তবু একটা সংশয় আমার মন থেকে যাচ্ছে না। হয়ত সম্পূর্ণ মৃত্যু হবে না আমার। আমার দেহাবসানের সঙ্গে সঙ্গে ঈশ্বরপ্রদত্ত আত্মার মৃত্যু হবে না। হয়ত সমাধিগহ্বরের ভিতরে অথবা অন্য কোন ভয়াবহ স্থানে আমাকে এক জীবন্ত মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করে যেতে হবে।
একথা ভাবতেও ভয় লাগে। কিন্তু কেন? পাপ যা করেছে তা তো আমার জীবনচৈতন্য, আমার দেহ তো কিছু করেনি। তবু আমার দেহ এবং জীবনচৈতন্য কেন একই সঙ্গে বিনষ্ট হবে? তবু আর সংশয় নয়, মানুষের জ্ঞান এর থেকে বেশি কিছু জানতে পারে না।
ঈশ্বর অনন্ত, অমর। কিন্তু তাঁর রোষও কি অনন্ত, অমর? কিন্তু মানুষ মরণশীল। মৃত্যুই তার শেষ পরিণতি। মানুষের জীবন যদি অনন্ত না হয়, তাহলে সেই মরণশীল মানুষের উপর ঈশ্বর কি করে তাঁর অনন্ত রোষ আরোপ করে যাবেন? তবে কি তিনি মৃত্যুহীন মৃত্যু ঘটাতে পারেন? এই আশ্চর্যজনক বৈপরীত্য এই অসম্ভব ব্যাপারের সংঘটন একমাত্র সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের দ্বারাই সম্ভব। আমাদের মত দুর্বল মানুষের পক্ষে তা বোঝা বা সে রহস্য ভেদ করার শক্তি নেই।
তবে কি তিনি ক্রোধের খাতিরে শান্ত মানুষকে অনন্ত করে তুলবেন? তাঁর অতৃপ্ত রোষাবেগকে তৃপ্ত করার জন্য মানুষের উপর আরোপিত শাস্তির কঠোরতাকে অনন্তপ্রসারিত করে তুলবেন? সে রোষাবেগ কি কখনো তৃপ্ত হবে না? যে প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে প্রকৃতিজগতের সকল বস্তু কার্যকারণতত্ত্বের অধীন হয়ে কাজ করে, তিনি কি তার দণ্ডাদেশকে সেই নিয়মের উর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করতে চান?
কিন্তু আমি যা ভেবেছিলাম, মৃত্যুর আঘাত কি আমার উপর অকস্মাৎ নেমে এসে একমুহূর্তের মধ্যে সবকিছুর শেষ করে দেবে না? তা না হয়ে সে মৃত্যুর চিরস্থায়ী যন্ত্রণা আজ থেকে অনন্তকাল ধরে প্রসারিত হবে? হায়, এই ভয় এক ভয়াবহ আবর্তনে এক জ্বলন্ত বজ্রাগ্নির মত বারবার আনাগোনা করছে আমার অসহায় মস্তিষ্কের মধ্যে। মনে হচ্ছে মৃত্যু এবং আমি দুজনেই অনন্ত এবং আমরা দুজনে অঙ্গাঙ্গী ও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। আমি একা নই, আমার মধ্য দিয়ে আমার সমস্ত ভবিষ্যৎ বংশধরেরাও অভিশপ্ত হবে।
হে আমার বংশধরগণ, যদি পারতাম, আমি নিজে সব শাস্তি সব অভিশাপের বোঝা বয়ে বয়ে নিজেকে ক্ষয় করে তোমাদের এক বিশুদ্ধ সুন্দর পিতৃত্ব দান করে যেতাম। কারণ তোমরা অভিশাপগ্রস্ত হয়ে আর আমাকে কোন আশীর্বাদ করতে পারবে না, কোন শ্রদ্ধা জানাতে পারবে না।
কিন্তু মাত্র একটি মানুষের জন্য কেন সমগ্র মানবজাতি কোন দোষ না করেই অভিশপ্ত হবে? আমার থেকে দুর্নীতি, পাপ আর কামনার কলুষ ছাড়া আর কি উৎপন্ন হতে পারে? সেই কলুষ নিয়ে কেমন করে তারা ঈশ্বরের রোষ হতে মুক্ত হয়ে দাঁড়াবে তার সামনে?
আমার সকল প্রতিবাদ ও ক্ষুব্ধ গুঞ্জন সত্ত্বেও আমি ঈশ্বরের উপর আর কোন দোষারোপ করি না। আমার সকল যুক্তি সকল অনুসন্ধান বিভিন্ন পথ ঘুরে শেষে আমার দোষকেই সাব্যস্ত করছে। আমাকে সকল দোষ ও দুর্নীতির উৎস হিসাবে সপ্রমাণিত করছে। সুতরাং ঈশ্বরের রোষ ও তার শাস্তিবিধান ন্যায়সংগত।
হে আমার কামনা, তুমি কি ঐ পৃথিবীর থেকে ভারী এই শাস্তির বোঝা দুষ্টা নারীর সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে বহন করে যেতে পারবে? তুমি যাই ইচ্ছা করো বা ভয় করো, পরিত্রাণের সকল আশাই তাতে বিনষ্ট হবে। তোমার দুঃখভোগ অতীত ও ভবিষ্যতের সকল দৃষ্টান্তকে ছাড়িয়ে যাবে। অপরাধ ও শাস্তির দিক থেকে তা একমাত্র শুধু শয়তানের দুঃখের সঙ্গে তুলনীয়।
হে আমার বিবেক, কোন বিভীষিকাময় গহ্বরের অতল অন্ধকারে নিক্ষেপ করেছ আমাকে যেখান থেকে আমি মুক্তির কোন পথ খুঁজে পাচ্ছি না? শুধু গভীর থেকে গভীরতর স্তরে নিমজ্জিত হচ্ছি আমি।
এইভাবে আদম সেই নির্জন নিস্তব্ধ রাত্রিতে আপন মনে উচ্চকণ্ঠে আত্মবিলাপ করল। তার পতনের আগে পর্যন্ত রাত্রি শান্ত ছিল। বাতাস ছিল মৃদুমন্দ। কিন্তু আজ হিমশীতল এলোমেলো বাতাস বইতে লাগল। তার বিবেক কলুষিত হয়ে পড়ায় এক সংশয়ান্বিত আশঙ্কা রাত্রির অন্ধকার ও প্রকৃতির সব বস্তুকে দ্বিগুণ ভয়ঙ্কর করে তুলেছিল তার কাছে। হিমশীতল মাটির উপর সে তার দেহটাকে প্রসারিত করে শুয়ে পড়ল। সে তার জন্মকে অভিশাপ দিতে লাগল। তার পাপকর্মের শাস্তিস্বরূপ যে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয় সে মৃত্যুদণ্ড এখনো পর্যন্ত কার্যকরি না হওয়ায় মনে মনে অনুযোগ করে আসছিল সে।
সে বলল, একটিমাত্র আঘাতে তার জীবনের অবসান ঘটানোর জন্য মৃত্যু কেন আসছে না? সত্য কি তার কথা রাখতে ব্যর্থ হবে? ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার কেন তার সার্থকতাকে প্রতিপন্ন করছে না?
কিন্তু মৃত্যু আসছে না কেন? শত প্রার্থনা ও ক্রন্দন সত্ত্বেও ঐশ্বরিক ন্যায়বিচার তার মন্দগতিকে দ্রুত করছে না। হে বনভূমি, ঝর্ণা, পাহাড়, উপত্যকা ও কুঞ্জবন, তোমরা আগে অন্য এক সঙ্গীতের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত করতে।
আদমকে এইভাবে দুঃখে আর্ত দেখে ঈভ অন্য এক নির্জন জায়গায় বসে থাকতে থাকতে তার কাছে উঠে এসে শান্তমেদুর কণ্ঠে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল।
কিন্তু আদম কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করল তার আবেদন। সে তীক্ষ্ণকণ্ঠে বলল, আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যাও নাগিনী, তুমি সাপের সঙ্গে একদিন বন্ধুত্ব করেছিলে, সুতরাং এই নামই তোমার যোগ্য। সাপের মতোই তুমি মিথ্যাচারী ও ঘৃণ্য। সাপের মত তোমার আকৃতি এবং গায়ের রং। তোমার অন্তর্নিহিত প্রতারণামূলক কুটিল প্রকৃতিকে প্রকটিত করে অন্যান্য প্রাণীদের কাছ থেকে দূরে সরে যাবার জন্য সতর্ক করে দেয়।
