকেও ধরে ফেলেছে। তার জানতে ইচ্ছা হলো আঙিনার ওই নারীটিরে তারা কী করেছে। বুঝতে পারছে ভীষণ প্রস্রাবের বেগ চেপেছে, এক ধরনের বিস্ময়বোধও হচ্ছিল, কারণ মোটেই ঘণ্টা দুই কিংবা তিনেক আগে সে কাজটি করেছে। দেখল চুল্লির ওপর রাখা ঘড়িটিতে নয়টা বাজে, মানে একুশ ঘণ্টা। কিন্তু তখনও দিনের আলো রয়েছে। আগস্টের সন্ধ্যাগুলোতে একুশ ঘণ্টায়ও আলো নিভে আসে না? প্রশ্ন জাগল তার মনে। তার মনে হলো সে আর জুলিয়া কি এতদিন সময় গণনায় ভুল করেছে—তারা যে সময়টিকে বিশ ঘণ্টা ত্রিশ মিনিট বলে জেনেছে সেটি আসলে ছিল পরের দিনে সকাল সাড়ে আটটা। ভাবনাটিকে আর সামনে এগুতে দিল না সে। কারণ এই ভাবনায় মজার কিছু নেই।
আরেকটা অপেক্ষাকৃত হালকা পদশব্দ পাওয়া যাচ্ছে সিঁড়িতে। মি. চ্যারিংটনের কক্ষে প্রবেশ। কালো উর্দিধারীদের আচরণে কিছুটা নমনীয়তা লক্ষ্য করা গেল। মি. চ্যারিংটনের চেহারায়ও কিছু একটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত। তার চোখ পড়ে আছে কাচের ভাঙা টুকরোগুলোর ওপর।
‘টুকরোগুলো ওঠাও’—কড়া গলায় উচ্চারণ তার।
একজন ঝুকে পড়ে তার কথা মতো কাজ শুরু করল। খাস লন্ডনি ভাষার ধরণটি আর নেই; উইনস্টন তখনই বুঝে ফেলল কিছুক্ষণ আগে টেলিস্ক্রিনে সে ঠিক কার কণ্ঠটি শুনেছিল। পুরোনো মখমলের জ্যাকেটটি তখনো পরে আছেন মি. চ্যারিংটন, কিন্তু তার চুল যা অনেকটা সাদাই ছিল তা এখন কালো। চোখে চশমাও নেই। উইনস্টনের দিকে এক ঝলক কড়া দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি, যেন সে-ই কিনা তা দেখে নিলেন, এরপর আর তার দিকে ফিরেও তাকালেন না। এখনো তাকে মি. চ্যারিংটন বলেই মনে হয়, কিন্তু তিনি আর সেই একই ব্যক্তিটি নন। তার টানটান শরীর, আর মনে হচ্ছে আরো বেশি লম্বা-চওড়া। মুখে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছিল তাতেই তাকে পুরোপুরি ভিন্ন মানুষ মনে হয়েছিল। কালো ভুরু যুগল এখন কম ঘন আর মুখের দাগগুলো নেই, মুখের সবগুলো দাগই বদলে দেওয়া হয়েছে, নাকটাও অপেক্ষাকৃত ছোট মনে হচ্ছে। এখন তাকে পয়ত্রিশের এক শীতল চেহারার মানুষই মনে হয়। উইনস্টনের মনে হলো, জীবনে এই প্রথম থট পুলিশের একজন সদস্যকে সে দেখল, যে মূলত জ্ঞানী।
৩য় খণ্ড – ভালোবাসা মন্ত্রণালয়
তৃতীয় খণ্ড
অধ্যায় ১
সে জানে না সে কোথায়। ধারণা করছে ভালোবাসা মন্ত্রণালয়ের ভেতরেই তার অবস্থান, কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার কোনো পথ নেই। মাথার ওপর উঁচু সিলিংয়ের জানালাবিহীন একটি কুঠুরি। সাদা সিরামিকের ঝকঝকে দেয়াল। কোথাও গোপন স্থানে বসানো বাতি থেকে একটি ঠাণ্ডা আলো এসে কক্ষটাকে ভরে রাখে সারাক্ষণ, আর টানা একটা ঝিম ধরা শব্দ কানে আসে। হতে পারে বায়ু আসার পথেই উৎপত্তি এই শব্দের। দেয়ালের চৌদিকটা ঘুরিয়ে পেতে রাখা একটি বেঞ্চ, কিংবা তাকিয়াও বলা চলে। পশ্চাৎদেশ পেতে দেয়ালে পিঠ দিয়ে সটান বসার জন্য যথেষ্টই চওড়া। প্রবেশপথ আর তার ঠিক উল্টোদিকে পায়খানার দরজার কাছে বেঞ্চিটি কাটা পড়েছে। পায়খানার প্যানে নেই কাঠের আসন। প্রতিটি দেয়ালে চারটি করে টেলিস্ক্রিন।
হালকা একটা পেটব্যথা চলছেই। সেই যখন ওরা তাকে বেঁধে বদ্ধ একটি ভ্যানে চড়িয়ে রওয়ানা দিল তখন থেকেই ব্যথাটা শুরু। তবে ক্ষুধাও পেয়েছে তার, যন্ত্রণাদায়ক ফালতু রকমের ক্ষুধা। শেষ খেয়েছে চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেছে হয়ত, নয়ত হতে পারে ছত্রিশ ঘণ্টাও। এখনও সে জানে না, হয়ত কখনোই জানতেও পারবে না, তার গ্রেফতার ঠিক কখন হয়েছিল সকালে, নাকি সন্ধ্যায়। তবে এটা জানে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে তার পেটে কোনো দানাপানি পড়েনি।
