পাপ এই সময় মৃত্যুকে বলল, হে সর্বজয়ী মৃত্যু, শয়তানের দ্বিতীয় সন্তান, আমাদের নবলব্ধ সাম্রাজ্য সম্বন্ধে তুমি কি মনে করো? বহু কষ্টে অর্জিত হয়েছে এই সাম্রাজ্য। আমার মতে এর আগে আমরা যে নরকদ্বারে প্রহারায় নিযুক্ত ছিলাম সেখানে আমরা অগৌরবের সঙ্গে অর্ধবুভুক্ষু অবস্থায় থাকলেও আমরা সেখানে নির্ভয়ে ছিলাম। সে জায়গা থেকে এ জায়গা মোটেই ভাল মনে হচ্ছে না।
পাপ এই কথা বললে পাপসঞ্জাত মৃত্যু তখন উত্তর করল, যে আমি অনন্ত ক্ষুধার জ্বালায় সতত পীড়িত তার কাছে নরক, মর্ত্য ও স্বর্গ সবই সমান। আমার কাছে সেটাই হলো উত্তম স্থান যেখানে আমি আমার সবচেয়ে বেশি খোরাক পাই, যেখানে অনেক অন্ধকার গুহা পাওয়া যায়। এখানকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অনেক সেরকম গুহা থাকলেও আমার উদরপূর্তির উপযুক্ত খাদ্যবস্তু কম। নেই বললেও চলে। এখানকার জনমানবহীন বিস্তীর্ণ সব অঞ্চল প্রাণহীন অবস্থায় পড়ে আছে।
তখন ব্যভিচারিণী মাতা পাপ বলল, তাই তুমি প্রথমে এখানকার গাছপালা, ফুল, ফল খাও, তারপর জীবজন্তু, মাছ, পক্ষীদের ভক্ষণ করবে, হয়ত মানুষ পাবে না। কালের আঘাতে যাদেরই ধ্বংস হবে, যাদেরই কাল পূর্ণ হবে, নির্বিচারে গ্রাস করবে তাদের।
এদিকে আমি চিরকাল মানবজাতির মধ্যে থেকে তাদের সকল কর্ম, চিন্তা, কথা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত ও কলুষিত করে ধীরে ধীরে তোমার শিকারে পরিণত করে তুলব তাদের।
এই বলে কয়েকটি পথ ঘুরে বেড়াল তারা। সবকিছুকে ধ্বংস করে ধ্বংস ও মৃত্যুর শিকারের বস্তুতে পরিণত করতে চাইল তারা। সর্বশক্তিমান ঈশ্বর তার ঊর্ধ্বলোকের আসন থেকে সাধু আত্মাদের সঙ্গে এইসব দেখে বললেন, ঐ দেখ যে জগৎকে আমি কত ভাল ও সুন্দর করে সৃষ্টি করেছি, সে জগৎকে ধ্বংস ও মরুভূমির প্রাণীশূন্য করার জন্য নরকের কুকুরগুলো এক উত্তপ্ত কামনায় অন্ধ হয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সে জগৎকে আমি আজও সুন্দরই রাখাতম যদি না মানুষ তার নির্বুদ্ধিতাবশত ঐ সব ভয়ঙ্কর ধ্বংসলোলুপ জীবগুলোকে ডেকে না আনত। ঐ জীবগুলো শয়তানরাজের মত আমাকেও নির্বোধ মনে করত। আমি আমার নির্মিত স্বর্গোদ্যানে ঐ জগতে তাদের প্রবেশ করতে দিয়েছি। আমার ঘৃণ্য শত্রুদের উপর আমার প্রতিশোধবাসনা চরিতার্থ করার জন্য আমি ঐ জগৎ নরকের কুকুরগুলোর অধিকারে ছেড়ে দিয়েছি। আনন্দের আবেগে ও জগতের উপরে তাদের প্রভুত্বকে আমরা মেনে নিয়েছি।
কিন্তু আমার ঐ নরকের কুকুরগুলো জানে না আমিই তাদের ওখানে টেনে এনেছি। মানুষ তার যে পাপের কলুষ ও আবর্জনা দিয়ে মর্ত্যের যা কিছু পবিত্র তা সব কলুষিত করে দিয়েছে সেই পাপের কলুষ ওরা সব চেটে খাবে। হে আমার বিজয়ী পুত্র, নরকের যে মুখগহ্বর থেকে পাপ, মৃত্যু ও যে সব বিশৃঙ্খলা উঠে এসেছে সেই মুখগহুর চিরতরে বন্ধ করে দাও। যাতে স্বর্গ ও মত নরকের কলুষ থেকে মুক্ত হয়ে নূতন করে আবার পবিত্র হয়ে উঠতে পারে। তার আগে পর্যন্ত ওদের উপর তোমার ঘঘাষিত অভিশাপ কাজ করে যাবে।
এই বলে চুপ করলেন ঈশ্বর এবং উপস্থিত শ্রোতৃবৃন্দ তার জয়গান গাইতে লাগল। হে পরমেশ্বর, তোমার পথ মঙ্গলময়, তোমার সকল কর্মের বিধান ন্যায়সঙ্গত। তোমার প্রভুত্বকে কে অস্বীকার করতে পারে?
তারপর মানবজাতির পরিত্রাতা ঈশ্বরপুত্রের জয়গান গাইল তারা। যাঁর প্রসাদে স্বর্গ ও মর্ত্য উন্নতির উচ্চশিখরে আরোহণ করবে অথবা যাঁর বিধানে মর্ত্যলোক হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে নীচে নামতে থাকবে।
তাদের এই জয়গান গাওয়া হয়ে গেলে ঈশ্বর তার শক্তিমান দেবদূতদের নাম ধরে ডেকে তাদের নূতন নূতন কাজের দায়িত্বভার অর্পণ করলেন। তারপর সূর্যকে ডেকে বললেন তার আবর্তন যেন এমন হয় যাতে পৃথিবী দুঃসহ শীতাতপের তীব্রতার দ্বারা জর্জরিত হয়। উত্তর দিক হতে যেন আসে জড়তাপূর্ণ শীতের হাওয়া আর দক্ষিণ থেকে আসে দুঃসহ গ্রীষ্মের তাপ। এরপর চন্দ্র ও পাঁচটি গ্রহকেও তাদের আপন আপন কাজ বুঝিয়ে দিলেন। গ্রহগুলি যেন তাদের অশুভ প্রভাব বিস্তার করে যায় পৃথিবীর উপরে।
বায়ুপ্রবাহ যেন তীব্রবেগে পৃথিবীর সমুদ্র ও উপকূল ভূমিগুলিতে প্রবাহিত হয়, যেন আকাশ থেকে ভয়াবহ বজ্রপাত হয়।
এরপর ঈশ্বর তার দেবদূতদের পৃথিবীর দুই মেরুতে সূর্যের কক্ষপথ হতে কুড়ি ডিগ্রী করে দূরে সরিয়ে দিতে আদেশ দিলেন। পূর্বে সূর্যের গতিপথ পথিবীর বিষুবরেখার সঙ্গে সমান্তরাল ছিল। ফলে একটিমাত্র ঋতু ছিল। কিন্তু পৃথিবীর কক্ষপথটিকে সরিয়ে দেওয়ার ফলে সূর্যের গতিপথ বিভিন্ন রাশিতে ভাগ হয়ে গেল। তার ফলে একটির জায়গায় বিভিন্ন ঋতুর আবির্ভাব হলো। বিভিন্ন ঋতু পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হতে লাগল। পূর্বে শুধু একটিমাত্র ঋতু ছিল আর সে ঋতু ছিল বসন্ত। বসন্ত সারা বৎসর পৃথিবীকে ফুলে-ফলে হাস্যোজ্জ্বল করে রাখত, দিনরাত্রি সমান হত। সূর্য তখন এমনভাবে আবর্তিত হত ও তার গতিপথ এমন ছিল যাতে কোন শীতল সমুদ্রস্রোত, শৈত্যপ্রবাহ বা তুষারপাত কোন ক্ষতি করতে পারত না পৃথিবীর। নিষ্পাপ পৃথিবী তখন মানবাধ্যুষিত না হলেও তীব্র শীত-গ্রীষ্মের কোন যন্ত্রণা ছিল না সেখানে।
কিন্তু মানুষ নিষিদ্ধ ফলভক্ষণ করার সঙ্গে সঙ্গে সূর্য ঈশ্বরের নির্দেশে তার গতিপথ পরিবর্তন করে। আকাশমণ্ডলে সৌরজগতের পরিবর্তনের ফলে ধীরে ধীরে পৃথিবীর সমুদ্রভাগে ও ভূপ্রকৃতিতেও পরিবর্তন দেখা দেয়। উত্তপ্ত বাষ্প, কুয়াশা, তুষারড় প্রভৃতি পৃথিবীকে বিব্রত করে তুলতে লাগল ক্রমাগত। বিভিন্ন দিক হতে উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম প্রভৃতি ভয়ঙ্কর বায়ুপ্রবাহগুলি পৃথিবীর বনভূমিকে বিদীর্ণ করে সমুদ্রের জলরাশিকে উত্তাল ও বিক্ষুব্ধ করে ঝড়ের বেগে প্রবাহিত হতে লাগল। তাদের ভয়ঙ্কর গর্জনে বিকম্পিত হতে লাগল পৃথিবী।
