যদি তুমি তোমার প্রেমের এই সততা ও বিশ্বস্ততার কথা আজ এমন ভাবে ঘোষণা না করতে তাহলে আমার এই ফলভক্ষণের ফলে মৃত্যু এসে ভয়াবহরূপে উপস্থিত হলে আমি পরিত্যক্ত অবস্থায় একাকী সে মৃত্যুকে বরণ করে নিতাম। তোমার জীবনের শান্তিকে বিঘ্নিত করে তোমাকে আমার সঙ্গে মৃত্যুবরণ করতে কোনভাবে প্ররোচিত করতাম না।
কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে আসল ঘটনা তা নয়। আমি ভাবছি অন্য কথা। কোন মৃত্যু নয়, এক পূর্ণ ও পরিণত জীবনের রূপ লাভ করতে চলেছি আমরা। এই ফলের স্বর্গীয় আস্বাদ আমার জ্ঞানচক্ষুকে উন্মীলিত করে দিয়েছে, এক নূতন আশা ও আনন্দের দিগন্তকে উন্মোচিত করে দিয়েছে আমাদের সামনে। সুতরাং আমার অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে হে আদম, তুমিও এ ফল অবাধে ‘আস্বাদন করো। সমস্ত মৃত্যুভয় বাতাসে উড়িয়ে দাও।
এই কথা বলে আদমকে আলিঙ্গন করল ঈভ। আনন্দাশ্রু ঝরে পড়তে লাগল তার চোখ থেকে। আজ আদম তার প্রেমকে এক মহত্তর সুমন্নতি দান করেছে, সে তার সেই প্রেমের খাতিরে সমস্ত ঐশ্বরিক রোষ ও মৃত্যুকে বরণ করে নিতে চেয়েছে, এ কথা ভেবে আনন্দের সঙ্গে এক বিরল গর্ব অনুভব করল সে।
ঈভ জ্ঞানবৃক্ষের শাখাসহ যে ফল এনেছিল সে ফল সে উদার হাতে আদমকে দান করল। ঈভের থেকে সে অধিকতর জ্ঞানের অধিকারী হলেও কোন কুণ্ঠা না করেই সে ফল খেয়ে নিল, ঈভের নারীসুলভ সৌন্দর্য ও সুষমায় সহজেই মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ল সে।
পৃথিবীর নাড়িভুঁড়ি পর্যন্ত প্রবলভাবে কম্পিত হয়ে উঠল। সমগ্র প্রকৃতি যন্ত্রণায় দ্বিতীয়বার আর্তনাদ করে উঠল। মানবজাতির পাপ পূর্ণ হওয়ায় আকাশ বজ্রবৃষ্টিসহ অশ্রুবিসর্জন করতে লাগল।
আদম কিন্তু এ সব কিছুই জানল না। সে শুধু পেট ভরে তৃপ্তির সঙ্গে ফল খেয়ে যেতে লাগল। ঈভও আর তার নিষেধাজ্ঞা-লঙ্ঘনের কোন ভয় করল না। সে শুধু তার প্রেমময় সাহচর্যের দ্বারা সান্ত্বনা দিয়ে যেতে লাগল তার স্বামীকে। এক নৃতন মদ্যপানের ফলে মত্ত হয়ে এক উচ্ছল আনন্দের স্রোতে সাঁতার কাটতে লাগল যেন তারা। তাদের মনে হলো, যেন তারা এক দৈবশক্তির অধিকারী হয়ে উঠেছে সেই নিষিদ্ধ ফল খেয়ে। এই পৃথিবীকে উপেক্ষা করে পাখা মেলে তারা যেন উড়ে যেতে পারবে আকাশে।
কিন্তু সেই নিষিদ্ধ ছলনাময় ফল ভক্ষণের প্রতিক্রিয়া শুরু হলো এবার। প্রথমে তাদের মোহগত জ্বলন্ত কামনাকে বাড়িয়ে দিল। আদম ঈভের পানে সকাম দৃষ্টিতে তাকাল। ঈভও সে দৃষ্টির প্রতিদান দিল। কামনার আগুনে জ্বলতে লাগল তারা।
আদম এবার ঈভকে বলল, ঈভ, তুমি যা বলেছ তা সব ঠিক। আজ তুমি যে আমাকে আস্বাদ দিলে তার জন্য তোমার প্রশংসা না করে পারছি না। এতদিন এই উপাদেয় ফল আস্বাদন না করে জীবনের কত আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছি আমরা। আজ প্রথম আস্বাদন করে এর গুণ জানতে পারলাম। এই নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করে যদি এত আনন্দ পাওয়া যায় তাহলে সব ফলই নিষিদ্ধ হোক।
এখন তৃপ্তির সঙ্গে আহার করার পর দুজনে নর্মক্রীড়া করিগে চল। তোমাকে প্রথম দেখা ও বিবাহ করার পর থেকে তোমার রূপ-লাবণ্য এতখানি নিখুঁত ও পরিপূর্ণ বলে মনে হয়নি আমার। এই ফলের গুণেই যেন অনেক গুণ বেড়ে গেছে তোমার দেহসৌন্দর্য। সে সৌন্দর্যকে উপভোগ করার জন্য আজ এক অদম্য কামনার জ্বালা অনুভব করছি আমার মনে।
এই কথা বলে আর কোন ভণিতা না করে ঈভের হাত ধরে এক ছায়াচ্ছন্ন নিঝরিণীর তটভূমিতে নিয়ে গেল আদম। সে বেশ বুঝতে পারল যে কামনার আগুনে তার মনপ্রাণ জ্বলছে সে আগুন ঈভের মধ্যেও জ্বলছে, সে আগুনের আত্মা ঠিকরে বেরিয়ে আসছে তার চোখে-মুখে।
সেই তৃণাচ্ছাদিত তটভূমির উপর, ভায়োলেট, এ্যাসফোডেল, হায়াসিনত্ প্রভৃতি ফুলের আস্তরণ পাতা ছিল কোমল শয্যার মত, তাদের মাথার উপরে ছিল ঘনসন্নিবদ্ধ বৃক্ষপত্রের সবুজ চন্দ্রাতপ। সেইখানে দুজনে শুয়ে প্রাণভরে সুরতক্রিয়ায় মত্ত হয়ে উঠল তারা। তাদের সকাম প্রণয়লীলার উচ্ছ্বসিত প্রবলতার দ্বারা তাদের পাপবোধকে মুছে দিতে চাইল, যেন ক্রমে এক নিবিড় রতিক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল তারা।
সেই ভ্রান্ত ফল তার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ এক নির্দয় বাষ্প উদগীরণের দ্বারা তাদের মত্ত করে তুলে তাদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে বার করে আনে। তাই তারা দারুণ ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ঘুম থেকে উঠে পরস্পরের পানে তাকাল তারা। তাদের জ্ঞানচক্ষু যে উন্মীলিত হয়েছে তা তারা এবার বুঝতে পারল। এক কুটিল কালিমায় আচ্ছন্ন হয়ে উঠল তাদের মন। যে নিষ্পাপ সরলতা তাদের মনকে আবৃত করে রাখায় কোন কিছুতে অশুভ বা মন্দ কিছু দেখতে পেত না তারা, সে সরলতা অপগত হলো। ফলে এক সহজাত আত্মবিশ্বাস, ন্যায়নীতি ও মর্যাদাবোধ জেগে উঠল তাদের মধ্যে। তাদের দেহের নগ্নতায় লজ্জাবোধ করল তারা।
সঙ্গে সঙ্গে গাছের পাতা নিয়ে তার গোপনাকে আবৃত করল আদম। কিন্তু তাতে আরো প্রকট হয়ে উঠল তার নগ্নতা। এমন সময় চৈতন্য হলো আদমের। একদিন স্যামসন যেমন তার সব শক্তি হারিয়ে ব্যভিচারিণী নাস্তিক ডেলাইলার অঙ্কদেশ হতে উঠে দাঁড়িয়েছিল, তেমনি গুণবর্জিত হয়ে উঠল আদম।
হতবুদ্ধি হয়ে ম্লান মুখে বসল তারা। বজ্রাহতের মত স্তম্ভিত বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে রইল। অবশেষে আদম ঈভের মত লজ্জায় অপ্রতিভ হয়ে বলল, হে ঈত, এক অভিশপ্ত মুহূর্তে তুমি সেই কপট কুটিল প্রাণীর ছলনায় মুগ্ধ হয়ে তার কথায় কান দিয়েছিলে। মানুষের নকল কণ্ঠস্বরে ভুল শিক্ষা দিয়েছিল সে তোমাকে। সত্য হয়ে উঠল আমাদের পতন, মিথ্যা হয়ে উঠল আমাদের উন্নতির আশ্বাস। আমাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হবার সঙ্গে সঙ্গে ন্যায়-অন্যায় বোধ জাগল আমাদের মধ্যে কিন্তু ন্যায়কে বর্জন করে শুধু অন্যায় ও অশুভকে গ্রহণ করলাম আমরা। এই যদি জ্ঞানের অর্থ হয় তাহলে এই জ্ঞানের ফল কত বিষময়। সরলতা, সততা, নির্দোষিতা, ধর্মবিশ্বাস, শুচিতা প্রভৃতি যে সব গুণগুলি আমাদের মনের অলঙ্কারস্বরূপ ছিল সেইসব গুণগুলিকে এই জ্ঞান কলুষিত, এ মন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় আমরা একেবারে নগ্ন হয়ে পড়েছি গুণের দিক থেকে। এক অশুভ লজ্জার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আমাদের। চোখে-মুখে। এই মুখ নিয়ে আমি কি করে ঈশ্বর অথবা দেবদূতের মুখ দেখব? যে বিশুদ্ধ অনাবিল আনন্দের আবেগ ছিল আমার মনে তা আজ কোথায়? সেইসব দেবদুতেরা এবার থেকে তাদের অত্যুজ্জ্বল জ্যোতির দ্বারা আমার এই পার্থিব চোখের সব দৃষ্টিকে অভিভূত করে দেবে। আমি তাদের সেই জ্যোতিকে সহ্য করতে পারব না।
