এই অর্থহীন সঙ্গীত বুঝি তার জনপ্রিয়তা ধরেই রেখেছে। এখনো আপনি এখানে সেখানে শুনতে পাবেন। ঘৃণাগীতকেও ছাপিয়ে গেছে এই গান। গানের শব্দেই ঘুম ভাঙল জুলিয়ারও। লম্বা হাই তুলে মনের সুখে হাত পা ছুঁড়ে বিছানা ছাড়ল সে।
‘খিদে লেগেছে’—বলল সে। ‘চলো আরেকটু কফি বানাই। এই যা! স্টোভতো নিভে গেছে আর পানিও পুরো ঠাণ্ডা। ’ স্টোভটি তুলে ঝাকি দিল। ‘আরে এর তেলও তো ফুরিয়ে গেছে দেখছি!’
‘বুড়ো চ্যারিংটনের কাছ থেকে একটু ধার পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই, না কি?’
‘অদ্ভুত লাগছে, পুরো তেলভর্তি ছিল স্টোভটি! যাক কাপড় তো পরি’—বলেই চলল জুলিয়া। ‘মনে হচ্ছে একটু ঠাণ্ডা পড়েছে। ’
উইনস্টনও বিছানা ছাড়ল, আর কাপড় পরে নিল। নিচে শ্রান্তিহীন কণ্ঠ তখনও গেয়ে চলছে:
তারা বলেছিল সবই হবে ঠিক
বলেছিল, তুমিও ভুলে যাবে সব
কিন্তু যে হাসি আর কান্না কেঁদেছি এতটা বছর
আমার হৃদয় আজো বিদীর্ণ হয় তাতে…
জানালায় ঝুলিয়ে রাখা আলখেল্লার বেল্ট তুলে বাঁধল সে। বাড়িগুলোর ওপারে সূর্য হেলে পড়েছে, আঙ্গিনায় আর নেই ঝলকানো রোদ। পাথুরে মেঝেটা ভেজা, যেন কিছুক্ষণ আগেই ধুয়ে রাখা হয়েছে। তার মনে হলো, ধুয়ে দেওয়া হয়েছে যেন আকাশটাকেও। পরিচ্ছন্ন হালকা নীল আকাশটা চিমনিগুলোর মাঝ দিয়ে উঁকি মারছে। শ্রান্তিহীন অবিরাম যাওয়া আর আসার মাঝে নারীটি মুখে একবার ছিপি পরছে একবার খুলছে আর তাতে থেমে থেমে ভেসে আসছে গানের সুর, সাথে একের পর এক ডায়াপার ঝুলছে শুকোনোর রশিতে। উইনস্টনের মনে প্রশ্ন জাগে, ধোপার কাজেই কি জীবিকা এই নারীর? নাকি বিশ-ত্রিশটা নাতি-নাতনির কোনো সংসারের কৃতদাস সে? জুলিয়া এসে পাশে দাঁড়াল, দুজনই অনেকটা মুগ্ধ হয়ে নিচের শক্ত-সামর্থ নারীটির দিকে তাকিয়ে। মহিলাটির চারিত্রিক ধরন ধারণ, মোটা বাহুদ্বয়ের ওঠানামা, মাদী ঘোড়ার মতো শক্ত-নধর নিতম্বদ্বয়ের বল্লরী দেখতে দেখতে প্রথমবারের মতো তার মনে হলো, বেশ তো সুন্দরী এই নারী! সন্তান জন্ম দিয়ে দিয়ে ফুলে যাওয়া বিশাল বপু কাজ আর শ্রমে শক্ত সুঠাম হয়ে বুড়ো শালগমে রূপ নেওয়া পঞ্চাশোর্ধ এক নারীকে সুন্দরী মনে করার মতো ঘটনাটিও তার জীবনে প্রথমই ঘটল। কিন্তু ব্যাপারটা এমনই, অন্তত তার মন তাই-ই বলছে। আর কেনই নয়? গ্রানাইটের মতো পেটানো শরীর, আঁচড়কাটা লাল ত্বক মিলিয়ে যেন তরুণীর দেহ বল্লরীই তুলছে সে। গোলাপের গাছে তো গোলাপের ফলও ধরে। ফুলের চেয়ে ফলকে কেনই ছোট করে দেখা?
‘নারীটি সুন্দরী’—অস্ফুট শব্দে উচ্চারণ তার।
‘নিতম্বের ঘের এক মিটার হবে, আমার বিশ্বাস’—বলল জুলিয়া।
‘ওতেই সৌন্দর্যটা ফুটে উঠেছে’—বলল উইনস্টন।
জুলিয়ার কোমল কটিদেশ দুবাহুতে জড়াল সে। নিতম্ব থেকে হাঁটু অবধি তারও বেশ মাংসল। কোনো সন্তান জন্ম নেবে না তাদের এই সব মিলন থেকে। এই একটি কাজ তারা কখনোই করতে পারবে না। কেবল মুখের বুলি আওড়িয়ে, মন দেওয়া নেওয়া করে, গোপন ইচ্ছাটি বাঁচিয়ে রেখে সময় পার করে দেবে তারা। নিচে কর্মরত ওই নারীর কোনো মন নেই, তার কেবল আছে দুই শক্ত-সামর্থ্য বাহু, উষ্ণতায় ভরা হৃদয়, আর অতি উর্বরা এক গর্ভ। তার কৌতূহল হলো জানার, ক’টি সন্তানের জন্ম দিয়েছে এই নারী! খুব সহজেই বলে ফেলা যায় অন্তত পনেরটি।
আশা যদি কিছু থেকে থাকে তা ওই প্রোলদের মাঝেই প্রোথিত!
তারও ছিল ক্ষণকালের ফুটন্ত সময়, হতে পারে বছর খানেক বন্য গোলাপের মতোই ফুটেছিল সে, এরপর হঠাৎ তার ফুলে পড়েছে পরাগ রেণু তাতে ফল এসেছে, এরপর ধীরে ধীরে দেহখানি হয়ে উঠেছে আরো শক্ত, লাল আর মোটা, এরপর তার জীবন জড়িয়ে গেছে ধোলাই, সারাই, সেলাই, রান্নাবান্না আর ঝাড়ামোছার কাজে, প্রথমে নিজের সন্তানদের জন্য পরে নাতি-নাতনীদের জন্য টানা ত্রিশটি বছর, অবিরাম। আর এত কিছুর পরেও সে এখনো গান করেই চলেছে। নারীটির জন্য রহস্যময় এক শ্রদ্ধাবোধ সে অনুভব করল, যা মিশে একাকার হয়ে গেল চিমনির পাত্রগুলোর পেছনে অসীম দূরত্বে ক্রমেই প্রলম্বিত হয়ে পড়া ফ্যাকাশে মেঘহীন আকাশের পথে। এবার তার ভাবনায় এলো—সবার জন্যই আকাশটি এক, ইউরেশিয়া কিংবা ইস্টেশিয়ার আকাশও ঠিক একই রকম যেমনটি এখানে এই ওশেনিয়ায়। আর এই আকাশের নিচের মানুষগুলোও একই রকম—সর্বত্র, সারা বিশ্বে, শত কোটি মানুষ ঠিক এমনই, এভাবেই তারা একে অন্যের অস্তিত্বের বিষয়েও অজ্ঞ, ঘৃণা আর মিথ্যার দেয়াল দিয়ে তারা বিচ্ছিন্ন, আর সর্বত্রই একই রকম—মানুষ কখনোই ভাবতে শেখেনি, কিন্তু তারা তাদের হৃদয়ে, পেটে আর পেশিতে পুঞ্জিভূত শক্তি ধারণ করে চলেছে যা একদিন গোটা বিশ্বটিকেই উল্টে দেবে। আশা যদি কিছু থেকে থাকে তা ওই প্রোলদের মাঝেই প্রোথিত!
এই বইটির শেষাবধি না পড়েই সে জেনে গেছে, এটাই হতে চলেছে গোল্ডস্টেইনের চূড়ান্ত বাণী। ভবিষ্যতের মালিক এই প্রোলরা। আর সে কতটাই বা নিশ্চিত করে বলতে পারে, যখন তাদের সময় আসবে তখন এই যে পার্টির বিশ্ব হিসেবে যে বিশ্ব তারা গড়েছে তাতে সে, উইনস্টন স্মিথ, নিজেই হয়ে উঠবে না এক ভিন গ্রহের মানুষ? হ্যাঁ, তাই হবে কারণ একদিন এই বিশ্ব যাবে সুস্থ মানসিকতার মানুষদের দখলে। যেখানে সাম্য সেখানেই সুস্থতা। খুব দ্রুত কিংবা আরও পরে একদিন সেটাই ঘটবে, শক্তি পরিবর্তিত হবে সচেতনতায়। প্রোলরা অবিনশ্বর, আঙ্গিনায় ওই বলশালী তনুখানি একবার যে দেখবে তার আর এ কথা অস্বীকার করার জো থাকবে না। একদিন অবশেষ তারা জেগে উঠবে। আর যতদিন না সেটা ঘটবে, হতে পারে হাজার হাজার বছর লেগে যাবে, তারা সকল জঞ্জালের বিরুদ্ধে পাখিদের মতো সারাবেলা জেগে থাকবে, শরীর থেকে শরীরে পার করে দেবে সেই সচেতনতার শক্তি যা পার্টি কখনোই করেনি আর যে শক্তিকে পার্টি মেরে ফেলতেও পারেনি।
