হায়, আমি যদি এই নির্জন বনের গভীরতর কোন দুর্গম প্রদেশ যেখানে সূর্য বা কোন নক্ষত্রের আলো প্রবেশ করতে পারে না সেখানে বন্য পশুর মত জীবন যাপন করতে পারতাম তাহলে হয়ত ভাল হত। হে বনস্পতিবৃন্দ, হে দেবদারু ও পাইন বৃক্ষ, তোমরা তোমাদের পত্রবহুল শাখা-প্রশাখাদ্বারা আমাকে এমনভাবে ঢেকে রাখ যাতে আমি আর কখনো দেবদূতদের মুখ দেখতে না পাই।
এরপর আদম ঈভকে বলল, এখন আমাদের এই দুরবস্থার মধ্যে একটা উপায় খুঁজে বার করো যাতে আমাদের দেহের যে সব অংশগুলি পরস্পরের চোখে সবচেয়ে লজ্জাজনক বলে মনে হচ্ছে সেগুলি ঢেকে রাখতে পারি। কোন গাছের চওড়া পাতাগুলিকে সেলাই করে কৌপীণের মত পরে আমরা কটিদেশদুটিকে ঢাকতে পারি যাতে নবাগত লজ্জা আর সেখানে গিয়ে বসতে না পারে।
এই পরামর্শ দিল আদম। তারপর তারা দুজনে বনের গভীরে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তারা একটি বিরাট বটবৃক্ষ বেছে নিল। সুপ্রাচীন বিশাল সেই বটবৃক্ষের দীর্ঘপ্রসারিত শাখাপ্রশাখাগুলি মাটিতে নুইয়ে পড়ে শিকড় গেড়ে বসে গিয়েছিল এবং তাদের থেকে আবার নূতন করে বটবৃক্ষ উগত হয়েছিল। এইসব বটবৃক্ষের সুশীতল ছায়ায় মালাবার ও ভারতের গোচারণরত রাখালরা খরতপ্ত দ্বিপ্রহরে আশ্রয় নেয়।
সেই বটবৃক্ষের কতকগুলি চওড়া পাতা পেড়ে সেগুলিকে তারা সেলাই করে তাদের কটিদেশ আবৃত করল। এইভাবে তারা তাদের নগ্নতা ও লজ্জা নিবারণের এক ব্যর্থ প্রয়াস পেল। তাদের যে নগ্নতা আগে ছিল গৌরবময়, এখন সে নগ্নতা লজ্জাজনক হয়ে উঠল তাদের কাছে।
কলম্বাস দক্ষিণ আমেরিকা আবিষ্কারকালে উপকূলগুলির বানঞ্চলে যে সব বন্য আদিবাসীদের যেভাবে পালক ও পাতা দিয়ে তাদের কটিদেশকে আচ্ছাদিত করতে দেখেছিলেন, আদম ও ঈভ সেইভাবে তাদের কটিদেশ আচ্ছাদিত করল। কিন্তু এতে তাদের লজ্জা আংশিক নিবারিত হলেও মনে শান্তি পেল না তারা।
তারা দুজনে বসে কাঁদতে লাগল। কিন্তু শুধু কান্না নয়, শুধু দরবিগলিত অবিচল অশ্রুধারা তাদের চোখ থেকে বয়ে যেতে লাগল না, আবেগের ঝড় বয়ে যেতে লাগল তাদের অন্তরে। একদিন তাদের যে শান্ত মনের ভূমিতে অখণ্ড প্রশান্তি বিরাজ করত সতত, আজ ক্রোধ, ঘৃণা, অবিশ্বাস, সংশয় ও অনৈক্য প্রভৃতি বিচিত্র কুটিল আবেগ ঝড়ের বেগে তাদের সে মনোভূমিকে আঘাতে আঘাতে বিপর্যস্ত করে সকল শক্তিকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।
তাদের দুজনের মধ্যে যে পারস্পরিক বোঝাঁপড়ার ভাব ছিল তা বিনষ্ট হয়ে গেল। ন্যায়নীতি ও ধর্মের অনুশাসন মানতে চাইল না। দুজনেই ইন্দ্রিয়গত ক্ষুধার অধীন হয়ে পড়ল এবং সে ক্ষুধা যুক্তির অবিসংবাদিত প্রভুত্বকে অস্বীকার করে নিজের প্রাধান্যকে প্রতিষ্ঠিত করল।
আদমের অন্তরের বিক্ষোভ তার চোখের দৃষ্টি ও ভাবভঙ্গিতে প্রকাশ পেতে লাগল। সে তখন ঈভকে বলল, সেদিনকার সেই অশুভ সকালে তুমি যদি আমার কথা শুনতে এবং আমি যা চেয়েছিলাম সেইমত আমার কাছে থাকতে তাহলে আমাদের এ অবস্থায় পড়তে হত না। কিন্তু জানি না কিসের মায়া ও মোহে আচ্ছন্ন হয়ে তুমি আমার কথা না শুনেই চলে গেলে। সেদিন আমরা কত সুখে ছিলাম। আর আজ সমস্ত সদগুণ হতে বিবর্জিত হয়ে এক লজ্জাজনক নগ্নতার শিকার হয়ে উঠেছি।
এখন থেকে কেউ যেন অকারণে তার ধর্মবিশ্বাসকে ভঙ্গ করে নিজের পতন নিজেই ডেকে না আনে।
দোষের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে ঈভ বলল, তোমার মুখ থেকে কি কঠোর কথাই না নির্গত হলো আদম। তুমি বললে, আমি তোমাকে ছেড়ে দূরে চলে যাওয়ার জন্যই এইরকম হলো। আজ আমার দ্বারা যে বিপর্যয়ের উদ্ভব হলো তা তো তোমার দ্বারাও হতে পারত। আমার মতো তুমি যদি সেখানে একা থাকতে অথবা তুমি যেখানে ছিলে সেখানে যদি সর্প এসে তোমাকে একইভাবে প্ররোচিত বা প্রলোভিত করত তাহলে তুমি তার প্রতারণা বা ছলনাকে ধরতে পারতে না। সেই সর্পের সঙ্গে আমার কোন শত্রুতা ছিল না। অকারণে সে আমার অমঙ্গলসাধন বা বঞ্চিত করবে তা কেমন করে বুঝব? তোমার কাছ ছেড়ে একা কোথাও যাবার কি কোন স্বাধীনতাই ছিল না আমার? তোমার পার্শ্বদেশের একটি পঞ্জর থেকে আমার জন্ম হওয়ার জন্য আমাকে কি চিরকাল একটি প্রাণহীন স্বাধীনতাহীন পঞ্জর হিসাবেই থাকতে হবে? তাই যদি হয়, আমার জন্য এখন বিপদের সম্মুখীন হতে হয় তরে কেন তখন আমার যাওয়াকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করে কঠোর আদেশ প্রদান করলে না? তোমার সে নিষেধের মধ্যে কঠোরতার অভাব এবং কুণ্ঠা ছিল কেন? তুমি তখন আমার কথায় নরম হয়ে আমাকে যেতে অনুমতি দিয়েছিলে। আমাকে সমর্থন করেছিলে। কিন্তু তখন যদি তুমি কঠোর এবং তোমার অসম্মতিতে দৃঢ় ও অবিচল থাকতে তাহলে ঐশ্বরিক নিষেধাজ্ঞা আমি লঙ্ঘন করতাম না এবং আমার মনে হয় তুমিও তা করতে না।
আদম তখন রুষ্ট হয়ে বলল, হে অকৃতজ্ঞ ঈভ, এই কি আমার প্রেমের প্রতিদান? এই কি তোমার ভালবাসা? তোমার যখন পতন হয় তখন আমি আমার প্রেমকে অপরিবর্তনীয়রূপে ঘোষণা করেছিলাম। আমি তো তোমাকে ছেড়ে পরম সুখে আমার জীবন যাপন করতে পারতাম। কিন্তু তা না করে স্বেচ্ছায় তোমার সঙ্গে মৃত্যুকেই বরণ করে নিই। অথচ এখন আমাকেই তুমি তোমার ঐশ্বরিক বিধান লঙ্ঘনের কারণ বলে ভর্ৎসনা করছ?
অবশ্য তখন তোমাকে খুব কঠোরভাবে সংযত করিনি। কিন্তু আর কি আমি করতে পারতাম? আমি তোমাকে সতর্ক করে দিয়েছিলাম। মৃদু তিরস্কার করেছিলাম। বিশ্বাসের কথা বলেছিলাম। যে শত্রু সুযোগের অপেক্ষায় ওৎ পেতে বসে আছে তার কথাও বলেছিলাম। তোমার স্বাধীন ইচ্ছার অপব্যবহার করতে বারবার নিষেধ করে দিয়েছিলাম।
