এই বলে পরম পিতা তার দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করে তার পুত্রকে আশীর্বাদ করলে পুত্র পিতার ঐশ্বরিক দ্যুতিতে জ্যোতির্মান হয়ে বললেন, হে পরম পিতা, তোমার বিধান অনুসারে স্বর্গে ও মর্ত্যে তোমার অমোঘ অবিসম্বাদিত ইচ্ছাই আমার মধ্য দিয়ে পূরণ হবে। তোমার এই প্রিয়তম পুত্রের সকল কার্যে সন্তুষ্ট হবে তোমার চিত্ত। আমি মর্ত্যে তোমার বিধান লঙ্ঘনকারীদের বিচার করতে যাচ্ছি।
তবে তুমি জান, আমি যারই বিচার করি না কেন, সে বিচারে শাস্তি যত কঠোরই হোক না কেন, ভবিষ্যতে একদিন আমারই উপর ফিরে আসবে তা। আমি তোমার কাছে এই শপথই করেছিলাম এবং এজন্য কোন আক্ষেপ বা অনুশোচনা নেই আমার মনে। তাদের শাস্তির ও পতনের তীব্রতাকে প্রশমিত করার জন্য আমি নিজের উপর তুলে নেব সে শাস্তির বোঝ। তবু আমি ন্যায়বিচারের সঙ্গে করুণাকে সংমিশ্রিত করে এমনভাবে বিচার করব যাতে সম্পূর্ণরূপে সন্তুষ্ট হতে পারে এবং তুমিও যাতে সন্তুষ্ট হও। আর কারও উপস্থিতির প্রয়োজন নেই। যাদের বিচার হবে তারা ছাড়া আর কেউ সে বিচার দেখতে পাবে না। যে তৃতীয় আসামী সেই শয়তান আগেই পালিয়ে গেছে, তার বিচার আগেই হয়ে গেছে। সে আগেই দণ্ড পেয়ে গেছে। সর্পকে দণ্ডদানের কোন অর্থই হয় না।
এই বলে ঈশ্বরপুত্র উঠে পড়লেন তাঁর আসন থেকে। তিনি যাত্রা শুরু করলেন। সমস্ত রাজশক্তি স্বর্গদ্বার পর্যন্ত তাঁর সহগমন করল।
স্বর্গলোকের প্রান্ত থেকে ইডেনের অভিমুখে অবতরণ করতে লাগলেন ঈশ্বরপুত্র। দেবতাদের গতি সংখ্যায় গণনা করা যায় না। তাঁরা অতি অল্প সময়ের মধ্যে অনেক দূর পথ অতিক্রম করতে পারেন।
তখন দ্বিপ্রহরের মধ্য আকাশ ছেড়ে সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়েছে। প্রাকসন্ধ্যার শীতল বাতাস বইছিল মর্ত্যলোকে। ঈশ্বরপুত্রের তপ্ত রোষ কিছুটা শীতল হলো। তিনি মমতাস্নিগ্ধ অন্তরে মানুষের বিচার করতে এলেন। তিনি যখন ইডেন উদ্যানে নেমে হেঁটে যেতে লাগলেন তখন তার কণ্ঠস্বর তাদের কানে বাতাসে ভেসে আসতে থাকায় তারা তার উপস্থিতি এড়াবার জন্য বনের গভীরে গিয়ে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল।
ঈশ্বরপুত্র তাদের নিকটে গিয়ে জোরে ডাকতে লাগলেন, কই আদম কোথায় তুমি? আমার আগমন দূর থেকে প্রত্যক্ষ করেও কেন তুমি আনন্দিত হলে না? তোমাকে এখানে দেখতে না পেয়ে এই নির্জনতার মধ্যে অসন্তুষ্ট হয়েছি আমি। আগে তো এখানে তোমাদের কর্তব্যপালনে কোন ত্রুটি পরিলক্ষিত হত না। অযাচিতভাবেই। যথাযোগ্য অভ্যর্থনা ও সম্মান লাভ করতাম। এখন তোমাদের মনের মধ্যে কি এমন পরিবর্তন হলো যাতে তোমরা আমার উপস্থিতিকে এড়িয়ে গেলে? এখন এস আমার কাছে।
প্রথমে আদম এল তার সামনে। তারপর ঈভও এল। কেমন যেন বিকৃত ও বিবর্ণ তাদের চোখ-মুখ। তাদের চোখের দৃষ্টিতে ঈশ্বরের প্রতি বা নিজেদের প্রতি কোন ভালবাসার ভাব ছিল না, ছিল শুধু তার অপরাধচেতনা, লজ্জা, অস্থিরচিত্ততা, হতাশা, ক্রোধ, অবাধ্যতা ও অনমনীয়তা, ঘৃণা এবং চাতুর্য।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর আদম উত্তর করল, আমি আপনার কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে আমার নগ্নতার জন্য ভীত হয়ে লুকিয়ে পড়েছিলাম।
তখন মহান মহিমাময় বিচারক বললেন, আমার কণ্ঠস্বর আগেও শুনতে, কিন্তু তখন তো কোন ভয় পেতে না বরং তাতে আনন্দ লাভ করতে। এখন ভয়ঙ্কর কি এমন ঘটল? তুমি যে নগ্ন একথা কে বলল? তবে কি যে গাছের ফল খেতে নিষেধ করেছিলাম তোমরা সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল খেয়েছ?
আদম তখন বিব্রত হয়ে বলল, হে ঈশ্বরপুত্র, আজ আমি এক শোচনীয় অবস্থায় আমার বিচারকের সম্মুখে উপস্থিত হয়েছি। হয় আমাকে সমস্ত অপরাধের দায়িত্ব মাথায় করে নিতে অথবা আমার অর্ধাঙ্গিনী ও জীবনের অংশীদারকে অভিযুক্ত করতে হবে। সে যখন আমার প্রতি এখনো বিশ্বস্ত আছে তখন তার দোষ বা ত্রুটিবিচ্যুতির কথা আমাকে গোপন রাখতেই হবে। আমার অভিযোগের দ্বারা তার দোষকে তুলে ধরতে পারব না। এক অপরিহার্য প্রয়োজনের খাতিরে আমাকে এই নিন্দনীয় গোপনতা অবলম্বন করতে হবেই যাতে সমস্ত পাপ ও শাস্তি আমার মাথার উপরেই পড়ে। যদিও আমি জানি আমি যা গোপন করছি তা গোপন থাকবে না আপনার কাছে, আপনি সহজেই তা ধরে ফেলতে পারবেন তথাপি কোন উপায় নেই। যে নারীকে আপনি একদিন আমার সহায়িকাশক্তি হিসাবে আমাকে দান করেছিলেন সে নারী এত ভাল, এত সৎ, এত গ্রহণযোগ্য এবং এত স্বর্গীয় সুষমাসম্পন্ন যে তার হাতে আমার কোন অমঙ্গল ঘটতে পারে এটা আমি কোন প্রকারে সন্দেহ করতে পারিনি। সে যা কিছু করেছিল আমি তার মধ্যে কোন অন্যায় দেখতে পাইনি। ভেবেছিলাম সে কোন অন্যায় করতে পারে না। সে আমাকে সেই নিষিদ্ধ গাছের ফল দেয় এবং আমি তা ভক্ষণ করি।
তখন সেই সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের পুত্র ও প্রতিনিধি বললেন, সে কি তোমার স্রষ্টা ও ঈশ্বর যে তুমি তার কথা শুনলে? ঈশ্বর কি তাকে তোমার মৃত্যু ও পথপ্রদর্শক হিসাবে চিহ্নিত করে দিয়েছেন যে তুমি তার কাছে তোমার মনুষ্যত্ব ও পৌরুষকে বিসর্জন দিলে? অথবা ঈশ্বর কি তাকে তোমার সমান বলেই সৃষ্টি করেছেন?
আসলে ঈশ্বর তোমাকে তার ঊর্ধ্বে স্থাপন করেছেন গুণগত মর্যাদার দিক থেকে। তিনি তাকে তোমার অঙ্গ থেকে তোমারই জন্য সৃষ্টি করেছেন। আসলে তোমার গুণগত পূর্ণতা ও মর্যাদা তার থেকে অনেক বেশি।
