অহঙ্কার আর আত্মম্ভরিতার বশবর্তী হয়ে যদি তুমি আমার সতর্কবাণী প্রত্যাখ্যান না করতে তাহলে আমি সুখেই জীবনযাপন করতাম। আমার উপর থেকে সব আস্থা ঘৃণাভরে প্রত্যাহার করে শয়তানের হাতে সহজে ধরা দেবার জন্য চলে যাও তুমি। তারপর সেই সর্পরূপী শয়তানের সঙ্গে দেখা হওয়ায় নির্বোধের মত তার ছলনায় ধরা দাও তুমি এবং তোমার ছলনায় আমি ভুলে যাই। তোমাকে বিজ্ঞ ভেবে তোমার কথায় বিশ্বাস করি আমি। ভাবি তুমি এমন সব পরিণত ও নির্ভরযোগ্য গুণরাজির দ্বারা ভূষিত যার দ্বারা বাইরের যে কোন প্রলোভনাত্মক আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারবে।
কিন্তু তখন ভাবতে পারিনি তোমার ঐ সব গুণ এক ভ্রান্ত বহিরাবরণ মাত্র যার মধ্যে নির্ভরযোগ্য কোন দৃঢ়তা নেই। এখন বুঝতে পারছি আমার বক্ষদেশ হতে নিষ্কাশিত এক বক্রকুটিল পাঁজরা ছাড়া তুমি আর কিছুই নও।
যিনি পরম প্রভাসম্পন্ন পরম স্রষ্টা, যিনি যত সব পুরুষ দেবদূতদের সবচেয়ে ঊর্ধ্বে, স্বর্গলোকে বিরাজ করেন, তিনি কেন প্রকৃতির এক সুন্দর অথচ বিকৃত রূপ হিসাবে পৃথিবীতে এই নারীকে সৃষ্টি করলেন? কেন তিনি পৃথিবীকে সম্পূর্ণরূপে নারীবর্জিত করে শুধু পুরুষ দেবদূতদের দ্বারা তা পূর্ণ করলেন না? কেন তিনি মানবজাতির জন্মের অন্য কোন উপায় উদ্ভাবন করলেন না?
তাহলে এই ক্ষতিকারক অঘটন সংঘটিত হত না! শুধু তাই নয়। ভবিষ্যতে পৃথিবীর ছলনাময়ী নারীর পাতা ফাঁদে ধরা পড়ে কত পুরুষের জীবন বিষময় হয়ে উঠবে, কত বিপত্তি সংঘটিত হবে। হয় পুরুষ তার যোগ্য নারীকে জীবনসঙ্গিনী হিসাবে খুঁজে . পাবে না অথবা ভুল করে যাকে নির্বাচন করবে, সে তার জীবনে নিয়ে আসবে দুঃখ অথবা দুর্ভাগ্যের পশরা। অথবা যে নারীর দ্বারা অনেক কিছু পেতে চাইবে সে যে নারীর অসততা ও অবিশ্বস্ততার জন্য কোন লাভই হবে না, বরং সমূহ ক্ষতি হবে তার। আবার যদি কোন নারী তাকে ভালবাসে অথচ তাদের পিতামাতা সে ভালবাসাকে অনুমোদন না করে অথবা যদি কোন হীন নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবার পর অনেক দেরিতে সে তার পছন্দমত প্রেয়সীকে খুঁজে পায় তাহলে অন্তহীন ঘৃণা আর লজ্জা তার জীবনকে বিষময় করে তুলবে, তার পারিবারিক শান্তি বিনষ্ট হবে সমূলে।
আর কিছু না বলে মুখ ফিরিয়ে নিল আদম। ঈভ তবু চলে গেল না। তার চোখ দিয়ে তখনো ঝরে পড়ছিল অবিরল অশ্রুর ধারা, চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল আলুলায়িত কেশপাশ। এই অবস্থায় সে আদমের পায়ের উপর পড়ে তার পা দুটোকে জড়িয়ে ধরে তাকে শান্ত হবার জন্য অনুনয়-বিনয় করতে লাগল।
ঈভ বলল, আমাকে এইভাবে পরিত্যাগ করো না আদম। ঈশ্বর জানেন কত ভালবাসা, কত শ্রদ্ধা-নিষ্ঠার সঙ্গে আমার অন্তরে পোষণ করে আসছি আমি তোমার প্রতি। আমি না জেনেই এই পাপকর্ম করে ফেলেছি। আমি অন্যের দ্বারা সম্পূর্ণ প্রতারিত হয়েছি। আমি পা ধরে ক্ষমা চাইছি তোমার। আমার এই বাসস্থান থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করো না। এই দুঃখ ও দুরবস্থার মধ্যে তোমার চোখের দৃষ্টি, তোমার সাহায্য, তোমার পরামর্শই আমার একমাত্র সান্ত্বনা এবং আশ্রয়। তুমি না থাকলে তোমাকে ছাড়া কোথায় আমি যাব, কোথায় গিয়ে বেঁচে থাকব? আর যতক্ষণ আমরা বেঁচে থাকি, দুজনে একসঙ্গে শান্তিতে থাকাই ভাল। আমাদের পাপের শাস্তিস্বরূপ দুজনে যে একই দণ্ড লাভ করেছি, সেই দণ্ডজনিত এই দুরবস্থায় আমরা মিলিতভাবে থাকলে অনেক দুঃখের লাঘব হবে।
সেই নিষ্ঠুর সর্প এখন তো আর তোমার ঘৃণার গরল ঢেলে দিচ্ছে না আমার ওই দুঃখের উপরে। আমি তোমার থেকে অনেক দুঃখী। আমরা দুজনেই পাপ করেছি ঠিক, কিন্তু তুমি শুধু ঈশ্বরের বিরুদ্ধে পাপ করেছ কিন্তু আমি ঈশ্বর এবং তোমার এই উভয়ের বিরুদ্ধে পাপ করেছি।
এরপর যখন শেষ বিচারের দিন ঈশ্বরের কাছে যাব তখন হয়ত দেখা যাবে তার বিচারে সব দোষ আমার উপর পড়বে এবং তোমার উপর থেকে এই শাস্তির বোঝা নেমে এসে আমার উপর চাপবে। কারণ এই দুঃখ ও অভিশাপের মূল কারণ আমি। সুতরাং একমাত্র আমিই তার রোষের বস্তু।
ঈভ কাঁদতে কাঁদতে তার সব কথা শেষ করল। সেই পাপকর্মের অনুষ্ঠানের পর তার এই শোচনীয় অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। তার প্রতি আদমের কঠোর ব্যবহার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে তার দুঃখকে।
এখন ঈভের অবস্থা দেখে তার দুঃখে কাতর হলো আদম। তার অন্তর কিছুটা নরম হলো। সে দেখল, যে ছিল একদিন তার জীবনের আনন্দ, তার প্রাণপ্রতিমা, সে আজ চরম দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থায় তার পায়ে পড়ে বারবার ক্ষমা চাইছে। পুনর্মিলন চাইছে তার কাছে। আজ সে তার সাহায্য চায়, তার স্পর্শ চায়। কিছু আগে সে ঈভের ব্যবহারে দারুণ অসন্তুষ্ট হলেও এখন তার সব রাগ দূরীভূত হয়ে গেল।
তাই আদম এবার শান্তকণ্ঠে বলতে লাগল, তুমি আমারই রোষ ও অসন্তোষ যখন বহন করতে পারছ না তখন ঈশ্বরের সমস্ত রোষ তুমি একা তোমার মাথায় তো বহন করতে পারবে না। যদি প্রার্থনার কোন দাম থাকে তাহলে আমি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করব তিনি যেন তোমার মত এক দুর্বল নারীকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দিয়ে আমার উপর চাপিয়ে দেন সব শাস্তির বোঝা।
যাই হোক, এখন ওঠ, আর ঝগড়া-বিবাদ করে লাভ নেই পরস্পরে। পরস্পরকে দোষ দিয়েও কোন লাভ নেই। এখন আমরা কিভাবে পরস্পরের দুঃখ ভাগ করে নিয়ে সেই দুঃখের বোঝাভার লঘু করে তুলতে পারি তার চেষ্টা করতে হবে। হায়, যেদিন মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয় সেদিন যদি জানতাম এ মৃত্যু শীঘ্র আসবে না, সে মৃত্যুযন্ত্রণা তিলে তিলে দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ও আমাদের হতভাগ্য বংশধরদের সহ্য করে যেতে হবে।
