অতীতকে মুছে দেওয়াই ইংসকের মূল নীতি। অতীতের ঘটনার, যেমনটি বলা হয়, কোনো বস্তুগত অস্তিত্ব নেই, স্রেফ টিকে থাকে লিখিত নথিতে আর মানুষের স্মৃতিতে। অতএব, অতীত তাই যা নথিতে পাওয়া যায় কিংবা স্মৃতি স্বীকার করে নেয়। আর পার্টি যেহেতু সকল নথিপত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখে, আর একই সঙ্গে তার সদস্যদের মনেরও ওপরেও রয়েছে পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ, তাহলে বলাই যায় অতীত তাই, ঠিক যেভাবে পার্টি তা তৈরি করবে। এরই ধারাবাহিকতায় বলা যায়, অতীত পরিবর্তনযোগ্য হলেও, তা কখনোই কেবল কিছু নির্দিষ্ট ঘটনায় পাল্টাবে না। যখন তা নতুন করে সৃষ্টি হয়, তা যে কোনো আকারই পাক না কেন, তখন সেই নতুন আকারটিই হয়ে ওঠে অতীত, এর চেয়ে ভিন্ন কোনো অতীতের অস্তিত্ব কখনোই ছিল না।
এক বছরের মধ্যে যখন এই অতীতকে বারবার পাল্টাতে হয় তখনও প্রতিবারই একই কাজ করতে হয়। সর্বদাই ক্ষমতাসীন পার্টিই চূড়ান্ত সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, আর এটাও তো স্পষ্ট যে চূড়ান্ত কোনো কিছু আজ যা, তার চেয়ে ভিন্ন কিছু কোনো কালেই ছিল না। অতীতের ওপর নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে স্মৃতির ওপর শাসনে। এই সময়ের প্রথা ও রীতি পদ্ধতিতে সম্মতি রেখে সকল নথি লিখিত রাখা নিশ্চিত করার কাজটি স্রেফ যান্ত্রিক। কিন্তু এও মনে রাখতে হবে যে, যা কিছু ঘটেছে তা ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘটেছে। আর যদি কারো স্মৃতিকে পুনরায় সাজিয়ে নিতে হয়, অথবা লিখিত রেকর্ডের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয় তাহলে কেউ তা করলে অতীতকে স্রেফ ভুলে যেতে হবে। এর কৌশলটিও অন্য যেকোনো মানসিক কৌশলের মতোই শিখে নেওয়া সহজ। পার্টির অধিকাংশ সদস্যই বিষয়টি শিখে নিয়েছে, আর নিশ্চিতভাবে যারা বুদ্ধিমান ও একই সঙ্গে প্রথাপন্থি তারা তো শিখেছেই। পুরোনো ভাষায় একে বলে, সত্যি কথা বলতে কি এটাই আসলে, ‘বাস্তবতার নিয়ন্ত্রণ’। নিউস্পিকে এরই নাম দ্বৈতচিন্তা, যদিও দ্বৈতচিন্তার এর বাইরেও কিছু অর্থ রয়েছে।
দ্বৈতচিন্তা মানে কারো মনে একইসঙ্গে স্ববিরোধী দুটি বিশ্বাসকে ধারণ ও গ্রহণ। পার্টির একজন বোদ্ধা জানেন কোন পথে স্মৃতি পাল্টে দিতে হবে; আর তিনি এও জানেন যে, বাস্তবতার সাথে কৌশলী এক খেলা তিনি খেলছেন; আবার দ্বৈতচিন্তার চর্চায় তিনি নিজেকে সন্তুষ্ট করে রাখছেন এই ভেবে যে সত্যের কোনো লঙ্ঘন এখানে ঘটেনি। প্রক্রিয়াটি হতে হবে সচেতনতায়, কিন্তু পর্যাপ্ত শুদ্ধতায় নয়, আর যদি তা ঘটে যায় অসচেতনতায়ও, তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে থাকবে এক মিথ্যার অনুভূতি ও অপরাধবোধ। ইংসকের কেন্দ্রেই রয়েছে এই দ্বৈতচিন্তা। পার্টির অন্যতম প্রয়োজনীয় কাজটি হচ্ছে সচেতন প্রতারণা, কিন্তু সে প্রতারণার কাজটি হতে হবে চূড়ান্ত সততায়। সত্য বিশ্বাসে স্বেচ্ছা মিথ্যাচার করে যাওয়া, পীড়াদায়ক যে সত্য তা বেমালুম ভুলে যাওয়া, আর অতঃপর, যখন ফের হয়ে উঠবে দরকারি তখন বিস্মরণ থেকে তা তুলে আনা ঠিক যতক্ষণ প্রয়োজন ততক্ষণের জন্য, বস্তুগত বাস্তবতার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা, আর সারাক্ষণ অস্বীকৃত বাস্তবতার হিসাব কষে যাওয়া—এসবই অপরিহার্য আবশ্যিকতা। এমনকি দ্বৈতচিন্তা কথাটির ব্যবহারেও চলে দ্বৈতচিন্তার চর্চা। এই শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়েই যে কেউ স্বীকার করে নেয়, বাস্তবতার ব্যত্যয় ঘটছে; একটি আনকোরা দ্বৈতচিন্তার ঘটনা দিয়ে কেউ তার জ্ঞানকেই অস্বীকার করে; আর এভাবে অনির্দিষ্ট সময় ধরে মিথ্যায় ভর করে সে সত্যের সামনে সামনে দাবড়ে বেড়ায়। আর অবশেষে এই দ্বৈতচিন্তার মাধ্যমে দল ইতিহাসের গতিপথ আটকে রাখতে সক্ষম হয়, এবং আমরা সকলে যেমনটা জানি, হাজার বছর ধরে টিকে থাকে সে সক্ষমতা।
অতীতের সকল গোষ্ঠী শাসনের পতন হয়েছে হয় তাদের অতি কঠোর নীতির কারণে নয়ত ধীরে ধীরে নিজেই নাজুক হয়ে পড়ায়। হয় তারা নির্বোধ আক্রোশি হয়ে উঠে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবেলায় তাল হারিয়ে ফেলে নিক্ষিপ্ত হয়েছে; নয়ত নিজেরাই ধীরে ধীরে এমনই উদার এবং ভীত হয়ে উঠেছে যে যখন সৈন্য চালনা দরকার ছিল তখন সন্ধি করে বসেছে; আর অতঃপর কোনো এক নাজুক পরিস্থিতিতে নিক্ষিপ্ত হয়েছে ক্ষমতার বাইরে। তাদের এসব পতন বলা যায়, হয় সচেতনতায় নয়ত অসচেতনতায়। আর পার্টির সাফল্য হচ্ছে তারা চিন্তার এমন এক পদ্ধতি বানিয়েছে যাতে উভয় অবস্থাই একইসঙ্গে বিরাজ করতে পারে। এইটি ছাড়া আর কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ভিতই পার্টির আধিপত্যকে স্থায়ী করতে পারেনি। কেউ যখন শাসন করতে চায়, আর সে শাসন অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়, তাকে তখন বাস্তবতার ধারণাটিকেই বিক্ষিপ্ত করে দিতে হবে। শাসকের গোপন শক্তিই হচ্ছে, সে সকল ভুলের উর্ধ্বে এমন বিশ্বাস তৈরি করা এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া।
দ্বৈতচিন্তার যারা উদ্ভাবক, আর যারা জানে মানসিক প্রতারণার এ এক ব্যাপৃত ব্যবস্থা, তারাই যে দ্বৈতচিন্তার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চর্চাকারী তেমনটা বলা যাবে না। আমাদের সমাজে যারা কোথায় কী ঘটছে তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন তারা আসলে বিশ্বটি ঠিক যেমন, তেমনটি করে দেখেন না। সাধারণভাবে যে যত বেশি বুঝদার, মতিভ্রমও তার তত বেশি, যে যত বেশি বুদ্ধিমান, সে ততই কম প্রকৃতিস্থ। এই বাস্তবতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হচ্ছে—কেউ যখন সামাজিক মাপকাঠিতে উপরে ওঠে তার মধ্যে যুদ্ধের বাতিকও ততবেশি ভর করে। যুদ্ধের প্রতি যাদের মনোভাব যৌক্তিকতার অনেকটা কাছাকাছি তারা বিতর্কিত সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ। এই মানুষগুলোর কাছে যুদ্ধ স্রেফ এক অশেষ দুর্যোগ যা প্রায়শই তাদের শরীরের ওপর দিয়ে জলোচ্ছ্বাসের মতো বয়ে যায়। কোন দল জয়ী হলো তা তাদের কাছে পুরোপুরিই অপ্রয়োজনীয় একটি বিষয়। এরা সচেতনভাবেই জানে প্রভুত্বের পরিবর্তন মানেই হচ্ছে নতুন প্রভুর জন্য তাই করতে হবে যা আগের প্রভুর জন্যও তারা করেছে।
