অতীতের প্রভুর আচরণই তারা পাবে নতুন প্রভুর তরফে। খানিকটা বেশি সুবিধাপ্রাপ্ত, যাদের আমরা ‘প্রোল’ বলি, তারাই হচ্ছে একমাত্র যুদ্ধ সচেতন। প্রয়োজন হলে তারা ভয় আর ঘৃণার উন্মত্ততায় সামিল হতে পারে, আবার যখন তাদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন যুদ্ধ যে চলছে সে কথাটিই তারা দীর্ঘসময় ধরে ভুলে বসে থাকতে পারে। পার্টির উচ্চ পর্যায়ে, সর্বপোরি ইনার পার্টিতেই বাস্তব যুদ্ধ নিয়ে উৎসাহটা দেখা যায়। বিশ্বজয় কথাটিতে বিশ্বাস তাদের মধ্যেই সবচেয়ে দৃঢ়, আবার তারাই জানে এই জয় অসম্ভব। বৈপরীত্যের এই অদ্ভুত একীকরণ—জ্ঞানের সঙ্গে অবজ্ঞার, হতাশাবাদের সঙ্গে উগ্রবাদের—এটাই ওশেনীয় সমাজের অন্যতম প্রধান সাতন্ত্র্যচিহ্ন। আনুষ্ঠানিক আদর্শ অজস্র স্ববিরোধীতায় পূর্ণ, এমনকি যখন কোনো বাস্তবিক কারণ থাকে না তখনও। এভাবেই, পার্টি সমাজবাদী আন্দোলনের প্রতিটি নীতিকে প্রত্যাখ্যান ও পরিবাদ করে চলে, আর তা করে সমাজতন্ত্রেরই নামে। পার্টি শ্রমজীবী শ্রেণির বিরুদ্ধে এক ঘৃণার প্রচার ঘটিয়ে চলে যার উদাহরণ কয়েক শতক আগে মিলবেই না, আর এর সদস্যদের গায়ে চড়িয়ে দেয় বিশেষ উর্দি যা এক সময় গতরখাটা শ্রমিকদের কাছেও অদ্ভুত ঠেকত আর সে কারণেই ছিল এর পরিগ্রহণ।
প্রক্রিয়াগতভাবে পার্টি পরিবারের সৌহার্দ্যের ভিতকে দুর্বল করে দেয় আর এর প্রধানকে একটি নামে ডাকে যা পারিবারিক আনুগত্যের মনোভাবকেই সরাসরি তুলে ধরে। এমনকি আমাদের যে চারটি মন্ত্রণালয়, যার হাতে আমরা পরিচালিত, তার নামগুলোও কিন্তু বাস্তবের প্রতি তাদের ইচ্ছাকৃত উল্টোনীতি গ্রহণের ধৃষ্টতাকেই তুলে ধরে। শান্তি মন্ত্রণালয়ের কাজ যুদ্ধ নিয়ে, সত্য মন্ত্রণালয় মিথ্যাচারে সামিল, ভালোবাসা মন্ত্রণালয় চালাচ্ছে দমন-নির্যাতন আর প্রাচুর্য মন্ত্রণালয় ক্ষুধামন্দা টিকিয়ে রাখতে ব্যস্ত। এসব স্ব-বিরোধিতা দ্বৈবাৎ ঘটে যাওয়া কিছু নয়, নয় তা সাধারণ কিছু কপটতার ফলও, এসবই স্রেফ দ্বৈতচিন্তার ইচ্ছাচর্চা। আর এই যে স্ববিরোধিতার সামঞ্জস্যতা বিধান কেবল এই ভেবে যে, এতেই ক্ষমতা টিকে থাকবে অনির্দিষ্টকাল। আর কোনো পথে প্রাচীন চক্র ভাঙ্গা যাবে না। মানব সাম্য যদি চিরতরে ব্যাহত করতে হয়—যদি উচ্চশ্রেণিকে, যে নামে আমরা তাদের ডাকি, তাদের নিজ স্থানে স্থায়ী করতে হয়—তার জন্য বিরাজমান মননশীলতাকে বুদ্ধিভ্রংশে নিয়ন্ত্রণ করাই হবে সেরা কার্যকর পথ।
একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, যা এখন অবধি আমরা এড়িয়ে যাচ্ছি। প্রশ্নটি হচ্ছে—এই যে মানুষের সাম্যকে ব্যহত করার অব্যাহত প্রচেষ্টা, তা কেন? প্রক্রিয়ার বলবিদ্যার বর্ণনাও যখন হয়ে যায় ঠিক ঠিক, তখন এই যেকোন এক বিশেষ মুহূর্তে ইতিহাসকে হিমাগারে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যাপৃত প্রচেষ্টা, তাও কেন?
এখানেই আমরা পৌঁছে যাই গোপনীয়তার কেন্দ্রে। যেমনটা আমরা দেখছি, পার্টির, সর্বোপরি ইনার, পার্টির বোধাতীত শক্তি ভর করে আছে দ্বৈতচিন্তার প্রক্রিয়ায়। কিন্তু তারও গভীরে লুক্কায়িত রয়েছে আসল অভিসন্ধি, এক সহজাত প্রবর্তনা যা নিয়ে কখনোই প্রশ্ন তোলা হয় নি, যা প্রথমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে এরপর ফেলে দেয় দ্বৈতচিন্তার প্রক্রিয়ায়, চিন্তা পুলিশ, যুদ্ধ অবিরাম, আর টিকে থাকার অন্যসব প্রয়োজনীয় কলা-কৌশল নিয়ে আসতে থাকে। এই অভিসন্ধিতে বাস্তবেই রয়েছে…
নৈঃশব্দ্যেই সতর্ক হয়ে উঠল উইনস্টন, ঠিক যেভাবে একটি শব্দ কাউকে সতর্ক করে দেয়। তার মনে হলো কিছু সময় ধরে জুলিয়া পুরোই শক্ত হয়ে আছে। তার পাশেই শুয়ে আছে সে, কোমরের উপর থেকে অনাবৃত শরীর, হাতের বালিশে ঠেসে রাখা গাল, একটি কালচে দাগ তার দুচোখ ঘিরে রেখেছে। বক্ষদেশ ওঠানামা করছে ধীর-শান্ত লয়ে।
‘জুলিয়া’
কোনো সাড়া নেই।
‘জুলিয়া, জেগে আছো?’
সাড়া নেই। ঘুমিয়ে পড়েছে। উইনস্টন বইটি বন্ধ করল, সাবধানে মেঝের ওপর রাখল, শুয়ে পড়ল আর চাদরটি দুজনেরই গায়ের ওপর টেনে দিল।
তার মনে হলো, এখনো মূল গোপনীয়তাটি জানতে পারেনি। বুঝতে পারছে কিভাবে; কিন্তু এটা বুঝতে পারেনি, কেন। অধ্যায় তিনের মতো অধ্যায় একও তাকে সত্যিকার অর্থে এমন কিছুই বলতে পারেনি যা তার কাছে ছিল অজানা, এই অধ্যায়ও স্রেফ তার কিছু পূর্ব-অর্জিত জ্ঞানকে প্রক্রিয়াগত রূপ দিয়েছে। কিন্তু এটি পড়ে, অতীতের চেয়ে আরো ভালো করে বুঝতে পারল, তার মাথা খারাপ হয়ে যায়নি। সংখ্যা লঘু হয়ে, এমনকি স্রেফ একজনের সংখ্যালঘু হওয়ার পরেও সে পাগল হয়ে যায়নি। এখানে সত্য আছে, আছে অসত্যও, আর আপনি যদি গোটা বিশ্বের বিপরীতে দাঁড়িয়েও সত্যকে ধারণ করতে চান, আপনি পাগল হয়ে যাবেন না। অস্তগামী সূর্যের একটি হলুদ রশ্মি জানালার পথ ধরে সোজা বালিশের ওপর পড়েছে। চোখ বন্ধ করল সে। মুখমণ্ডলে আর গায়ের সঙ্গে লেপ্টে থাকা মেয়েটির শরীরে ছড়িয়ে পড়া সূর্যালোক তাকে শক্তি দিল, ঘুম এনে দিল, আরো দিল এক দৃঢ়তার অনুভূতি। সে নিরাপদে আছে, সবকিছুই আছে ঠিকঠাক। বিড়বিড় শব্দে, ‘সুস্থ বিচারবুদ্ধিতা অংক কষে বলার নয়’ একথা বলতে বলতে, আর এই কথায় যে রয়েছে গভীর বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ সে কথা ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
অধ্যায় ১০
দীর্ঘ ঘুম হয়েছে, ঘুম ভেঙ্গে এমন একটা অনুভূতিই হচ্ছিল তার। কিন্তু নজর পড়তেই পুরোনো আমলের ঘড়িটি বলে দিল রাত মোটে সাড়ে আটটা। মটকা মেরে আরো কিছুক্ষণ পড়ে থাকল সে; তখনই নিচের আঙ্গিনা থেকে ভেসে আসলো দরাজ গলায় গাওয়া গানের কলি:
নিষ্ফল এক অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়,
ফুরিয়ে গেল যেভাবে এপ্রিল ফুরোয়
কিন্তু সেই চাহনি, সেই শব্দ আর স্বপ্ন
হরণ করে নিয়ে যায় আমার হৃদয়।
