কিন্তু অতিমাত্রিক আত্মবিশ্বাসে প্রবৃত্ত হয়ে কোন কথা না শুনে তুমি চলে গেলে। হয়ত ভেবেছিলে নিষিদ্ধ ফল খেলে কোন বিপদই হবে না অথবা তাতে কি হয় তা পরীক্ষা করে দেখতে চেয়েছিলে।
অবশ্য আমিও তখন তোমার ভ্রান্ত পূর্ণতার লক্ষণ দেখে অতিমাত্রায় তোমার প্রশংসা করে ভুল করেছিলাম। ভেবেছিলাম এতে কোন বিপদ হবে না। এখন আমি আমার এই কাজের জন্য অনুশোচনা করছি। এটাই হলো আমার অপরাধ আর এই অপরাধে এখন তুমি অভিযুক্ত করছ আমাকে।
নারীদের উপর অতিরিক্ত আস্থা স্থাপন করে তাদের ইচ্ছাপূরণ করতে গিয়ে পুরুষেরা ভবিষ্যতে এই অপরাধই বারবার করবে। কোন সংযম বা অনুশাসন নারী মানবে না। পরে নিজের ইচ্ছায় ক্ষয় হয়ে বিপদে পড়বে। পুরুষের দুর্বলতা বা প্রশ্রয়কে দায়ী করে অভিযুক্ত করবে তাকে।
এইভাবে পরম্পরকে অভিযুক্ত করে দুঃখের সঙ্গে কালযাপন করতে লাগল তারা। কেউ নিজের দোষ দেখল না, নিজেকে ধিক্কার দিল না। আত্মপ্রতিষ্ঠার চেষ্টাজনিত এই দ্বন্দ্বের কোন শেষ ছিল না।
০৯ম সর্গ
নবম সর্গ
ইতিমধ্যে শয়তান কিভাবে সর্পরূপে মর্ত্যলোকে, এসে এক ঘৃণ্য ও ভয়ঙ্কর কাজ করে গেছে, কিভাবে সে ঈভকে কলুষিত ও নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণের মত পাপকর্মে প্রবৃত্ত করে এবং পরে ঈভ আবার আদমকে পাপাসক্ত করে তোলে, সে সংবাদ স্বর্গলোকে প্রচারিত হলো। এমন কোন ঘটনা আছে যা সর্বদশী ঈশ্বরের দৃষ্টিকে পরিহার করে যেতে পারে? এমন কে আছে যে সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের অন্তরকে প্রতারিত। করতে পারে? তিনি সত্য এবং ন্যায়পরায়ণ।
এমন কি শয়তান যখন মানুষের মনকে প্রলোভিত করতে যায় এক হীন অপকৌশল অবলম্বন করে তখনও তার স্বাধীন ইচ্ছা ও শক্তিবলে সেকথা জানতে পারলেন ঈশ্বর। শয়তান এ কাজ করার জন্য ছলনা ও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করলেও মানুষের এইরকম হীন আচরণের জন্য তার নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করার জন্য ঈশ্বর রুষ্ট হলেন তার প্রতি। শয়তান শত্রু বা আপাতমিত্রের রূপ ধরেই আসুক, মানুষ তার কথায় কান দেবে কেন? তার কথামত চলবে কেন?
তারা জানত এবং তাদের এটা মনে রাখা উচিত ছিল। ঈশ্বরের আদেশ, যে-ই তাদের প্রলুব্ধ করুক না কেন, তারা জ্ঞানবৃক্ষের ফল কখনই ভক্ষণ করতে পারে না। কিন্তু ঐশ্বরিক নিষেধাজ্ঞা তারা না মেনে পাপে নিমগ্ন হয়ে পড়েছে। তাদের শাস্তি পেতেই হবে। তাদের পতন অনিবার্য।
যে সব দেবদূত মর্ত্যলোকে প্রহরায় নিযুক্ত ছিল তারা সব কিছু জানতে পেরে বিষণ্ণ মনে স্বর্গে ফিরে গেল। মানবজাতির পতনে তাদের দুঃখ হচ্ছিল। শয়তান কিভাবে তাদের অলক্ষ্যে অগোচরে কৌশলে ইডেন উদ্যানে প্রবেশ করে তা ভাবতে গিয়ে আশ্চর্য হয়ে যায় তারা।
এই অবাঞ্ছিত সংবাদ স্বর্গদ্বারে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গবাসীরা যেমন একদিকে অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠে আদম ও ঈভের প্রতি, তেমনি সেই সঙ্গে তাদের পতনের জন্য দুঃখবোধ করতে থাকে। সকলেরই চোখে-মুখে বিষণ্ণতার ছাপ ফুটে ওঠে। কিন্তু এই ঘটনায় তাদের চিরশান্ত সুখী মন কিছুটা আলোড়িত হলেও তাদের স্বর্গীয় সুখে বিশেষ কোন ব্যাঘাত ঘটল না।
দেবদূত প্রহরীরা মর্ত্য থেকে স্বর্গে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্গবাসী দেবদুতেরা দলে দলে ব্যস্ত হয়ে তাদের চারদিকে ভিড় করে আসল ঘটনার কথা জানতে চাইল, তারপর সকলে মিলে ভয়ে ঈশ্বরের সিংহাসনের সামনে সমবেত হলো। তখন পরম পিতা পরমেশ্বর তার মেঘাবরণ থেকে বজ্রগর্জনসম গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, হে সমবেত দেবদূতবৃন্দ, ব্যর্থ কর্মভার ত্যাগ করে ফিরে এসেছ যারা তারা ভীত হয়ো না। এই দুর্ঘটনা ও দুঃসংবাদে বিব্রত বোধ করো না তোমরা। কারণ তোমরা আরও অনেক বেশি যত্নবান হয়ে তোমাদের কর্তব্যকর্ম সম্পাদন করলেও এই দুর্ঘটনাকে নিবারিত করতে পারতে না। সেই প্রবঞ্চক শয়তান যখন নরক থেকে উঠে এসে শূন্যমণ্ডল অতিক্রম করে স্বর্গোদ্যান অভিমুখে যায় তখনি আমি তোমাদের বলেছিলাম, সে তার কু-অভিসন্ধি সিদ্ধ করবেই। মানুষ তার দ্বারা প্রলুব্ধ হবেই, কারণ মানুষ সবচেয়ে তোষামোদপ্রিয়। সে তার স্রষ্টার বিরুদ্ধে যত সব মিথ্যা প্রবঞ্চনায় বিশ্বাস করে তার পতনকে ডেকে আনবে। আমার বিধান সে মানবে না। তার আবেগঘন মুহূর্তে আমার বিধান তার স্বাধীন ইচ্ছায় কোনরূপ হস্তক্ষেপ করবে না।
যাই হোক, তার পতন এখন সম্পূর্ণ। এখন তার বিচ্যুতির জন্য বিচার আর দণ্ডদানের রায় বাকি। সে দণ্ড হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু এখনো সে দণ্ড তার উপর আরোপিত হয়নি বলে সে ভাবছে তার বিচ্যুতির জন্য যে মৃত্যুদণ্ডের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সে যার ভয় করছিল তা মিথ্যা। আজ দিন শেষ হবার আগেই সে শাস্তির সত্যতা সে বুঝতে পারবে। বুঝতে পারবে কোন মার্জনা তাদের এ শাস্তি থেকে মুক্ত করতে পারবে না। কোন দয়ার দানকে ঘৃণা করে ফিরিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু ন্যায়বিচারকে কখনো ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।
কিন্তু তাদের বিচারের জন্য কাকে পাঠাব আমি? হে আমার পুত্র, আমার প্রতিনিধি, তোমাকে ছাড়া কাকে পাঠাব? স্বর্গ, মর্ত্য বা নরকে সব ব্যাপারে আমি তোমাকে পূর্ণ বিচারক্ষমতা দান করেছি। তবে তুমি জান, আমি চাই, কোন ন্যায়বিচার যেন করুণাবর্জিত না হয়। তুমি মানবজাতির বন্ধু, মধ্যস্থতাকারী, একই সঙ্গে তাদের শাস্তিদাতা এবং উদ্ধারকর্তা। তাই তোমাকেই পাঠাচ্ছি তাদের বিচারের জন্য। যে হবে একদিন ঈশ্বরের মানবাবতার, সে-ই অধঃপতিত মানবজাতির বিচার করবে।
