সৌন্দর্যের দিক থেকে অবশ্য সে এমনভাবে সজ্জিত যাতে সে তোমার ভালবাসা আকর্ষণ করতে পারে, তোমার অধীনতা নয়। তার যত সব গুণগুলি এক অনুশাসনের সীমার মধ্যে যতক্ষণ থাকে তা ভাল দেখায়, কিন্তু তারা যদি কোন শাসন না মেনে নিজেরাই প্রভুত্ব করতে চায় তখন তাদের খুবই খারাপ দেখায়। আসলে সে তোমারই অংশ। এটা তোমার জানা উচিত ছিল।
আদমকে এই কথা বলার পর তিনি ঈভকে বললেন, বল নারী, তুমি কি করেছ? ঈভ তখন বিপন্ন মুখে লজ্জায় অভিভূত হয়ে তার দোষ স্বীকার করল। কোন ঔদ্ধত্যের পরিচয় না দিয়েই লজ্জাজড়িত কণ্ঠে বলল, ছলনার দ্বারা সর্প আমায় প্ররোচিত করলে আমি নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করি।
ঈশ্বরপুত্র তখন অভিশপ্ত সর্পকুলের বিচার করার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলেন। তিনি এই বলে তাদের অভিশাপ দিলেন, যেহেতু তুমি এই অন্যায় কাজ করেছ, সমস্ত পশু ও জন্তুদের মধ্যে সবচেয়ে অভিশপ্ত হবে তুমি। তোমাকে সারাজীবন বুক ও পেটের উপর ভর দিয়ে চলতে হবে আর মাটি খেয়ে থাকতে হবে। নারীজাতি ও তোমাদের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক স্থাপিত হবে এবং তাদের সন্তানসন্ততিরা তোমাদের মাথায় আঘাত করবে আর তোমরা তাদের পায়ে কামড় দেবে।
এরপর অভিশপ্ত শয়তানকেও আবার অভিশাপ দিলেন ঈশ্বরপুত্র, আশ্রয়হারা হয়ে শূন্যে ঘুরে বেড়াতে হবে এখানে সেখানে।
এবার তিনি মানবজাতির আদিমাতা ঈভকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, গর্ভধারণ করে সন্তান প্রসব করে যেতে হবে তোমাকে দীর্ঘকাল ধরে। তোমাকে এজন্য প্রচুর দুঃখকষ্ট ভোগ করতে হবে। তোমাকে স্বামীর ইচ্ছার কাছে নতিস্বীকার করতে হবে। তার শাসনে চলতে হবে তোমায়।
এরপর আদমের উপর দিলেন শেষ বিচারের রায়। যেহেতু তুমি তোমার স্ত্রীর কথা শুনে আমি নিষেধ করা সত্ত্বেও নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়েছ, তার জন্য তুমিও অভিশপ্ত হবে। তোমাকে সারাদিনের শ্রমের দ্বারা জীবিকার্জন করে জীবনযাপন করতে হবে। কণ্টকাকীর্ণ হবে তোমার জীবনের পথ। মাঠে কাজ করে ফসল ফলিয়ে তা খেতে হবে। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অতিকষ্টে জীবন ধারণ করতে হবে। তারপর জীবনের অবসানে যে মাটি থেকে জন্ম হয়েছিল, তোমায় সেই মাটিতেই ফিরে যেতে হবে। তোমার মাটির দেহ মাটিতে ফিরে যাবে।
এইভাবে বিচার করলেন ঈশ্বরপুত্র। একই সঙ্গে তিনি মানুষের বিচারকর্তা ও পরিত্রাতার কাজ করেন। কারণ যে মৃত্যুদণ্ডের কথা আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল সে দণ্ড থেকে অব্যাহতি দিলেন তাকে। উপরন্তু তাদের নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দয়া হলো তার। তিনি তাদের অভিভাবকের মত শুধু পশুর চামড়া দিয়ে মানুষের দেহের নগ্নতাকে ঢাকার ব্যবস্থা করলেন না, তাদের মনের নগ্নতাটাকেও তার ন্যায়বিচারের আবরণ দিয়ে ঢেকে দিলেন।
এইভাবে বিচারের কাজ সব শেষ করে স্বর্গলোকে ফিরে গেলেন তিনি ঈশ্বরের কাছে। ফিরে গেলেন তাঁর পরম পিতার কাছে। পরম শক্তির গৌরবময় বুকে। তারপর পরম পিতা সর্বজ্ঞ হলেও তাকে বিচারের সব বিবরণ দান করলেন।
এদিকে মর্ত্যলোকে যখন মানুষের বিচার হচ্ছিল তখন নরকের দ্বারে পা ও মৃত্যু বসেছিল। শয়তান নরক থেকে তার কু-উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য বেরিয়ে যাবার পর থেকেই উন্মুক্ত রয়ে গেছে নরকদ্বার। সেই বিস্তৃত দ্বারপথে পাপ বসে আছে। প্রজ্জ্বলিত নরকাগ্নির শিখাগুলো বেরিয়ে আসছিল।
একসময় পাপ মৃত্যুকে বলল, হে আমার পুত্র, কেন আমরা পরস্পরের দিকে তাকিয়ে অলসভাবে বসে আছি? আমার জনক শয়তান এখন অন্য এক জগতে গেছে উন্নতির আশায়। আমরা তার প্রিয় সন্তান। আমাদের জন্য অনেক ভাল এক বাসস্থান খুঁজে পেয়েছে সে। সে নিশ্চয় সফল হয়েছে তার সন্ধানকার্যে। যদি কোন দুর্ঘটনা ঘটত, যদি তার শত্রুরা তাকে তাড়িয়ে দিত তাহলে সে প্রচণ্ড ক্রোধের সঙ্গে ফিরে আসত এতক্ষণ কারণ এই নরকপ্রদেশের মত তার শাস্তির উপযুক্ত স্থান আর নেই। তার উপর প্রতিশোধ নেবার জন্য তাকে এইখানেই নির্বাসিত করেছে।
আমার মনে হয়েছে আমি এক নূতন শক্তি লাভ করেছি। আমার দেহে পাখা গজিয়েছে। এই গভীর নরকপ্রদেশের ঊর্ধ্বে অনেক দূরে এক বিস্তীর্ণ মণ্ডলে উঠে যাবার জন্য যেন আমার সমজাতীয় কোন বৃহত্তর শক্তি আমার প্রতি সহানুভূতিবশতঃ দুর্বারবেগে আকর্ষণ করছে আমাকে। সেই শক্তির সঙ্গে আমার যেন এক নিগূঢ় মিত্রতার সম্পর্ক আছে। তুমি আমার ছায়াসম এক অবিচ্ছিন্ন শক্তি। তুমিও আমার সঙ্গে যাবে। কারণ পাপ থেকে মৃত্যুকে কেউ কখনো বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। তবে আমাদের জনক শয়তান সেই দুর্গম পথ অতিক্রম করে ফিরে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তা নাহলে কষ্ট করে আবার আমাদের ফিরে আসতে হতে পারে সেখান থেকে। এবার আমাদের সেই দুঃসাহসিক যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
তবে তোমার-আমার মিলিত শক্তিতে এই নরক থেকে সেই নৃতন জগতে যাবার উপযুক্ত এক পথ সীমাহীন সাগরমধ্যে স্থাপন করতে পারব আমরা। সে জগতে শয়তান এখন প্রভুত্ব করছে। এই নরকপ্রদেশের সমস্ত অধিবাসীদের মধ্যে তার বুদ্ধি সবচেয়ে । উন্নত ধরনের। সে হয়ত এখান থেকে সকলের যাবার ও পুনর্বাসনের পথ প্রস্তুত করছে। সেখানে যাবার আকর্ষণ ও প্রবৃত্তি আমার এমনই প্রবল ও দুর্বার যে সে পথ ভুল হবে না।
