পাপের হীন ছায়ামূর্তি মৃত্যু তখন সঙ্গে সঙ্গে বলল, যেখানে তোমার নিয়তি এবং প্রবৃত্তি তোমাকে আকর্ষণ করে নিয়ে যায় সেখানে যাও তুমি। তোমার পিছু পিছু আমিও যাব। আমার পথও ভুল হবে না। সে জগতের অধিবাসীদের অসংখ্য মৃতদেহের গন্ধ ও আস্বাদ পাচ্ছি আমি। তারা আমার শিকারের বস্তু। যে কাজ তুমি করতে যাচ্ছ সেখানে সে কাজে আমি প্রয়োজনের সমপরিমাণ সাহায্য দান করব তোমায়।
এই বলে মর্ত্যলোকে মানবজাতির যে ভাগ্য পরিবর্তন হলো কিছু আগে তার। গন্ধ পেল সে। সে গন্ধ সে শুঁকতে লাগল। একপাল শকুনি যেমন বহু দূর থেকে কোনও যুদ্ধক্ষেত্রে আহত ও মৃতপ্রায় সৈনিকদের গন্ধ পেয়ে সে গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে সেদিকে পাখা মেলে উড়ে যায় তেমনি মৃত্যুও দূর থেকে বাতাসে তার নাসারন্ধ্র বিস্তৃত করে আসন্ন মৃত্যুকবলিত মর্তমানবদের গন্ধ পেয়ে পুলকিত হলো।
এরপর তারা দুজনে নরকের দ্বারপথ হতে বার হয়ে অনন্তপ্রসারিত অন্ধকার সমুদ্রের বিক্ষুব্ধ বুকের উপর দিয়ে উড়ে চলল। দুই মেরুপ্রদেশ হতে নির্গত দুটি হিমশীতল । বায়ুপ্রবাহ যেমন দুটি বরফের পাহাড়ের মত প্রবাহিত হতে হতে সাইবেরিয়ার নদীগুলিকে হিমে দ্রবীভূত করে দেয়, তেমনি হিমশীতল মৃত্যু তার গদা দিয়ে সেই সমুদ্রের জলরাশিকে প্রহার করতে করতে স্তব্ধ ও দ্রবীভূত করে দিল মুহূর্তে। তখন সেই সমুদ্রের জলরাশির একটি অংশ শুশীতল মাটিতে পরিণত হলো। তখন তারা সেই মাটি দিয়ে নরকের মুখ হতে রাজপথের মতোই প্রশস্ত এক সেতুপথ রচনা করে সমুদ্রের উপর দিয়ে নিয়ে গিয়ে মর্ত্যলোকের প্রাচীরের সঙ্গে যুক্ত করল। সে সেতুপথের দৈর্ঘ্য হলো বিরাট। সে জগৎ মৃত্যুর কাছে বিকিয়ে গেছে।
এইভাবে নরকের মুখ থেকে সুদূর মর্ত্যলোক পর্যন্ত এক বিস্তৃত সেতুপথ রচিত হলো। গ্রীসের আক্রমণকারী পারসিক জার্সেস যেমন সুসা থেকে তার মেমনিয়ার প্রাসাদকে সমুদ্রের উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত করেছিল এবং দার্দানালিস প্রণালীতে হেলেসপন্ট উপসাগরের উপর এক সেতুপথ নির্মাণ করে সমুদ্রতরঙ্গমালাকে প্রতিহত করেছিল তেমনি পাপ ও মৃত্যুরূপ শয়তান যে পথে গিয়েছিল সেই বিক্ষুব্ধ সমুদ্রপথের উপর আশ্চর্যভাবে এক সেতুপথ নির্মাণ করে বিশৃংখলাময় বিক্ষুব্ধ সমুদ্রের উপর দিয়ে সুদূর গোলাকার মর্ত্যলোকের বহির্দেশে যুক্ত করল। শিকল দিয়ে পৃথিবীর তিন জায়গায় বেঁধে দিল শক্ত করে।
এরপর মর্ত্যলোকের পথে যেতে যেতে স্বর্গের দিকে তাকাতেই তারা দেখতে পেল, শয়তান এক উজ্জ্বল দেবদূতের রূপ ধরে আকাশপথে এইদিকেই আসছে। তখন সূর্য মেষরাশিতে আরোহণ করেছে। শয়তান ছদ্মবেশ ধারণ করে থাকলেও তারা তাদের পিতাকে চিনতে পারল।
এদিকে ঈভকে প্রলুব্ধ ও প্ররোচিত করার পর বনের মধ্যে ছুটে যায় শয়তান। তারপর সে ছদ্মরূপ পরিবর্তন করে ব্যাপারটার প্রতিক্রিয়া কি তা দেখতে চায়। সে দেখল ঈভের কাজ তার স্বামীও সমর্থন করল। সে বুঝল তার চাতুর্য ও ছলনার কাজ সফল হয়েছে। সিদ্ধ হয়েছে তার কু-অভিসন্ধি। মানবজাতির পতন অনিবার্য। সে আরও দেখল আদম ও ঈভ তাদের নগ্নতায় লজ্জা পেয়ে গাছের পাতা দিয়ে তাদের কটিদেশ ঢেকে লজ্জা নিবারণের ব্যর্থ প্রয়াস পেল।
তারপর যখন সে দেখল ঈশ্বরপুত্র আদম ও ঈভের বিচারের জন্য স্বর্গ থেকে নেমে আসছেন তখন সে পালিয়ে গেল। কারণ সে ভাবল ঈশ্বরপুত্র তার উপর রুষ্ট হয়ে তার উপর এক নৃন শাস্তি আরোপ করতে পারেন।
তারপর রাত্রিতে আবার ইডেন উদ্যানে ফিরে এসে সে দেখল সেই অসহায় মানবজাতি বিষণ্ণ মুখে বসে তাদের অবস্থার কথা আলোচনা করছে। সমস্ত গ্রহগুলি সমবেত হয়ে তাদের চূড়ান্ত ধ্বংসের পরিকল্পনা করছে যার ফল পরে তারা পেয়েছিল।
তখন সে আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে এক সুসংবাদ বহন করে নরকের দিকে অগ্রসর হলো। তারপর সে মতলোকের বাইরে সেই বনির্মিত পাথরের সেতুর পাদদেশে উপস্থিত হয়ে সে আশ্চর্য হয়ে গেল। সেখানে তার দুই সন্তানকে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখতে পেয়ে প্রচুর আনন্দ পেল সে। সেই সঙ্গে নবনির্মিত বিরাট সেতুপথ দেখে তার আনন্দ বেড়ে গেল।
তখন তার সুন্দরী কন্যা পাপ নীরবতা ভঙ্গ করে বলল, হে পিতা, এই সেতু তোমারই এক মহতী কার্য। যদিও তুমি এটি তোমার নয় বলেই মনে করছ তবু তুমিই এর নির্মাতা এবং মুখ্য স্থপতি।
যখন আমি আমার অন্তরে বহু দূর থেকে জানতে পারলাম তুমি নরক থেকে অন্য এক জগতে গিয়ে তোমার উদ্দেশ্যকে সফল করতে পেরেছ তখন আমি ভাবলাম– তোমার পুত্রের সঙ্গে আমিও সেই জগতে গিয়ে দেখা করব তোমার সঙ্গে। যাই হোক, আমাদের সেই প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ আমাদের তিনজনের মিলন ঘটল এখন। নরক আর তার সংকীর্ণ সীমার মধ্যে কেউ ধরে রাখতে পারেনি আমাদের। এই অপার অনতিক্রম্য মহা-সমুদ্রও তোমার নির্দেশিত পথে কোন বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। যে আমরা এতদিন নরকদ্বারে কর্তব্যকর্মের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম সেই আমরা আজ তোমারই প্রসাদে মুক্তিলাভ করেছি সমস্ত বন্ধন হতে। এই অন্ধকার মহাসমুদ্রের উপর সেতুবন্ধন করতে তুমিই আমাদের শক্তিমান করেছ।
এখন এ জগৎ তোমার। যে জগৎ তুমি তোমার নিজের হাতে নির্মাণ করনি, সে জগৎ তোমার গুণ ও জ্ঞানের দ্বারা লাভ করেছ। দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধে যা তুমি হারিয়েছিলে, তা অন্যভাবে লাভ করবে। সে যুদ্ধে যে পরাজয়ের গ্লানি তখন মাথা পেতে নিতে বাধ্য হয়েছিলে, সে পরাজয়ের প্রতিশোধস্বরূপ তখন তুমি এই জগতের একমাত্র অধীশ্বররূপে রাজত্ব করবে।
