এইভাবে অতি কষ্টে দুর্গম পথ অতিক্রম করে নবনির্মিত সেই নূতন জগতে গিয়ে উপনীত হই আমি। এক আশ্চর্য পূর্ণতায় সুগঠিত সে জগৎ। আমাদের নির্বাসনের পর ঈশ্বর মানব সৃষ্টি করে সে জগতে স্থাপন করেন তাদের এবং তারা পরম সুখে বাস করতে থাকে সেখানে।
তোমরা শুনে আশ্চর্য হয়ে যাবে, আমি সেই আদি মানব-মানবীকে প্রতারণার দ্বারা একটি আপেল ফল খেতে প্রলুব্ধ করি এবং তার ফলে তারা ঈশ্বর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। তোমরা হয়ত শুনে হাসবে, এই অপরাধে ঈশ্বর তার সৃষ্ট ও তার প্রিয় সেই মানব-মানবীকে পরিত্যাগ করে চিরদিনের জন্য এবং মানবজাতির দ্বারা অধ্যুষিত সেই জগৎকে পাপ ও মৃত্যুর শিকার হিসাবে তাদের হাতে অর্থাৎ আমাদের হাতে তুলে দেন। বিনা কষ্টে ও শ্রমে সে জগতে বাস করে মানবজাতির উপর প্রভুত্ব করতে পারব আমরা। সেই সঙ্গে তাদের অধিকৃত সব বস্তুই আমাদের অধিকারে আসবে।
অবশ্য আমার কাজের জন্য ঈশ্বরপুত্র আমারও বিচার করেছে। হয়ত আমার নয়, যে সর্পের দেহ ধারণ করে এ কাজ করি সেই সর্পের বিচারও করেছে। আমার উপর অভিশাপ দিয়ে আমার ও মানবজাতির মধ্যে এক চিরশত্রুতার সম্পর্ক স্থাপন করে। আমি মানুষের গায়ে আঘাত করব আর মানুষেরা আমার মাথায় আঘাত করবে। আঘাত তো দূরের কথা, একটি নূতন জগৎ লাভ করতে হলে অনেক আঘাত, অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করতে হয়। আমার কার্যাবলীর পূর্ণ বিবরণ তোমরা পেয়েছ। এখন শুধু সেখানে প্রবেশ করে পরম সুখে বাস করতে থাক।
এই কথা বলার পর এক বিপুল হর্ষধ্বনি ও অভিনন্দনসূচক সমবেত চিৎকার শোনার আশংকায় থামল শয়তানরাজ। কিন্তু তার পরিবর্তে সব দিক হতে এক ঘৃণার গুঞ্জনধ্বনি শুনতে পেল। তা শুনে আর্য হয়ে গেল সে।
কিন্তু বেশিক্ষণ এভাবে থাকতে হলো না তাকে। সহসা তার দেহটা আপনা থেকে শক্ত ও খাড়া হয়ে উঠল। তার হাতদুটো আর পাজরের সঙ্গে জুড়ে গেল। তার পাদুটো জড়াজড়ি হয়ে এক হয়ে গেল। সে মুখ থুবড়ে সটান হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে সে এক বিরাট সর্পে পরিণত হলো। সে বুঝল, এক বৃহত্তর শক্তি তার শয়তানসুলভ সকল শক্তিকে ব্যর্থ করে দিয়ে যে সর্পরূপ ধারণ করে পৃথিবীতে গিয়ে পাপ কাজ করে আসে সেই সপে পরিণত করে তুলেছে তাকে।
সে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু তার কাটার মত জিহ্বা থেকে শুধু একটা হিস হিস শব্দ বেরিয়ে এল। কারণ এখন তার দেহের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও ইন্দ্রিয়সমূহ সাপের মত হয়ে গেছে।
শয়তানরাজ দেখল সে শুধু একা নয়, তার সমস্ত সহচর ও অনুগামীর দল তার মত সর্পদেহে হয়েছে রূপান্তরিত। সমস্ত সভাগৃহ জুড়ে নানাজাতীয় অসংখ্য সাপ কিলবিল করে বেড়াচ্ছে আর ফোঁস ফোঁস শব্দ করছে। দুমুখো সাপ, শৃঙ্গধারী সাপ, জলচর সাপ, তরবারি সাপ, যে সাপ কামড়ালে তীব্র পিপাসায় মানুষ মারা যায় সেই সাপ প্রভৃতি কত রকমের সাপ ঘুরে বেড়াতে লাগল সেখানে। যে লিবিয়ার মেদুসার মাথা থেকে ঝরে পড়া এক একটি রক্তবিন্দু সাপ হয়ে ওঠে, সেই লিবিয়া ও অফিউসা দ্বীপেও এত সাপ দেখা যায়নি কখনো।
কিন্তু মাঝখানে ড্রাগনাকৃতি বিরাটকায় যে সাপটি ছিল তার শক্তি সবার থেকে বেশি ছিল বলে অন্যান্য সাপগুলি তারই অনুসরণ করতে লাগল। তারা সেই সভাগৃহ থেকে বার হয়ে একটি ফাঁকা মাঠে এসে পড়ল। সেখানে শয়তানরাজের অন্যান্য অনুগামীরা আগে হতেই তাদের নেতার প্রত্যাবর্তন প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তাদের নেতা যে ফিরে এসেছে কিছুক্ষণ আগে তা তারা জানতে পারেনি।
এমন সময় সেই সব পর্যবেক্ষণকারী অনুচরেরা দেখল নরকের অভ্যন্তরভাগ হতে অসংখ্য সাপ কিলবিল করতে করতে বেরিয়ে আসছে। দেখার সঙ্গে সঙ্গে বিস্মিত ও হতবুদ্ধি হয়ে গেল তারা। কিন্তু কিছু বুঝতে পারার আগেই তাদের দেহগুলিও সাপে পরিণত হয়ে উঠল একে একে। তাদের নেতা নতুন করে যে পাপ করে এসেছে সেই পাপের শাস্তি নেতার সঙ্গে তার সব অনুগামীদের উপরেও বর্তাল।
সঙ্গে সঙ্গে সেই সব সর্পকুলের সামনে জ্ঞানবৃক্ষের অনুরূপ একটি গাছ গজিয়ে উঠল। তার ফলগুলি জ্ঞানবৃক্ষের ফলের মতোই সুন্দর, সে ফল খেতে ঈভকে প্রলুব্ধ করেছিল শয়তান।
তারা ভাবল সেই ফল খেয়ে তারা তাদের ক্ষুধা-তৃষ্ণা মেটাবে। এই আশায় তারা সাপের মত গাছের গুঁড়ি বেয়ে ডালের উপর উঠে গেল। তারা ফল পেড়ে খেতে লাগল। কিন্তু খাবার সঙ্গে সঙ্গে হতাশায় মুখ ফিরিয়ে নিল তারা। তারা আস্বাদ করে দেখল আসলে ফলগুলি শুধু মাটি আর তিক্ত ছাই দিয়ে ভরা। মুখ বিকৃত করে ফিরে এল তারা।
একদিন আদি মানব-মানবী যেমন প্রলুব্ধ ও মোহগ্রস্ত হয়ে জ্ঞানবৃক্ষের ফল ভক্ষণ করার পর মোহমুক্ত হয় তেমনি মোহমুক্ত হলো এই সর্পকুল।
এইভাবে ঈশ্বরপুত্রের বিচারে পাপের শাস্তিস্বরূপ শয়তানরা সাপে পরিণত হয়ে, ক্ষুধা-তৃষ্ণায় ঘুরে বেড়াতে লাগল সমস্ত নরকপ্রদেশের সীমানা জুড়ে। প্রতি বৎসর একবার করে মাত্র কয়েকদিনের জন্য আগের রূপ ফিরে পেত তারা। এই সময় মানবজাতির পতন ঘটাতে পারার জন্য গর্ববোধ করত তারা। নির্দিষ্ট কয়েকদিন পরেই আবার সর্পদেহ ধারণ করতে হত তাদের।
এদিকে তখন মর্ত্যলোকে অবস্থিত ঈশ্বরনির্মিত স্বর্গোদ্যানে পাপ ও মৃত্যু দুই ভাইবোন দেহ ধারণ করে উপস্থিত হলো।
