এইভাবে পৃথিবীর জড়বস্তু ও প্রকৃতির উপাদানগুলি বিক্ষোভে ও বিশৃংখলায় ফেটে পড়তে লাগল। তারপর পাপের তৎপরতায় প্রাণীজগতের মধ্যে অনৈক্য ও তীব্র বিরোধিতা শুরু হলো। বিভিন্ন পশু ও মৎসকুলের মধ্যে শুরু হলো অন্তর্দ্বন্দ্ব। তারা নিজেদের স্বজাতিকেই খেতে লাগল। মানুষকে তারা খুব একটা ভয় করত না। মানুষের কাছ থেকে তারা দূরে থাকলেও মানুষকে তাদের পাশ দিয়ে যেতে দেখলে হিংসায় গর্জন করত।
আদম এক অন্ধকার বনপ্রদেশের নিভৃতে লুকিয়ে থাকলেও এইব ক্রমবর্ধমান দুঃখের অভিজ্ঞতা সে লাভ করতে থাকে। বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের মত আলোড়িত হতে থাকে তার অন্তর।
তার ভারী অন্তরটাকে হালকা করার জন্য সে অভিযোগের ভঙ্গিতে বলতে থাকে, হে দুঃখী, তোমার সব দুঃখের শেষ। এই কি সেই গৌরবময় জগতের শেষ পরিণতি? সমস্ত গৌরবের অবসানে আজ আমি কতই না অভিশপ্ত। যে ঈশ্বরের মুখদর্শন করাই ছিল আমার জীবনের পরম সুখ আজ সে মুখদর্শনের ভয়ে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি আমি। যদি এই দুঃখের এখানেই শেষ হয় তাহলেও ভাল। এই দুঃখ এবং শাস্তির যোগ্য ছিলাম আমি এবং আমি তা সহ্য করেছি। যে দুঃখ পাওয়ার আমি যোগ্য, সে দুঃখের যদি এখানেই অবসান হয় তাহলেই ভাল। কিন্তু অত সহজে সে দুঃখের অবসান হবে না। আমি যা কিছু খাই বা পান করি এবং আমার থেকে যে সব সন্তান উৎপন্ন হবে তাদের দ্বারা শুধু আমার অভিশাপ বিস্তার লাভ করবে।
‘সন্তান উৎপাদনের দ্বারা তোমাদের সংখ্যাবৃদ্ধি করো’–একথা আগে শুনলে আমি আনন্দ পেতাম, কিন্তু এখন একথা মৃত্যুর মতো শোনায়। কারণ আমাদের সংখ্যাবৃদ্ধি মানেই আমার মাথার উপর অভিশাপের বোঝাটা বাড়ানো। সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আরো ভারী হয়ে উঠবে সে অভিশাপের বোঝাটা। আমার ভবিষ্যতের বংশধর বা উত্তরসূরীর সবাই এ পৃথিবীতে যারা আসবে আমার দ্বারা আনীত দুঃখ তাদেরও ভোগ করে যেতে হবে এবং তার জন্য আমাকে তারাও অভিশাপ দেবে।
তারা বলবে, ‘আমাদের পূর্বপুরুষ বা আদিপুরুষ অপবিত্র, কলুষিত, আমরা শুধু আদমকে এই ধন্যবাদটুকুই দিতে পারি।’ ফলে আমার নিজস্ব দুঃখের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিদ্রূপ ও কটুক্তিজনিত দুঃখ অনেকগুণ বেড়ে ফিরে আসবে আমার কাছে।
‘হে পলাতক আদম, কত ক্ষণভঙ্গুর তুমি! তুমি যেতে না যেতেই স্থায়ী দুঃখ এসে তোমার স্থান দখল করল।’ আমি কি স্রষ্টার কাছে মাটি থেকে এই দুঃখভোগের জন্যই আমাকে সৃষ্টি করতে অনুরোধ করেছিলাম? অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে এসে এই মনোহর স্বর্গোদ্যানে আমাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কি প্রার্থনা করেছিলাম আমি?
আমার জন্মের ব্যাপারে আমার ইচ্ছার যদি কোন ভূমিকা না থাকে, আমি যদি আমার জন্মের জন্য আমার স্রষ্টাকে কোন অনুরোধ করে না থাকি, স্রষ্টা যদি নিজের ইচ্ছায় আমাকে সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে কেন তিনি আমাকে মানুষ হিসাবে সৃষ্টি না করে এক জড়বস্তু হিসাবে সৃষ্টি করলেন না; যার নিজস্ব ইচ্ছা বা মন বলে কোন জিনিস নেই, যা ঈশ্বরের বিধানের কাছে সতত সমর্পিতপ্রাণ? কিন্তু আমি মানুষ হিসাবে আমার ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের জন্য ঈশ্বরের সব বিধান মেনে নিতে পারিনি। আর তার ফলে অন্তহীন অভিশাপ ও শাস্তিভোগ করে যেতে হচ্ছে। কিন্তু আমি যদি মাটি বা কোন জড়বস্তু হয়ে জন্মাতাম তাহলে আমাকে এই দুঃখ ভোগ করতে হত না।
এই শাস্তিভোগের সঙ্গে হে ঈশ্বর, তুমি আবার এই অনন্ত দুঃখভোগ যুক্ত করেছ। দুর্বোধ্য মনে হচ্ছে তোমার এই ন্যায়বিচার। কিন্তু এ প্রতিবাদ বড় বিলম্বিত হয়ে গেল। ঈশ্বর যখন সেই বিধান আরোপ করেন আমার উপর তখনি তার প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। ঈশ্বরের কাছ থেকে সব দানগুলি নিয়ে তার বিধানলঙঘনজনিত এই দুরবস্থার জন্য অনুশোচনা করা বৃথা।
তাছাড়া ঈশ্বর আমার অনুমতি না নিয়েই আমাকে সৃষ্টি করেছেন বলে যদি অনুযোগ করি তাহলে আমার সন্তানরাও আমার অবাধ্য হয়ে আমাকে তিরস্কার করে বলতে পারে, আমাদের জন্ম দিয়েছিলে? আমরা এ জন্ম চাইনি।
তাদের সেই ঘৃণামিশ্রিত উদ্ধত অভিযোগ কি তুমি মেনে নিতে পারবে? অথচ তুমি তাদের নির্বাচন করে ইচ্ছা করে জন্ম দেবে না, প্রকৃতির বিধানে স্বাভাবিকভাবেই তাদের জন্ম হবে। ঈশ্বর তোমাকে তাঁর সেবা করার জন্যই নির্বাচন করে জন্মদান করেছেন। এই সেবাদ্বারা তার তুষ্টিবিধান করলে পুরস্কার হিসাবে তার মহিমার কিছুটা লাভ করতে। কিন্তু তা করনি। সুতরাং তার প্রচণ্ড শাস্তি ন্যায়সংগত। তাই হোক, আমি তার ন্যায়সংগত দণ্ড মাথা পেতে ভোগ করে যাব। মাটি থেকে উদ্ভূত হয়ে আমি মাটিতেই ফিরে যাব শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
কিন্তু আজ তিনি যে দণ্ডের বিধান দিয়েছেন তা কার্যকরী হতে এত বিলম্ব হচ্ছে কেন? কেন আমি এখনো বেঁচে আছি? কেন মৃত্যু আমার সঙ্গে ছলনা করে মৃত্যুযন্ত্রণা এত দীর্ঘায়িত করছে? কত আনন্দের সঙ্গে আমি মৃত্যুদণ্ড লাভ করে অচেতন জড়বস্তু হয়ে মাতৃক্রোড়ে শিশুর মত মাটির বুকে ঘুমিয়ে পড়ব। সেখানে আমি অনন্ত নিদ্রায় অভিভূত হয়ে চিরবিশ্রাম লাভ করব। তার ভয়ঙ্কর কণ্ঠস্বর বজ্রগর্জনের মত আমার কানে আর ধ্বনিত হবে না। আমার বা আমার সন্তানদের উপর আরোপিত কোন ভয়ঙ্কর শাস্তির ভয়াবহ প্রতীক্ষায় দিনযাপন করতে হবে না।
